জাসদের গণবাহিনী ও এরশাদ সরকারের ভূমিকা নিয়ে সংসদে উত্তেজনা

বিএনপিবিহীন দশম সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের গতকাল সমাপনী দিনে আকস্মিকভাবে উত্তেজনা ছড়ালেন জাতীয় পার্টি (জাপা) ও জাসদের সংসদ সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিএলএফ বাহিনীর তালিকা আনা সংক্রান্ত একটি বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গ্রহণে সম্মতি দিয়ে এর ওপর দেয়া বিবৃতিতে জাপার বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হকও। ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত জাসদের ও গণবাহিনীর এবং ’৮২ থেকে ’৯০ পর্যন্ত এরশাদ সরকারের ভূমিকা নিয়ে আকস্মিক উত্তেজনা ছড়ান জাপা-জাসদের কয়েকজন সংসদ সদস্য। পরে সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিএলএফ বাহিনীর তালিকা ভারত থেকে দেশে আনতে বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি আনেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। প্রস্তাবের পক্ষে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে যেন প্রতিবিপ্লব না হয়, এজন্য বিএলএফ গঠন করা হয়েছিল; কিন্তু সেই বাহিনীর একজন সিরাজুল আলম খান বিএলএফ থেকে বের হয়ে জাসদ তৈরি করেন। আমরা যারা ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগ করতাম, এই জাসদ আর গণবাহিনী তাদের মাঠে-ঘাটে হত্যা করেছে। সেদিন যদি জাসদ বা গণবাহিনী সৃষ্টি না হতো, তাহলে বঙ্গবন্ধুকে কেউ হত্যার সাহস পেত না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তো নীলকণ্ঠ, উনি সব সহ্য করতে পারেন। এসময় সংসদে উপস্থিত জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে বেশ বিব্রত দেখাচ্ছিল। সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর দেয়া বক্তব্যে মন্ত্রী আ.ক.ম মোজ্জাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাসদ ও গণবাহিনীর পেছনে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মুসলিম লীগ পরিবার রাতারাতি জাসদ হয়ে গেল। আজকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এজন্য তাদের ধন্যবাদ; কিন্তু তাদের ভুলের জন্য জাতিকে ৪৩ বছর ধরে খেসারত দিতে হচ্ছে। মন্ত্রী এ সময় প্রস্তাবটি গ্রহণের পক্ষে মত দিলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। এরপর জাসদের কার্যকরী সভাপতি মঈনউদ্দীন খান বাদল পয়েন্ট অব অর্ডারে অনির্ধারিত আলোচনায় বলেন, বিরোধী দলের একজন সদস্যের প্রস্তাব নিয়ে সরকারের শরিক একটি দলকে আনন্দচিত্তে এভাবে জবাই করা হচ্ছে, দলটির ঠিকুজি উদ্ধার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইতিহাসের মাইন ফিল্ডে হাঁটলে যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত জাসদ যা করেছে, ইতিহাস বলবে আমরা সঠিক না ভুল ছিলাম। আমাদেরও ২০ হাজার লোক মারা গিয়েছিল। আমি পরিষ্কার বলতে চাই, জাসদ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছিল। এসময় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, জাপার কাজী ফিরোজ রশীদসহ আরো কয়েকজন সদস্য বাদলের উদ্দেশে বলেন, গণবাহিনী নিয়ে কথা বলেন। জাপার বেশ কজন এমপি দাঁড়িয়ে গিয়ে হইচই করে বাদলের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ’৭২ থেকে ’৭৫ নিয়ে কথা বলুন। তাদের হইচইয়ের মধ্যেই বাদল বলেন, ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত জাসদ যা করেছিল, সেটা ছিল ইতিহাসের বাঁক। সময় বলে দেবে কে সঠিক আর কে ভুল ছিল। কখনো বলিনি যা করেছি, সঠিক করেছি; কিন্তু যেভাবে প্রস্তাবটি তোলা হয়েছে, সেটা সঠিক হয়নি। ’৮২ থেকে ’৯০ পর্যন্ত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এখানে অনেকেই আন্দোলন করেছিল। পরে প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের হস্তক্ষেপে উত্তেজনা থামে। এসময় ফিরোজ রশীদ চেয়ার ছেড়ে মঈন উদ্দীনের উদ্দেশে কথা বলতে শুরু করলে মঈন উদ্দীন স্পিকার শিরীন শারমিনের উদ্দেশে বলেন, ‘আই নিড ইউর প্রটেকশন।’ স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ফিরোজ রশীদকে আসনে বসার অনুরোধ করেন। মঈন উদ্দীন বলেন, হাসানুল হক ইনু ও আমি টেলিভিশনে বলেছি, ‘পিতার (বঙ্গবন্ধু) বিরুদ্ধে সমালোচনা করা ভুল হলে আজ তার কাফফরা দিচ্ছি।’ পরে বিরোধী দলের পক্ষে জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য দিতে গিয়ে শুরুতেই বলেন, কাজী ফিরোজ ও বাদলের বক্তব্যে সংসদে যে তিক্ততার সৃষ্টি হলো, আমি বক্তব্য দেয়ার ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছি। আজ অধিবেশনের শেষ দিনে মধুর স্মৃতি আশা করেছিলাম। দুর্ভাগ্য সেটা হলো না। আশা করব, যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে অধিবেশনের পর ফিরোজ-বাদল মিলে তার অবসান হয়ে যাবে। অবশ্য অধিবেশন শেষে কাজী ফিরোজ ও বাদল যে যার মতো চলে যান।