বেহাল চিকিত্সা, বিপাকে রোগী

একে তো চিকিত্সকের সংকট, তার ওপর কর্মরতরাও ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে। কোন মতে ডাক্তার যদিও বা মিললো, মেলে না ওষুধ। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা পান না স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। বেশির ভাগ পরীক্ষাই করাতে হয় হাসপাতালের বাইরে। এর উপর দালালদের দৌরাত্ম্য তো রয়েছেই। এমন অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই চলছে দিনাজপুরের সরকারি চিকিত্সাসেবা। এ জেলায় প্রায় ৩২ লাখ লোকের বসবাস। ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ বৃহত্ জেলায় প্রাচীনতম সরকারি আধুনিক সদর হাসপাতাল ছাড়াও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ১টি, বক্ষব্যাধি ক্লিনিক ১টি, আরবান ডিসপেনসারি ১টি, ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ৯২টি, ইউনিয়ন সাব সেন্টার ৩১টি ও ৩১৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। কিন্তু এত কিছু থাকার পরও রোগীদের জন্য যেন কিছুই নেই। সরকারিভাবে দিনাজপুর জেলা সদর হাসপাতাল ও ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মঞ্জুরিকৃত চিকিত্সকের ২৭৫টি পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৯৫ জন। দীর্ঘদিন ধরে চিকিত্সকের ১৮০টি পদ শূন্য। অন্যান্য কর্মকর্তা, নার্স, তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পদও বেশির ভাগ শূন্য। প্যাথলজি পরীক্ষাও বেশির ভাগ হাসপাতালে বন্ধ। প্রকাশ্যে পাচার হচ্ছে ওষুধ । কর্মরত চিকিত্সকদের ৯০ ভাগই কর্মস্থলে থাকেন না। বেশির ভাগ উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে চিকিত্সকের বাসস্থান ঝুঁকিপূর্ণ। মেরামত করা হয় না দীর্ঘদিন। হাসপাতালগুলো অপরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধময়। অনেক হাসপাতালে মলমূত্র উপচে পড়ছে বাথরুমে। এ অবস্থায় রোগীরা কার্যকর চিকিত্সা পাচ্ছেন না। উল্টো চিকিত্সা নিতে এসে রোগীরা অন্য রোগে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। সরেজমিনে ওই সব হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সাসেবার নামে চরম অব্যবস্থাপনা ও রোগীদের চরম দুর্দশার এই চিত্র পাওয়া গেছে। আরবান ডিসপেনসারি: আরবান ডিসপেনসারিতে ১৫টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও আছেন ১৩ জন। দুটি পদ শূন্য। এছাড়া ৩য় শ্রেণীর ৮৫টি পদ থাকলেও ৯টি পদ শূন্য। এখানে দেখা গেছে, অধিকাংশ চিকিত্সক কর্মস্থলে অনুপস্থিত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসে ব্যস্ত। জটিল অপারেশন করাতে রোগীরা বিভিন্ন কারণে বিভ্রান্ত হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বিরল: ৩১ শয্যা বিশিষ্ট এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিস্থিতি খুবই নাজুক। এখানে ১৯ জন অনুমোদিত চিকিত্সকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন। হাসপাতালের ২য় শ্রেণীর ১১টি পদ থাকলেও কর্মরত মাত্র ৯ জন। ৩য় শ্রেণীর পদ ৭২টি থাকলেও ৬টি পদ শূন্য। এই হাসপাতালে ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের ভিজিটের কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তারা যখন খুশি তখন ডাক্তার ভিজিট করছেন। উপজেলার আরএমও ডা. রেজা জানান, শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি। বোচাগঞ্জ: ৪০ শয্যার এই হেলথ কমপ্লেক্সটিতে চিকিত্সক সংকট চরমে। ২৬টি পদের ১৮টিই শূন্য। যে ক’জন চিকিত্সক আছেন তারাও নিয়মিত উপজেলায় গিয়ে দায়িত্ব পালন করেন না বলে অভিযোগ আছে। জেলা সদরেই তাদের বেশি দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের অধিকাংশই প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত। এখানে অপারেশন হয় না। অজ্ঞানকারী ডাক্তারের পদটি দীর্ঘদিন থেকে শূন্য। ওষুধ সরবরাহ যা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। কাহারোল: ৩১ শয্যা বিশিষ্ট কাহারোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ জন চিকিত্সকের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। ১১টি পদই শূন্য। ২য় শ্রেণীর ১১টির মধ্যে ৩টি পদ শূন্য। ৪র্থ শ্রেণীর ১৯টি পদের ২টি শূন্য। এ হাসপাতালেও মূল সংকট চিকিত্সকের। এছাড়া এ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন থেকে অকেজো। স্টাফ কোয়ার্টারগুলোও বাসযোগ্য নয়। বীরগঞ্জ:৩১ শয্যা বিশিষ্ট বীরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯টি চিকিত্সকের পদের মধ্যে মাত্র ৮ জন কর্মরত। এরাও নিয়মিত হাসপাতালে চিকিত্সা দেননা বলে অভিযোগ আছে। এখানে ৩য় শ্রেণীর ৯১টি পদের মধ্যে ১৩টি পদ শূন্য। খানসামা: ৩১ শয্যা বিশিষ্ট খানসামা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫টি অনুমোদিত চিকিত্সকের পদ থাকলেও আছেন মাত্র ৪ জন। দ্বিতীয় শ্রেণীর ১১টি পদ থাকলেও ৪টি শূন্য। অপারেশন হয় না। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আজাদ জানান, এ্যাম্বুলেন্সটি চালু আছে। কিন্তু স্টাফ কোয়ার্টারগুলি বাসযোগ্য নয়। তবে চিকিত্সক সংকট দূর হলে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়া সম্ভব হবে। চিরিরবন্দর:৩১ শয্যা বিশিষ্ট চিরিরবন্দর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১টি চিকিত্সকের পদ আছে। কর্মরত আছেন মাত্র ৪ জন। চিকিত্সক সঙ্কটের অজুহাতে এখানে স্বাস্থ্যসেবা এখন নিন্মমুখী। অপারেশন হয় না বললেই চলে। যন্ত্রপাতি থাকলেও অপারেটরের অভাবে তা অকেজো হতে চলেছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও দালালদের বিভ্রান্তিমূলক তথ্যে সবকিছুই প্রায় বাইরে থেকে করতে হয় রোগীদের। পার্বতীপুর:৫০ শয্যা বিশিষ্ট পার্বতীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৪টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও আছেন মাত্র ৯ জন। তবে তারাও সেখানে নিয়মিত নন। এখানেও অপারেশন হয় না। কারণ অজ্ঞানকারী চিকিত্সকের পদ শূন্য। উপজেলা হাসপাতালটিতে খাবারের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কমপ্লেক্সের যন্ত্রপাতিগুলো অভিজ্ঞ অপারেটরের অভাবে প্রায় অকেজো। টিএইচএ ডা. আতিউর রহমান জানান, এ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। স্টাফ কোয়ার্টারগুলিতে দুই -একজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন। ফুলবাড়ী:৩১ শয্যাবিশিষ্ট ফুলবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬টি চিকিত্সকের পদ আছে। কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। ৪র্থ শ্রেণির ২১টির মধ্যে ৬টি পদ শূন্য। সব মিলিয়ে চিকিত্সক সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সেবা ঝিমিয়ে পড়েছে। অপারেশন হয় না। হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও জনবল সংকটের কারণে এখনো তা চালু করা সম্ভব হয়নি। বিরামপুর:৩১ শয্যা বিশিষ্ট বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬টি চিকিত্সক পদের মধ্যে ৯টিই শূন্য। তবে এখানে অজ্ঞানকারী ডাক্তার আছেন। ফলে অপারেশন হয়। তবে শুধু সিজারিয়ান। এ্যাম্বুলেন্সটি সচল আছে বলে জানিয়েছেন আরএমও ডা. সিরাজুল ইসলাম। এক্সরে মেশিন চালু থাকলেও আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিনটি অপারেটরের অভাবে বন্ধ আছে। হাকিমপুর: ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সকের ১৩টি পদের মধ্যে ১১টিই শূন্য। এখানে চিকিত্সকের অবর্তমানে কতিপয় কর্মচারী চিকিত্সা সেবা প্রদান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে অপারেশন হয় না। কারণ অজ্ঞানকারী ডাক্তার নেই। হাসপাতালের স্টাফ নার্সরা নিজেদের খেয়াল-খুশিমত অফিস করেন। টিএইচএ ডা. সোলেমান আলী মণ্ডল জানান, কমপ্লেক্সের এ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। স্টাফ কোয়ার্টারগুলিও বাসযোগ্য নয়। সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্টাফরা বসবাস করছেন। নবাবগঞ্জ: ৩১ শয্যা বিশিষ্ট নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৮টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও আছেন মাত্র ২ জন। অপারেশন হয় না। হাসপাতালটির যন্ত্রপাতিগুলিও ব্যবহার না করায় অকেজো হয়ে পড়ছে। রোগী অসন্তোষ প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে। ঘোড়াঘাট: ৩১ শয্যা বিশিষ্ট ঘোড়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩টি চিকিত্সকের পদ থাকলেও মাত্র ২ জন কর্মরত আছেন। সার্জারি বিভাগে বিশেষজ্ঞ না থাকায় অপারেশন হয় না। অজ্ঞানকারী চিকিত্সকও নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. নূর নেওয়াজ আহমেদ জানান, কমপ্লেক্সের এ্যাম্বুলেন্স দুইটির একটি অকেজো আর একটি ড্রাইভার সংকটের কারণে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। স্টাফ কোয়ার্টারগুলি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। দিনাজপুর আধুনিক সদর হাসপাতাল : দিনাজপুরের অতি প্রাচীনতম স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান দিনাজপুর সদর হাসপাতাল। যা বর্তমানে দিনাজপুর আধুনিক সদর হাসপাতাল নামে অভিহিত। দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই সদর হাসপাতালটি ছিল দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (অস্থায়ী)। পূর্ণাঙ্গভাবে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চালু হওয়ায় সদর হাসপাতালটি পূর্বের ন্যায় এককভাবে তার কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ হাসপাতালটিতে রোগীর সংখ্যা কম নয়। প্রতিদিনই রোগীর ভিড় যেন বেড়েই চলেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়ার জন্য যা প্রয়োজন, তা পুরোপুরি নেই এই হাসপাতালটিতে। দিনাজপুরের স্বাস্থ্য সেবা প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডা. মো. মোশায়ের-উল-ইসলাম জানান, তীব্র জনবল সংকট থাকায় জেলার চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও সীমিত জনবল দিয়েই রোগীদের সাধ্যমত চিকিত্সা দেয়ার চেষ্টা চলছে। তবে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।