শীতলক্ষ্যা তীরে ওয়াকওয়ে ও ইকো পার্ক নির্মাণ কাজ বন্ধ

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আটি এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে গড়ে ওঠা একটি পেপার মিলের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে কাঁচপুর ব্রিজের দক্ষিণে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ। আলোচিত ৭ খুনের পর কাঁচপুর এলাকায় নূর হোসেনের বালু সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেয়ার পর কর্তৃপক্ষ ওই এলাকায় একটি ইকো পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেও ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির দখলদারিত্ব ও মামলার কারণে এগুচ্ছে না পরিকল্পনা। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ বলছে, হাইকোর্টের নির্দেশে তারা নদী দখলমুক্ত ও সীমানা পিলার নির্ধারণী কাজ চালিয়ে গেলেও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা কিছুই করতে পারছে না। জানা গেছে, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা নির্ধারণে ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ৮ কোটি ৮৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৬০ কিলোমিটার সীমানা জুড়ে ৫ হাজার ৪১টি পিলার স্থাপন করা হয়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী নদী বন্দরের ফোরশোর এলাকা অবৈধ দখলমুক্ত রাখার লক্ষ্যে ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালের মে মাসে কাঁচপুর এলাকায় ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সিদ্ধিরগঞ্জের আটি ও আজিবপুর মৌজায় নদীর তীরভূমি দখল ও ভরাট করে গড়ে ওঠা ১২ একর জমিতে আম্বর পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলের কারণে বন্ধ হয়ে যায় ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ। সম্প্রতি মিল কর্তৃপক্ষ সীমানা নির্ধারণী পিলার ভেঙ্গে তার উপর দেয়াল নির্মাণ করে নতুনভাবে স্থাপনা নির্মাণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের আটি ও আজিবপুর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা পিলার ভেঙ্গে তার উপরই দেয়াল নির্মাণ করে নদীর মাঝখানেই বিশালাকার ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। ফ্যাক্টরিটির বেশিরভাগই নদীর সীমানার মধ্যে অবস্থিত। বেশ কিছু সীমানা পিলার ভেঙ্গে তার উপর দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। আলোচিত ৭ খুনের ঘটনার পর শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে কাঁচপুর ব্রীজ এলাকায় নূর হোসেনের দখলে থাকা বালুমহাল গুঁড়িয়ে দেয়ার পর বিআইডব্লিউটিএ নদীর তীরে সৌন্দর্য্য বর্ধনসহ ইকোপার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা করলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। জানা গেছে, আম্বর পাল্প অ্যান্ড পেপার মিল ২০০২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে প্রায় আড়াই লাখ ঘন মিটার তরল বর্জ্য শীতলক্ষ্যা নদীতে নির্গমন করে। এ কারণে ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদফতর। পরিবেশ অধিদফতর নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের সিনিয়র কেমিস্ট মহিউদ্দিন মানিক জানান, আম্বর পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলটি লাল শ্রেণীভুক্ত। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছিল। পরে ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে তারা ছাড়পত্র নিয়েছে। আম্বর পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলের জিএম (ভূমি) নূরুল জানান, ১৯৮৯ সালে ডিসি ঐ জমি তাদের ৯৯ বছরের জন্য লীজ দিয়েছেন। এরপর থেকে তারা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে যাচ্ছেন। সীমানা পিলারের উপর দেয়াল নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডিসি আমাদের সীমানা মেপে দিয়ে গেছেন। সেই আলোকে আমরা দেয়াল নির্মাণ করেছি। ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, বিআইডব্লিউটিএ আমাদের জমির উপর ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে এসেছিল। এজন্য আমার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন জানান, মিলের মালিক আবুল হাশেম ও তার দুই ছেলে আজিজ আল মামুদ ও শওকত আজিজ বিআইডব্লিউটিএ-এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রীট পিটিশন (নং-৮৪৩১/১২) দায়ের করলে হাইকোর্ট ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে; কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ ওয়াকওয়ে ও ইকোপার্ক নির্মাণের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে আবুল হাশেম ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করলে বন্ধ হয়ে যায় ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও নদীর তীর সৌন্দর্যবর্ধনসহ ইকোপাক নির্মাণের কাজ। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সিদ্দিকুর রহমান জানান, জেলা প্রশাসক ৯৯ বছরের জন্য লীজ দেয়ার পরে তা আবার বাতিলও করা হয়। এরপর আম্বর কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার রায় তাদের পক্ষে যায়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে আপিল করা হয়। ওই সময় ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার্কুলার জারি করা হয়- ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত যেসকল বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছিল তা বহাল থাকবে। এতে করে হাইকোর্ট জেলা প্রশাসকের আপিল খারিজ করে দেন। পরিবেশ আইনজীবী মঞ্জিল মোর্শেদ হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন যার নম্বর ৩৫০৩। এরপর সিএস ও আর এস অনুসারে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সীমানা নির্ধারণী পিলার স্থাপন করা হয়। পরে শুরু হয় ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ। আমরা আম্বর পাল্প এন্ড পেপার মিলের দেয়াল ভাঙতে গেলে তারা হাইকোর্টে রীট দায়ের করে। আমরা ওয়াকওয়ের নির্মাণ কাজ চালিয়ে যেতে থাকলে তারা আদালত অবমাননা মামলা দায়ের করে। এতে করে ওই এলাকায় ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখন আম্বরের রীট আদেশ ভ্যাকেন্ট করা হলে আমরা ওয়াকওয়ে এবং ইকো পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারবো।