সালাম মুর্শেদির কলাম
ফলাফল ছাড়িয়ে আলোচনায় দুর্বল রেফারিং
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৮
ব্রাজিল সেমিফাইনালে, তবে সেখানে থাকছেন না নেইমার। আমার মনে হয় গত শুক্রবার রাতকে একটি বাক্যে এভাবেই প্রকাশ করা যায়। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের জন্য রাতটা ছিল খুব বেশি আবেগের। টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে এসে দলের এবং বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা তারকাটিকে হারানোয় ভক্তদের আবেগ অনুভূতির এই অতিরিক্ত বহি: প্রকাশ মোটেই অমূলক নয়। সেই আবেগের মাত্রাটা এতই বেশি যে, রাতের আরেকটি কোয়ার্টার ফাইনালকে সেটা আলোচনার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। যেই ম্যাচে ফ্রান্সকে হারিয়ে ব্রাজিলের সেমিফাইনাল প্রতিপক্ষ হিসাবে আগেই নিজেদের তুলে এনেছে জার্মানি। পুরো টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের যে কয়েকজন খেলোয়াড় দারুণ ধারাবাহিক ছিলেন তাদের মধ্যে নেইমার একজন। কেউ অবশ্য বলতে পারেন বাজে পারফরম্যান্সের দিক থেকে তার চেয়ে বেশি ধারাবাহিক ছিলেন ফ্রেড! তবে কৌতুক রেখে আমরা যদি মাঠের খেলার দিকে তাকাই, আমি বলবো ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ স্বপ্ন গত মঙ্গলবার রাতে বড় একটা ধাক্কা খেলো। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের উজ্জ্বল্যও কিছুটা ম্লান হয়ে গেল। এর পুরো দায়ভার নিতে হবে রেফারিকে। তার বাজে সিদ্ধান্তেই নেইমারকে এমন ভাগ্য বরণ করতে হলো। আমি নিশ্চিত ব্রাজিল এবং কলম্বিয়ান দুই দলের সমর্থকরাই আমার সাথে একমত হবেন এ কথায়।
অবশ্য খেলার শুরু থেকেই রেফারি বেশ আস্থাহীনতার পরিচয় দিতে থাকেন। নিশ্চিত ফাউলগুলো তার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিল। তার ম্যাচ পরিচালনা দেখে মনে হচ্ছিল, কার্ড ব্যবহার করতে চাচ্ছিলেন না তিনি। আত্মবিশ্বাস কিংবা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকলেই কেবল এমনটা হতে পারে। আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটাই ম্যাচের পরবর্তী অংশে খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক করে তোলে।
দু’দলই বেশ কিছু মারাত্মক ফাউল করেছে দ্বিতীয়ার্ধে। রেফারির চোখ এড়িয়ে গেলেও সেটা দর্শকদের চোখ এড়ায়নি। ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য দু:সংবাদ হচ্ছে রেফারির ভুল সিদ্ধান্তের বেশিরভাগই গেছে তাদের বিপক্ষে। পাশাপাশি থিয়াগো সিলভার হলুদ কার্ডের ব্যাপারটাও বলতে হবে। রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা গেছে, সিলভা মোটেই ইচ্ছাকৃতভাবে গোলরক্ষকের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াননি। অথচ, এর জন্য ফাউলের পাশাপাশি ব্রাজিল অধিনায়ককে দেখতে হয়েছে হলুদ কার্ডও। আগে একটি হলুদ কার্ড পাওয়ায় জার্মানির বিরুদ্ধে ম্যাচটি খেলতে পারছেন না প্যারিস সেন্ট জার্মেইর এই তারকা। সব মিলে স্প্যানিশ রেফারি কার্লোস ভালাস্কো কারবালো রেফারিংয়ের একটি চূড়ান্ত বাজে দৃষ্টান্তই স্থাপন করলেন।
যদি নেইমার-সিলভা থাকতেন, তাহলে আমি আট জুনের প্রথম সেমিফাইনালে ব্রাজিলকেই এগিয়ে রাখতাম। তবে, দলের প্রধান দুই তারকাকে হারিয়ে ব্রাজিল এখন অনেকটাই হতাশ, বিধ্বস্ত। যতই বাকি খেলোয়াড়রা বলুক, নেইমার-সিলভার অনুপস্থিতি তাদের আরো ভাল খেলতে উত্সাহিত করবে, এটা আসলে খুব কঠিন। দলের একমাত্র ধারাবাহিক গোলদাতা এবং রক্ষণ প্রধানের অনুপস্থিতি তাদের না ভুগিয়ে পারেই না।
তার মানে এই নয়, ব্রাজিল জিততে পারবে না। পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তারা, দর্শক সমর্থনও তাদের পক্ষে। সুতরাং, জার্মানির জেতাটা খুব কঠিন হবে। আমি একটা কথা সবসময়ই বলি, ভালো দলের অন্যতম বড় শক্তিমত্তা তাদের রিজার্ভ বেঞ্চ। অন্যকথায় বলা চলে, রিজার্ভ বেঞ্চ হচ্ছে একটা দলের শক্তিমত্তার অন্যতম পরিচায়ক।
ব্রাজিলের রিজার্ভ বেঞ্চ যথেষ্ট শক্তিশালী। আক্রমণাত্মক বেশ কিছু খেলোয়াড় থাকায় নেইমারের অভাব হয়তো অনেকটা ঘোচানো সম্ভব, তবে সিলভার অভাব? আমি বলবো অসম্ভব।
রাতের প্রথম ম্যাচ দেখতে গিয়ে আমি গ্যারি লিনেকারের একটা কথা ভাবছিলাম। বিখ্যাত এই ইংলিশ ফুটবলার একবার বলেছিলেন, ফুটবল এমন একটা খেলা যেখানে ২২ জন খেলোয়াড় ৯০ মিনিট বলের পেছনে দৌড়ায় এবং ম্যাচ শেষে জয়ী দলটির নাম হয় জার্মানি!
লিনেকার কৌতুক করে বললেও জার্মানির ক্ষেত্রে প্রায়শই এটা সত্যি। আমি বলবো না জার্মানি শ্রেয়তর দল ছিল না, তবে একটু এদিক-সেদিক হলে এই রাতে ফ্রান্সও জিতে যেতে পারতো।
করিম বেনজামা একাধিক সুযোগ পেয়েছিলেন। সেগুলো তিনি নষ্ট করেছেন বলবো না। কারণ জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয় বেশ কয়েকটি আক্রমণ ঠেকিয়েছেন। নিজের ভূমিকায় ন্যুয়েরের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। যোগ্যতার প্রমাণ আরেকবার দিলেন তিনি।
সব মিলে বলা যায়, দু’দলের অভিজ্ঞতার পার্থক্যই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। যেমন, কোন গোল না পেলেও জার্মানির পক্ষে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার। আক্রমণ-রক্ষণে কি দারুণভাবেই না ভারসাম্য রক্ষা করলেন এই বায়ার্ন মিউনিখ সুপারস্টার। প্রয়োজনে রাফ ট্যাকল করতেও দ্বিধা করেননি। অবশ্য প্রথাগত জার্মান হোল্ডিং মিডফিল্ডারদের ভূমিকাটাই এমন। তাদের খেলায় সৌন্দর্য্য না থাকতে পারে, কিন্তু এর কার্যকারিতা প্রমাণিত। দেখা যাক, সেমিফাইনাল শেষে কি থাকে? জার্মানির নিয়মতান্ত্রিক আক্রমণ নাকি ব্রাজিলের সুন্দর ফুটবল।