রোজা অফিস বিশ্বকাপ
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৪, ১৯:৫৯
আজ কোয়ার্টার ফাইনাল, আমি ব্রাজিলের স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছি। স্টেডিয়ামে টানটান উত্তেজনা। মাত্র গোল হতে যাচ্ছে... ও... ও... ও... গোল। চারদিকে হইচই আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস। সুখের ঘুমটা গেল ভেঙ্গে। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি, অফিসের চেয়ারে বসে আছি। চোখ বন্ধ করে অফিসের চেয়ারে বসে কল্পনার জগতে বিচরণ করতে করতে কখন যেন একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। সেই ঘুমের দৃশ্য, সহকর্মীদের ক্যামেরায় বন্দী করা হয়েছে। তাই আমাকে ঘিরে চলছে ফিসফিস কথা, আর হাসাহাসি। দূর থেকে তারা সেই ছবি দেখিয়ে হাসছে। যেন এক ধরনের ব্ল্যাকমেইলিং। এখন অবশ্য অফিসের প্রায় সবার একই দশা। এ পর্যন্ত অনেকের আধা ঘুমন্ত ছবি তোলা হয়ে গেছে। চেয়ারে বসে বসে ঝিমাতেই হচ্ছে কেননা বিশ্বকাপ, রোজা সবই পাশাপাশি চলছে। রোজার সময় শেষ রাতে উঠে সেহরী করে, রোজা রেখে সারাদিন অফিস করতে হলে এমনিই শরীর খুব দুর্বল লাগে। এর মধ্যে চলছে বিশ্বকাপ। সেহরীর সময় আর আলাদাভাবে উঠতে হচ্ছে না। দুই খেলা দেখতে দেখতে মাঝে সেহরীও খাওয়া হয়ে যাচ্ছে। চার বছর পর পর আসে বিশ্বকাপ। তাই সব খেলাই দেখতে ইচ্ছা করে। শেষ রাতে ঘুমিয়ে কি আর ঘুম ভাঙ্গে। কিন্তু অফিস তো আর খেলা দেখে না, যে দেরিতে শুরু হবে। অফিস এখন সাড়ে নটায়। তাই ঠিকমতো ঘুম আসার আগেই, ঘুম থেকে উঠে কোনোরকমে তৈরি হয়েই বাস ধরতে হয়। রোজ খেলা দেখা, সেহরী, অফিস সব একই সাথে চালিয়ে যাচ্ছি। অফিসে মাঝে মাঝে একটু, আধটু ঝিমানী এলেও মুক্তির উপায় নেই। সব কাজ সময়মতো করতেই হবে। তাই এখন প্রতিদিনের সব কাজের মধ্যে মনে হয় ঘুমটাই একটু বাদ পড়ছে। তবে এভাবে বেশিদিন চললে আর সুস্থ থাকব না। এভাবেই হাসতে হাসতে ফারজানা তার অফিস, রোজা এবং বিশ্বকাপ সব একসাথে চলতে থাকায় তার জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন।
বিশ্বকাপের পাশাপাশি রোজা হওয়ায় এবারের রোজার দিনগুলো সবারই কাটছে একটু অন্যরকম। তাই এবারের রোজার দিনগুলোর অভিজ্ঞতা জানতে আলাপ হচ্ছিল ব্যাংকার সাদিয়া আক্তারের সাথে। তিনি বলেন, রোজার সময় তো এমনিই ব্যাংকে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। রেমিটেন্স, চেক, ক্যাশ লেনদেন সবই অনেক বেশি বেশি। অফিস একটু কম সময় হলেও কাজের চাপ যেন আরও অনেকগুণে বেড়ে যায়। সারারাত জেগে সবাই মিলে মজা করে খেলা দেখায় সেই চাপ আরও বহুগুণে বেশি মনে হয়। এবার বিশ্বকাপ, রোজার সময় হওয়ায় বেশ কিছু সুবিধা ও অসুবিধাও হয়েছে। সেহরীর সময় ঘুম থেকে ওঠার মত কঠিন কাজ আর করতে হয় না, কেননা সেহরী পর্যন্ত আর ঘুমানোই হয় না। খেলা দেখতে দেখতেই সেহরীর সময় হয়ে যায়। তাই বেশ আনন্দের সাথেই আমরা সেহরী করে খেলা দেখে প্রায় শেষ রাতে ঘুমাতে যাই। এখন সেমিফাইনাল চলছে। এসময় তো আর খেলা দেখা বাদ দেয়া যায় না। এই ঘুম ঘুম চোখেই সারাদিন রোজা রেখে অফিস করি। বাসায় এসে আবার ইফতারী বানানো, রাতের খাবার, সেহরীর জন্য রান্না সবই থাকে। তাই বেশ কঠিন চাপের মধ্য দিয়েই কাটছে সময়। চাপ কমাতে খেলা দেখা বাদ দেয়া যায়। তবু এত বছর পরপর হয় বিশ্বকাপ, সে খেলা দেখার সুযোগ কি আর ছাড়া যায়।
ব্র্যাক কর্মী তানজিদা আক্তার বলছিলেন, তার এবারের বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, আমাদের অফিস ঘিরে বিশ্বকাপের উত্তেজনা। বিশ্বকাপে কে কোন দলের সাপোর্টার সে নিয়ে বিশ্বকাপের শুরুতেই গ্রুপ ভাগ করা হয়ে গেছে। এমনকি মজা করে কম্পিউটারে এডিটিং করে বিভিন্ন খেলোয়াড়ের সাথে আমাদের চেহারা বসিয়ে পোস্টার বানানো হয়েছে। সেই পোস্টার যার যার ডেস্কে লাগানো হয়েছে। আমাকে সাজানো হয়েছে ব্রাজিলের গোল কিপার। আমার ডেস্কে তার ছবি। বিভিন্ন খেলায় কোনো খেলোয়াড়ের ভুল পাসিং বা সুযোগ মিস করার জন্য তার দায় চাপানো হয় আমাদের অফিসের কোনো কর্মীর ওপর। মজা করে তাকে খেলোয়াড় বানিয়ে খ্যাপানো হয়। অফিসে যারা রাতের পালায় কাজ করে, তারা সেসময় তাদের পিসিকেই খেলার মাঠ বানিয়ে নেয়। এছাড়া অফিস থেকে বাসায় ফিরে সারারাত খেলা দেখার মজা তো হচ্ছেই। এর মধ্যে শুরু হয়েছে রোজা। সারারাত জেগে খেলা দেখা, সেহরী সবই যেন এক উত্সব। তবে এরকম রাত জেগে খেলা দেখতে গিয়ে আমাদের অফিসের অনেকেরই বেশ অসুস্থ হাল। প্রায়ই কেউ না কেউ বেশ দেরি করেই অফিসে আসছে। তার জন্য বসের বকাও চলছে। অফিসে সবার কথা, এই শেষ রাতে চারটা-পাঁচটায় ঘুমিয়ে কি আর নয়টায় অফিস করা যায়। এখন দিন বড়, রোজার সময় অনেক বেশি। আসলেই এবারের বিশ্বকাপ, রোজা সব একসাথে হওয়ায় তা বেশ কঠিন পরীক্ষার মাঝেই ফেলে দিয়েছে বিশ্বকাপ দর্শকদের।
ছবি: রেজা চৌধুরী