নেইমারের বিকল্প কে?
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২০:০২
সকালটা ব্রাজিলের জন্য হাজির হয়েছিল অন্যরকম একটা অনুভূতি নিয়ে। আগের রাতেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় একদিক থেকে কিছুটা স্বস্তির বাতাস নিয়ে আসলো সকালটা। কিন্তু উল্টো পিঠে আছে হতাশা, ক্ষোভ, রাগ, দুশ্চিন্তা ও প্রতিজ্ঞা! মেরুদণ্ডের ইনজুরি নিয়ে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে নেইমারের। ইতি ঘটেছে সেলেচাওদের মূল ভরসার।
কিন্তু ব্রাজিলকে যে জয় করতে হবে হেক্সা! দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি। নেইমার ছাড়া আকাশচুম্বি এই প্রত্যাশা কিভাবে মেটানো সম্ভব? ব্রাজিল অবশ্য হাল ছাড়ছে না। তারপরও লুইস ফিলিপ স্কোলারির দলের সামনে একটা প্রশ্ন আসছে বার বারই — এই অবস্থা থেকে সত্যিই কি ব্রাজিলের পক্ষে বিশ্বকাপ জয় করা সম্ভব?
প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি পোড়াচ্ছে কোচ স্কোলারিকে। পছন্দের শীর্ষকে হারানোয় তিনি নিজেও খানিকটা ভেঙে পড়েছেন। কদিন আগেই তিনি নেইমারের প্রসঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমরা শুধু নেইমারকে বল পায়ে খুশি মনে খেলতে দেখতে চাই। ও আমাদের জন্য বিশেষ একজন খেলোয়াড়।’
কিন্তু স্কোলারিও পেশাদার। শোক কাটিয়ে তাকে এবার চোখ রাখতে হচ্ছে সেমিফাইনালের দিকে। আগামী মঙ্গলবার তাদের সামনে অপেক্ষা করছে প্রতাপশালী জার্মান দল। নতুন করে ছক কাটতে হবে! কে নামবেন নেইমারের পরিবর্তে। অধিনায়ক থিয়াগো সিলভার জায়গা নেবেন কে? অধিনায়কের আর্মব্যান্ড থাকবে কার হাতে? সব কিছু নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে।
স্কোলারি তো বটেই গোটা ব্রাজিলের কাছেই অজানা এই প্রশ্নের উত্তর।
১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে ঠিক একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল ব্রাজিলকে। প্রথম পর্বেই ইনজুরি নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে। গ্যারিঞ্চা সেবার ঝলক দেখিয়েছিলেন। পেলের পরিবর্তে আসা আমারিলদো তাভারেজ দ্য সিলভেইরাও ছিলেন দারুণ। টুর্নামেন্টে করেছিলেন তিনটি গোল। তবে, এবার কে সেই কাজটা করবেন সেটা সেই আমারিলদোরও জানা নেই। ইএসপিএন রেডিওকে তিনি বলেন, ‘কাউকে দেখতে পাচ্ছি না নেইমারের বিকল্প হিসেবে। একজন কিছুটা কাজ করতে পারতো — রবিনহো। কিন্তু ও তো এবার দলেই নেই।’
কিন্তু কাউকে না কাউকে তো কাজ চালাতে হবে।
বেলো হরিজন্তেতে জার্মানির বিপক্ষে আগামী মঙ্গলবার সেমিফাইনালে তার অভাবটা কে পূরণ করবে? কার ওপর ভরসা রাখবেন স্কলারি? একটা বিষয়ে মোটামুটি একমত হওয়া যাচ্ছে যে স্কোলারির হাতে বিকল্প খুবই কম। নেইমারের মতো ঝলক দেখিয়ে, কখনো একটি পাসে অথবা দারুণ একটি কর্নার বা ফ্রি-কিকে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়ার মতো খেলোয়াড় ব্রাজিলের দলে খুব বেশি নেই। তিনি কখনো নেমে আসেন রক্ষণভাগে, কখনো রুখে দেন প্রতিপক্ষের আক্রমণ। এমন সব্যসাচী খেলোয়াড় ব্রাজিলে আর কই!
বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটির ফার্নান্দিনহোকে। তাকে আরেকটু ওপরে তুলে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানো হতে পারে।। আবার চেলসির তারকা উইলিয়ানও আছেন। আবার একই কাজ করতে পারেন পাওলিনহো বা লুইস গুস্তাভো। আরেছন চেলসির আরেক তারকা রামিরেজ। আবার এমনও দেখা যেতে পারে যে ২০০২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী কোচ একই সাথে নামিয়ে দিলেন জো আর ফ্রেডকে।
অস্কার আর হাল্ককে অ্যাটাকিং মিড থেকে একটু নামিয়ে নিয়ে খেলানোর কথা বলছেন। সাবেক খেলোয়াড়দের অনেকে মিডফিল্ডার বার্নার্ড, উইলিয়ান বা হারন্যানেসের ম্যাচ খেলে ফেলার সম্ভাবনা দেখছেন। এদের দু’জন কেউ নেইমারের অভাব পূরণ করতে পারেন বলে মনে করছেন তারা। বার্নার্ডের বয়স মাত্র ২১ হলেও দলের খেলায় ভালো গতি নিয়ে আসতে পারবেন বলে মনে করেন কেউ কেউ। এমনিতেও স্কোলারির পছন্দের খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন তিনি।
শাখতার দোনেস্কের এই ফরোয়ার্ডকে নিয়ে এর আগে স্কোলারি বলেছিলেন, ‘তার পায়ে আনন্দ আছে।’ তবে ব্রাজিলের ১৯৭০ বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তো তরেসের পছন্দ উইলিয়ানকেই। চেলসির এই মিডফিল্ডার দারুণ ফর্মে রয়েছেন। নেইমারের বিকল্প হিসেবে উইলিয়ানকে ভাবার পেছনে যুক্তিও দেন আলবার্তো, ‘ওর প্রতিভা আছে এবং ও আবার পেছনে এসে মার্কও করতে পারে। নেইমারের বিকল্প হিসেবে উইলিয়ানের চেয়ে ভালো আর কাউকে আমি দেখি না।’
নেইমারের বিকল্প হিসেবে স্কলারি যাকেই খেলান না কেন, এখন থেকে ব্রাজিলকে দলীয় খেলার ওপরই নির্ভর করতে হবে। দলের মাঝ মাঠের অন্যতম ভরসা অস্কারও তাই মনে করেন, ‘আমরা নেইমারের অভাব বোধ করবো; কিন্তু হতাশ হতে পারি না। আমরা এখন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। আমরা ভালো খেলেছি এবং নেইমারের জায়গায় যেই আসুক, জার্মানিকে হারাতে হলে তাকে দলের অংশ হয়ে খেলতে হবে।’
খেলোয়াড়, কিংবা সমর্থক সবাই বিশ্বকাপটা জিততে মুুখিয়ে আছে। নেইমারের জন্য উপহার হিসেবে তারা নিয়ে যেতে চায় বিশ্বকাপ। নেইমারের জন্য লড়াইয়ের মিশনে ওই নেইমারেরই সবচেয়ে বেশি অভাব অনুভূত হবে। কিন্তু, যুদ্ধের মঞ্চ থেকে তো আর ফিরে আসা যায় না। ব্রাজিলও তাই যুদ্ধ জয় করতে প্রস্তুত। নেইমারের জন্য যুদ্ধ!