দুর্বৃত্তরা লা-পাত্তা! খোঁজ নেয়নি কেউ নিহত পরোপকারীর

রাজধানীর উত্তরায় এক নিরাপত্তাকর্মীকে গুলি করে হত্যার পর কলেজ ছাত্রীকে অপহরণের ঘটনায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে অপহরণের ছয় ঘণ্টা পর উদ্ধার হওয়া কলেজ ছাত্রীর কথিত এক প্রেমিককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। অপরদিকে চোখের সামনে তরুণী অপহরণ হতে দেখে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ছুটে যাওয়া ও দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত নিরাপত্তাকর্মী লিটনের খোঁজ নেয়নি কেউ। পুলিশ থেকে শুরু করে যাদের বাঁচাতে গিয়ে লিটন দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন তারাও লিটনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়ির সামনে হবু বর ও মায়ের সঙ্গে বাসায় ফেরার পথে অপহরণের শিকার হন ক্যামব্রিয়ান কলেজের ছাত্রী ফাতেমা-তুজ-জোহরা। চোখের সামনে অপহরণ দৃশ্য দেখে বাধা দিতে গিয়ে অপহরণকারীদের গুলিতে নিহত হন নিরাপত্তা প্রহরী লিয়াকত হোসেন লিটন। ভোরে অপহরণকারীরা ফাতেমাকে ছেড়ে দেয়। এ ঘটনায় অপহূত তরুণীর মা নুরুন্নাহার বাদী হয়ে উত্তরা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা উত্তরা থানার ওসি শাহাদত হোসেন জানান, অপহূত তরুণীর কথিত এক প্রেমিককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তার কাছ থেকে এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড ও অপহরণ সংক্রান্ত কোন তথ্য উদ্ধার করা যায়নি। মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, অপহূত তরুণীর একাধিক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন। কোন্ প্রেমিক তাকে অপহরণের চেষ্টা করেছিল তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে প্রেমের কারণেই যে তাকে অপহরণের চেষ্টা হয়েছিল এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে ভাড়াটে সন্ত্রাসী ব্যবহার করা হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। তরুণীর মোবাইল কললিস্ট ঘেটে অন্তত ৮-১০ জনের সঙ্গে দিন-রাত টানা কথা বলার প্রমাণ তারা পেয়েছেন। এদের মধ্যে ক্যামব্রিয়ান কলেজের দুই শিক্ষক মাহফুজুল হক ও বিপ্লবও রয়েছেন। বন্ধু আদ্রি, রুম্মন ছাড়াও আরো কয়েকজন এই তালিকায় রয়েছে। এদের মধ্যে রুম্মনের সঙ্গে গত বছর তার বিয়ের কথা পাকাপোক্ত এবং আংটি বদল হয়েছিল। পরে রুম্মনসহ অন্যদের বাদ দিয়ে মাহফুজুল হকের সঙ্গে তার বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়। অপহরণ ঘটনার সময় পরোপকার করতে আসা নিহত নিরাপত্তাকর্মী লিয়াকত হোসেন লিটনের খোঁজ নেয়নি কেউ। লিটনের পরিবারের সদস্যরা জানান, একসময় দুবাই ছিলেন লিয়াকত। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে ডেসটিনিতে উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে ধরা খান। এতে তার কয়েক লাখ টাকা ঋণও হয়ে যায়। ঋণ পরিশোধ করতে পরিবারের সদস্যদের তথ্য গোপন করে বাসা-বাড়িতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিয়েছিলেন লিটন। নিহত লিটনের শ্যালক হুমায়ুন জানান, তার বোন মোর্শেদা আক্তার রংপুরের পীরগাছা কালীগঞ্জ নামাপাড়ায় সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তাদের দুই সন্তান মিম ও জিম। স্কুলে পড়ছে। তার দুলাভাই আবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি জানান, তার দুলাভাই যে অন্যের উপকার করতে গিয়ে নিজের জীবন দিল তবু তার প্রতি কেউ এতটুকু খোঁজও রাখেনি। মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়ার কথা পুলিশের। সেই পুলিশও তাদের সঙ্গে কোন যোগাযোগ করেনি। যাদের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে তারাও কোন যোগাযোগ করেনি। শুধু যে বাড়িতে সে সিকিউরিটির দায়িত্বে ছিলেন তারা এক মাসের বেতন দিয়েছে। তিনি বলেন, এমন সাহসিকতার মূল্যায়ন হয় না বলেই সমাজে কেউ কারো বিপদে এগিয়ে আসেন না। এজন্যই চোখের সামনে কাউকে নির্মমভাবে মরতে দেখলেও এগিয়ে যেতে চান না। তিনি দুলাভাই লিটনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান দেয়ার দাবি জানান।