জরুরি চিকিত্সা দেন ওয়ার্ড বয়-আয়ারা!
আবুল খায়ের ও শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২২:৫৯
ময়মনসিংহে জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৩৬টি চিকিত্সকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কর্মরত চিকিত্সকদের মধ্যেও ৯৫ ভাগই বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিত থাকেন। তবে তারা প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়মিত চিকিত্সা দেন। অথচ চিকিত্সক সংকটের জন্য অনেক হাসপাতালে জরুরি বিভাগে বেশিরভাগ সময় আয়া-ওয়ার্ড বয়রা চিকিত্সা দিচ্ছেন। তারাই রোগীদের কাছে ‘চিকিত্সক’ হিসেবে পরিচিত। অনেক জায়গায় মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নেই। এসব কারণে যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করতে করতে অকেজো হয়ে গেছে। আবার যন্ত্রপাতিসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কোথাও কোথাও কমিশনের লোভে রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া সরবরাহকৃত ওষুধ রোগীদের না দিয়ে বাইরে পাচার করা হচ্ছে। হাসপাতালের কেনাকাটা ও রোগীদের খাবার সরবরাহের নামে হরিলুট চলছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, ময়মনসিংহে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৪২টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সাব সেন্টার ও ৪৫৫টি ওয়ার্ডভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এতসব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও এই জেলার সিংহভাগ রোগীই সরকারি চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ সামগ্রীসহ জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের বেশিরভাগ সময়মত হাসপাতালে আসেন না। ইন্টার্ন চিকিত্সকদের উপর এ হাসপাতালের চিকিত্সা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পরানগঞ্জ হাসপাতালে জরুরি বিভাগ বন্ধ: জনবলের অভাবে সদর উপজেলার পরানগঞ্জে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে জরুরি ও ইনডোর বিভাগ বন্ধ রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ হলেও এখানে প্রয়োজনীয় জনবল এখনো নিয়োগ করা হয়নি। তবে ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দেয়া হলেও তারা নিয়মিত নন। ওষুধ বরাদ্দ নেই এ হাসপাতালে। ফলে রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
ভালুকা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৫০ শয্যার ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ট্রমা সেন্টার। কিন্তু সেবার মান যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। জনবলের অভাবে রোগীদের জন্য বাড়তি কিছু করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তাসহ একাধিক ডাক্তার প্রায় সময়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে মেশিনটি ৮ মাস যাবত্ অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ডাক্তারদের অনুপস্থিতিতে জরুরি বিভাগ থাকে আয়া ও ওয়ার্ড বয়দের দখলে। তারাই ডাক্তার হিসেবে চিকিত্সা দেন গ্রামের রোগীদের।
ফুলবাড়ীয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: প্রায় ৫ লাখ মানুষের চিকিত্সার একমাত্র অবলম্বন এই হাসপাতাল । ২১ জন ডাক্তার থাকলেও অনিয়মিত আসায় ৩/৪ জন বাদে হাসপাতালের স্টাফরাই অনেক ডাক্তারকে চিনেন না। হাসপাতালে ডিউটি থাকার পরও ক্লিনিকে প্রাইভেট রোগী দেখে সময় কাটান গাইনী বিভাগের এক নারী চিকিত্সক। সকাল ১০টায় বহির্বিভাগে টিকিট ছাড়ার কথা থাকলেও টিকিট ছাড়া হয় ১১টায়। সার্টিফিকেট ব্যবসা নিয়ে নেতাদের সাথে ডাক্তারদের বাক-বিতণ্ডা হয় হরহামেশাই। গাইনী বিভাগে অনিয়মের বিষয়ে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. আশরাফুল আলম কবির জানান, ‘ম্যাডাম আমার সিনিয়র, তাকে আমি কিছু বলতে পারবো না। আপনি বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানান।’
ফুলপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩১ শয্যা থেকে ৫১ শয্যায় উন্নীত করা হলেও ডাক্তারের পদ শূন্য ও গড় হাজিরা, এক্সরে মেশিন বিকল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব, অ্যানেসথেসিয়া ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ না থাকায় সঠিক চিকিত্সাসেবা পাচ্ছেন না এই উপজেলার রোগীরা। ২টি এ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ১টি বিকল, অন্যটি মেরামতের অভাবে যে কোন সময় বিকল হয়ে যেতে পারে। স্বাস্থ্য সহকারির ২১টি পদ, নাইটগার্ডের ১টি ও সুইপারের ৫টি পদের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাইসুল হুদা ভুঁইয়া বলেন, সমস্যা নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
নান্দাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: মাত্র চারজন চিকিত্সক দিয়ে চলছে ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালটিতে ২১টি চিকিত্সকের পদ রয়েছে। এরমধ্যে পাঁচজন কনসালটেন্ট (পরামর্শক) শ্রেণির চিকিত্সক ছুটিতে রয়েছেন। ওইসব চিকিত্সকরা মাঝে মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিছুক্ষণ অবস্থান করে সপ্তাহের পুরো কর্মদিবসের হাজিরায় স্বাক্ষর দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে বদলি জনিত কারণে নবসৃষ্ট পদে ও প্রেষণে থাকায় মোট ১২টি চিকিত্সকের (মেডিক্যাল অফিসার) পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
নান্দাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সক অনুপস্থিতির বিষয়ে ইউএইচএ ডা. আবুল কাশেম জানান, ‘কিছুদিন আগেও অনুপস্থিত থাকা চিকিত্সকদের শোকজ করা হয়েছে। এতেও কাজ হচ্ছে না। এবার কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
গফরগাঁও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৬ মাস বয়সী শিশু সন্তানকে কোলে করে গফরগাঁও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীন মশাখালী উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছেন উপজেলার বাসুটিয়া গ্রামের মনোয়ারা খাতুন। বাচ্চার সর্দি, কাশি ভালো হচ্ছে না। তাই বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। দেখা গেল ডাক্তারের খোঁজে উত্কণ্ঠিত মনোয়ারা খাতুন একবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভিতরে যাচ্ছেন আরেকবার বের হয়ে ৫০/৬০ গজ দূরে মশাখালী স্টেশনে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন ঢাকা থেকে ট্রেন আসার কোন খবর আছে কি না। ঢাকা থেকে ট্রেন আসলে সেই ট্রেনে এই হাসপাতালের বড় ডাক্তার আসতে পারেন। নির্ধারিত সময়ের ২ ঘন্টা বিলম্বে ট্রেনটি আসলেও সে ট্রেনে মশাখালী উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মইনুল সরকার না আসায় ৩ ঘন্টা অপেক্ষা করেও বাচ্চাকে শেষ পর্যন্ত ডাক্তার দেখাতে ব্যর্থ হন মনোয়ারা খাতুন। এমনিভাবেই মনোয়ারা খাতুনের মতো প্রায় অর্ধ-শতাধিক রোগী উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ২৬ জন ডাক্তারের মধ্যে ১৯ জনই কর্মস্থলে থাকেন না। অনেকের বিরুদ্ধে সপ্তাহে ১ দিন কর্মস্থলে আসারও অভিযোগ রয়েছে। উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থাও একই। শোকজ করেও কাজে আসছে না। এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ওয়ারেজ উদ্দিন ফরাজি বলেন, প্রায় সকল ডাক্তারই ঢাকামুখী। এজন্য তাদেরকে নিয়মিত কর্মস্থলে রাখা যায় না।
মুক্তাগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : প্রয়োজনীয় জনবল সংকট, চিকিত্সক সংকট, রাতে নিরাপত্তাহীনতা, মূল ফটকে প্রস্রাব-পায়খানার দুর্গন্ধ, চিকিত্সকদের গড় হাজিরা, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, ওষুধ সংকট, ইসিজি রুমে তালা, এক্স-রে অপারেটরের ছল-চাতুরী, প্রাইভেট প্র্যাকটিসে চিকিত্সকদের ব্যস্ততা, গ্যাস না থাকা, জেনারেটরের তেল সংকট, একটু বৃষ্টিতেই কম্পাউন্ডে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি এমন অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রশাসনিক অনুমোদন পেলেও শুধু প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সাড়ে গত ৫ বছরেও হাসপাতালকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ করা সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার সুফিয়া শিরিন জানান, রোগী নিয়ে ব্যাপক সমস্যা পোহাতে হয়। অধিকাংশ সময়ই রোগীদের মেঝেতে শুয়ে থেকে চিকিত্সা নিতে হয়। তবে ৫০ শয্যার কার্যক্রম চালু হলে সমস্যা অনেকটা দূর হবে।
হালুয়াঘাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আর এম.ও পদে কোন ডাক্তার নেই । ৫১ শয্যায় উন্নীত করা হলেও হাসপাতালের চিকিত্সাসেবার আদৌ কোন উন্নতি হয়নি। এ স্বাস্থ্য কমপেক্সের ৯ জন মেডিক্যাল অফিসারের মধ্যে রয়েছেন ৮ জন। সার্জারী ও এনেসথেসিয়া বিভাগে ডাক্তার না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপারেশন বন্ধ। এতে প্রায় সময়েই বিপদের সম্মুখীন হতে হয় গর্ভবতী মায়েদের।
ত্রিশাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ত্রিশাল হাসপাতালে নানা অনিয়ম, সার্টিফিকেট বাণিজ্য ও কর্মরতদের দায়িত্বে অবহেলার মধ্যদিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলছে। এক্স-রে মেশিন অচল। ইসিজি মেশিন নেই। কোন ধরনের অপারেশন না হওয়ায় বাধ্য হয়ে ফিরে যান রোগীরা। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারসহ বেশ কয়েকটি পদ শূন্য রয়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:ডেন্টাল সার্জন, সার্জারী কনসালট্যান্ট, চক্ষু ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি নিয়ে চলছে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ২১ জন ডাক্তারের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৫ জন। এর মধ্যে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার জাকিয়া সুলতানা ২০১৩ সালের ৬ মার্চ থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. লক্ষ্মীনারায়ণ মজুমদার জানান, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে।
ধোবাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. আতাউল জলিল জানান, বর্তমানে ৬ জন জুনিয়র কনসালটেন্টসহ ২২ জন ডাক্তারের পদ থাকলেও ৮ জন ডাক্তার আছেন। এর মধ্যে ডেন্টাল বিভাগের সার্জন ডা. নাসরিন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং সহকারী সার্জন ডা. পংকজ দত্ত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কিশোরগঞ্জে প্রেষণে কর্মরত আছেন। ফলে ডেন্টাল বিভাগ তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে। এছাড়া আরো দুই জন ট্রেনিং ও মাতৃত্ব ছুটিতে থাকায় মাত্র ৩ জন ডাক্তার দিয়ে চলছে এই হাসপাতাল।
সিভিল সার্জনের বক্তব্য: ওষুধ সংকট, বিভিন্ন উপজেলায় আলট্রাসোনোগ্রাম, ইসিজি মেশিন, ওটি সরঞ্জামাদি, এনেসথেসিয়াসহ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সংকটের কথা স্বীকার করে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. আ. স. ম ছামাদ বলেন, সকাল সাড়ে ৮ থেকে আড়াইটা পর্যন্ত ডাক্তারদের হাজিরা নিশ্চিত করতে ও আরএমওদের হাসপাতালে থাকা বাধ্যতামূলক করে চিঠি দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশ অমান্য করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগ অস্বীকার করে সিভিল সার্জন জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে জনবল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিতভাবে চিঠি দেয়া হয়েছে। ৩৩তম বিসিএস-এর নিয়োগ সম্পন্ন হলে ডাক্তার সংকট অনেকটা নিরসন হবে বলে তিনি জানান।