অস্তিত্ব সঙ্কটে কপোতাক্ষ
তালা (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৪, ২৩:০০
অপরিকল্পিত বাঁধ আর স্রোতের গতিপথ বদলে যাওয়ার কারণে কপোতাক্ষ নদ শুকিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে শুকিয়ে যাওয়া নদ দখলে প্রভাবশালীদের প্রতিযোগিতা চলছে সমানতালে।
কপোতাক্ষের বুকে অবৈধভাবে এস্কাভেটর মেশিন দিয়ে বড় বড় বাঁধ দিয়ে ‘সীমানা নির্ধারণ’ করে মাছ চাষের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। বৃষ্টির পানি প্রবাহিত না হতে পারলে অধিকাংশ গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী। অপরিকল্পিত খনন ও দখলদারিত্বের কারণে চলতি বর্ষা মৌসুমে উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ পাড়ের হাজার হাজার মানুষকে অন্য বছরের মত এবারও চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে।
গত শতাব্দীর আশির দশকে যে নদে পাকা মাঝিরাও স্রোতের কাছে হার মানত, সে নদ মানুুুুুষের কাছে এখন স্মৃতি আর গল্পমাত্র।
ফারাক্কার প্রভাব এবং মানুষের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে এই নদের এক তৃতীয়াংশ হারিয়ে গেছে। এক সময়ের শস্যভাণ্ডার খ্যাত তালা উপজেলার হাজারো পরিবারের জীবনযাপনের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই নদ। এ উপজেলার কৃষি, মত্স্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি নির্ভর করত প্রবহমান এই নদের উপর। কিন্তু কালের পরিবর্তনে আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কপোতাক্ষ। এলাকায় পানি সংকটের কারণে মানুষের জন্য বিপর্যয় ধেয়ে আসছে।
কৃষকরা জানান, নদ শুকিয়ে জেগেছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। কিন্তু নদ বাঁচিয়ে রাখার কথা বিবেচনা না করে সেট্লমেন্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পন্থায় ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে অনেকেই এই নদকে নিজেদের জমিভুক্ত করে নিয়েছে। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত দখল হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কপোতাক্ষ। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার প্রান্তিক চাষিরা। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে এখানকার সরকারি জলাশয়েরও হাতবদল হয়ে থাকে। মূলত এ কারণে নদ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয় না। স্থানীয়রা বলেন, অবৈধ দখলকৃত নদ যত দ্রুত সম্ভব দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করা হবে এ এলাকার কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নয়নে আরও প্রসার ঘটবে।
সামপ্রতিক সময়ে এই নদ পুনঃখনন কাজ শুরু হলেও পূর্বের ন্যায় চলছে ব্যাপক দুর্নীতি। ফলে এলাকার মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ থেকেই যাচ্ছে। উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের কাশীপুর সংলগ্ন কপোতাক্ষ নদে শুরু হয়েছে দখলের প্রতিযোগিতা। কপোতাক্ষের চর দখল করে এস্কাভেটর দিয়ে মাটি ভরাট করে মাছ চাষ শুরু হয়েছে। তালা সদর থেকে বারুইহাটি পর্যন্ত ও তালা থেকে শাহ্পুর বাজার পর্যন্ত পানি সরার একমাত্র খালটি দখল করার কারণে উক্ত এলাকা দিয়ে পানি আর কপোতাক্ষে পড়তে পারে না। এছাড়া তেঁতুলিয়া, কলিয়া, নোয়াপাড়া, লক্ষণপুর সুভাষিণী, ইসলামকাটি, কলাপোতা, তেরছি, মির্জাপুর, কুমিরা, শাঁকদহসহ ১২টি ইউনিয়নের অধিকাংশ বিলে বড় বাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ করার কারণে এই এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা এবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে। ২০০০ সালের পর হতে কপোতাক্ষ নদের বুকে পলি জমে নাব্যতা হারাতে শুরু করে। প্রতি বছরই নাব্যতা হ্রাস এতই বৃদ্ধি পায় যে কপোতাক্ষ অববাহিকার তিন জেলার ৯টি উপজেলার ১ হাজারেরও বেশি গ্রামের প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে বর্ষা মৌসুম হতে ৮ মাস মানবেতর জীবনযাপন করে।
এ সময় শত শত একর ফসলি জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। কপোতাক্ষ খননের জন্য সরকার ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। একদিকে চলছে অপরিকল্পিত খনন কাজ, অপরদিকে চলছে পাল্লা দিয়ে কপোতাক্ষ দখলের পালা। সরেজমিনে তালা উপজেলার কপোতাক্ষ তীরবর্তী কাশীপুর, সারুলিয়া, সারসা, কুটিঘাটা নামক স্থানে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও কপোতাক্ষের বুকে বাঁধ দিয়ে মত্স্য ঘের করা হচ্ছে। কোথাও কপোতাক্ষের বক্ষে বাঁধ। সারসা এলাকার গ্রামবাসী জানান, কুটিঘাটায় কাদের মোল্লা, ইয়াকুব মুন্সীসহ অনেকেই নদীর সীমানায় বাঁধ দিয়ে মত্স্য ঘের করছেন। যার কারণে বর্ষা মৌসুমে এ সকল বেড়িবাঁধ ও মত্স্য ঘের পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করবে। তাছাড়া কপোতাক্ষ নদের দু’ধারে মাটি ভরাট এলাকায় অনেকে অবৈধভাবে দখল করে চলেছে। কপোতাক্ষের বুকে শুষ্ক মৌসুমে সবুজ ফসলের মাঠ আর বর্ষা মৌসুমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা- এটাই এখন কপোতাক্ষ দু’পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ বলেন, যদি কেউ এটা দখল করার চেষ্টা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।