যদি হয় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনাল!

১৯৯০ সালে সেবার ইতালিতে শেষ ষোল’র ম্যাচে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিদায় করে দেয় আর্জেন্টিনা। এর বাদে দুবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে খেলেছে দুটি দেশ। এর বাইরে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলেছে ছয়বার। আর ৯৫টি ম্যাচের লড়াইয়ে দল দুটির মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য। ব্রাজিলের ৩৫টি জয়ের বিপরীতে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩৬টি ম্যাচ। ড্র হয়েছে মোট ২৪টি ম্যাচ। ব্রাজিলের ১৪৫টি গোলের বিপরীতে আর্জেন্টিনা করেছে ১৫১টি গোল। — কাকে সমর্থন করছেন আজ? প্রশ্ন শুনে ঠিক যেন আকাশ থেকে পড়লেন আনা জিমেনেস। ৩৫ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান পেশায় ডাক্তার। ব্রাসিলিয়ায় এসেছিলেন বেলজিয়াম ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল দেখতে। অনেকটা চড়াও হয়ে জিমেনেস উত্তর দিলেন, ‘অবশ্যই বেলজিয়াম?’ — কেন? — সহজ কথা! আমি আর্জেন্টিনাকে ঘৃণা করি! আনা জিমেনেসের এই তীব্র আর্জেন্টিনা-বিদ্বেষ অবশ্য খেলার ফলাফলে কোন প্রভাব ফেলতে পারলো না। গোটা ম্যাচ জুড়ে জিমেনিসরা গাইলেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী গান, সাম্বার তালে সমর্থন জুগিয়ে গেলেন বেলজিয়ামকে। সব আয়োজন ব্যর্থ করে দিয়ে ‘ডার্ক হর্স’-দের ১-০ গোলে হারিয়ে ২৪ বছর পর সেমিফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে জিমেনেস অবশ্য মুখ কালো করলেন না মোটেই। এক গাল হেসে বললেন, ‘ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে পাচ্ছি আমরা। ওদের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচে জয় দেখতে পারবো। এতো বড় সৌভাগ্য কয়জনেরই বা আছে!’ এর নাম ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এখানে কেউ কাউকে ছাড় দেয় না এক বিন্দুও। ভৌগোলিকভাবে পাশাপাশি অবস্থান করছে দুটি দেশ। কিন্তু ফুটবল ম্যাচ হলেই শত্রুতায় রূপ নেয় ভৌগোলিক ভ্রাতৃত্ববোধ। কোনক্রমে দল দুটির মধ্যে ফাইনাল হয়ে গেলে এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটবে না। ট্রফি জয়ের পরিসংখ্যানে পাঁচটি বিশ্বকাপ নিয়ে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও সব মিথ্যা হয়ে যায় আর্জেন্টিনার সামনে। দুটি ট্রফি জয় নিয়েও তারা হয়ে ওঠে দুর্বার। এবার ফাইনালেও কি তেমনটা হতে যাচ্ছে? ব্রাজিলের মাটিতে বিশ্বকাপ। নিজেদের কন্ডিশনকে কাজে লাগিয়ে কিছুটা হলেও সুবিধা পাবে ব্রাজিল দল। তাই বলে কি বসে আছে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা! মোটেই না। দলে-বলে তারা হাজির হয়ে গেছে ব্রাজিলে। সরকারি হিসাবমতে ব্রাজিলে এখন অবস্থান করছে প্রায় এক লাখ আর্জেন্টাইন সমর্থক। দেশকে ঘরের একটা আমেজ এনে দেয়াই তাদের উদ্দেশ্য। ব্রাজিলিয়ানরা অবশ্য ‘আর্জেন্টাইন উপদ্রব’—কিছুটা ভয়ের দৃষ্টিতেই দেখছেন। ফাইনালে গোলমালের আশঙ্কাও করছেন তারা। এদের মধ্যে আছেন অ্যালেক্সিস রিসডন। প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৪ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান বলেন, ‘আমি ব্রাজিলিয়ান। আর আর্জেন্টাইনদের ঘৃণা করার স্বভাব আমার রক্তে মিশে আছে। ওরা পাগলাটে ধরনের হয়। আমাদের মারাকানা স্টেডিয়ামে এসে ও না জানি কি করে বসে। একটা সংঘর্ষ বেঁধে গেলে তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে!’ কোপাকাবানা বিচে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বিজয় উত্সবে হানা দেয় কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা। এক আর্জেন্টিনা সমর্থকের জার্সি চুরি হয়ে যায়। সেই থেকে বাধে গোলযোগ। সন্দেহ করা হয় ২৭ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান গুস্তাভো বগকে। ঘটনাটা অবশ্য খুব বেশিদূর গড়াতে পারেনি। করমর্দনের মধ্য দিয়ে হাসিমুখেই ব্যাপারটার ইতি ঘটে। মিনিট দশেক বাদে, ঘটনার ব্যাখ্যা দেন বগের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর্তুরো ফ্রেইটাস, ‘ঘটনা তেমন কিছু না। আর্জেন্টিনার একটা জার্সি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এই নিয়ে কয়েকজনের মধ্যে ঘুষাঘুষি হয়।’ এই ঘটনা নাকি ‘তেমন কিছু না!’ দুটি দলের ফাইনাল হয়ে গেলে তাহলে তো রীতিমত যুদ্ধ লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে! গ্যালারিতে কি হবে সেটা আগে থেকে অনুমান করা মুশকিল। কিন্তু মাঠের লড়াইটা যে যুদ্ধ হয়ে উঠবে সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ প্রকাশ করার সুযোগ নেই। ১৯১৪ সাল থেকে শুরু করে এখন দু’দলের মধ্যে ম্যাচ হয়েছে মোট ৯৫ টি। বন্ধুত্ব-শত্রুতা কিংবা আগুন ঝরানো উত্তেজনা—সব মিলিয়ে ম্যাচগুলো হয়ে উঠেছে ফুটবলের একেকটি ধ্রুপদি লড়াই। ইতিহাস অবশ্য এখন পর্যন্ত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যে বিশ্বকাপে কোন ফাইনাল ম্যাচ দেখেনি। এখন পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দল দুটি মুখোমুখি হয়েছে চারবার। নক আউট পর্বে দল দুটির দেখা হয়েছে মাত্র একবার। ১৯৯০ সালে সেবার ইতালিতে শেষ ষোল’র ম্যাচে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিদায় করে দেয় আর্জেন্টিনা। এর বাদে দুবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে খেলেছে দুটি দেশ। এর বাইরে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলেছে ছয়বার। আর ৯৫টি ম্যাচের লড়াইয়ে দল দুটির মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য। ব্রাজিলের ৩৫টি জয়ের বিপরীতে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩৬টি ম্যাচ। ড্র হয়েছে মোট ২৪টি ম্যাচ। ব্রাজিলের ১৪৫টি গোলের বিপরীতে আর্জেন্টিনা করেছে ১৫১টি গোল। লড়াইটা যে কতটা উত্কণ্ঠার, কতটা আবেগের সেটা আরও স্পষ্ট হয় হাজার হাজার মাইল দূরের এই ছোট্ট বাংলাদেশের সমর্থকদের রেষারেষি দেখলে। পথঘাট, বাড়ির বারান্দা, ছাদ ছেয়ে গেছে দুই দেশের পতাকায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লড়াইও চলছে একই গতিতে। কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে জয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, ‘হ্যা..... এটাই ব্রাজিল!’ কট্টরপন্থি কয়েকজন ব্রাজিল সমর্থকও আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুশফেকা তরী আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে ওঠার দিন স্ট্যাটাস দিলেন, ‘আহা! ২৪ বছরের নিরবচ্ছিন্ন অপেক্ষার পর অবশেষে তারা সেমিফাইনালের দেখা পেল...করুক তারা একটু লাফালাফি, আজকে না হয় মানসম্পন্ন খেলার প্রসঙ্গটা নাই তুললাম!’ আর্জেন্টিনার সমর্থকরাও আছেন প্রস্তুত। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশাত আহমেদ জিসান ব্যঙ্গ করে লিখেন, ‘রেফারি দেখি জার্মানির বিপক্ষে ব্রাজিলের বিশ্বকাপের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। যাই হোক আজকে আর কিছু বললাম না। যেভাবেই হোক, বিশ্বকাপ ব্রাজিলিয়ানরাই নিয়ে যাবে!’ নিরপেক্ষ সমর্থকও আছেন। নাটক নির্মাতা সিমিত রায় অন্তর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের জন্য হয় দুই দলকেই জিততে হবে, নতুবা দুই দলকেই হারতে হবে। জিতলে ফাইনালে আর হারলে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে তারা। দুটোতেই বিপদ!’ পক্ষ-বিপক্ষ, দ্বন্দ্ব্ব-রেষারেষি যাই থাকুক না কেন, কোনক্রমে যদি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে ফাইনাল হয়ে যায় তাহলে রচিত হয়ে যাবে নতুন এক ইতিহাস। এর আগে যে কখনওই বিশ্বকাপের ফাইনালে একসাথে দেখা যায়নি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে। আর্জেন্টিনার প্রথিতযশা ক্রীড়া লেখক এজেকুয়েল ফার্নান্দেজ মুরসের ভাষায়, ‘মারাকানায় ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলাটা যেকোন আর্জেন্টাইনের কাছেই স্বপ্নের মত এক ব্যাপার। ব্রাজিলিয়ানদের জন্যও তাই। আর এটা সত্যি হয়ে গেলে ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে দু’দলের এই ফাইনাল ম্যাচ; ছাড়িয়ে যাবে আগের সব বিশ্বকাপকে।’ আমরাও সেই প্রার্থনাই করি!