বিশ্বকাপের সেরা ৫ সেমিফাইনাল

আজ থেকে শুরু হচ্ছে ব্রাজিল বিশ্বকাপের শেষ চারের লড়াই। ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার আগে ফুটবলামোদীদের জন্য বেছে নেয়া হলো বিশ্বকাপের অতীত আসরগুলোর সেরা পাঁচ লড়াই। ১৯৫৪-হাঙ্গেরি ৪ : উরুগুয়ে ২ বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা ম্যাচগুলোর একটি বিবেচনা করা হয় এ লড়াইকে। পশ্চিম জার্মানিকে গ্রুপপর্বে ৮-২ গোলে হারিয়ে চমক দেখানো হাঙ্গেরি সেমিফাইনালে শিরোপাধারী উরুগুয়েকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। তবে স্ট্রাইকার হুয়ান হলবার্গের ডাবল গোলে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল উরুগুয়ে। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে স্যান্ডর কোকসিস হেড দিয়ে দুর্দান্ত দুইটি গোল করলে অবিশ্বাস্য এক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে হাঙ্গেরি। ওই আসরে এগারোটি গোল করেছিলেন ফরোয়ার্ড ককসিস। ওই সেমিফাইনাল নিয়ে হাঙ্গেরিয়ান স্ট্রাইকার জসেক বসজিক বলেছেন, ‘ওটি ছিল সবচেয়ে সুন্দর একটি সেমিফাইনাল। আমার জীবনে সবচেয়ে উত্কৃষ্ট একটি ম্যাচ।’ তবে ফাইনালে আর চমক ধরে রাখতে পারেনি হাঙ্গেরি। সুইজারল্যান্ডের বার্নের ওয়ানডর্ফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে ৩-২ গোলে হেরে যেতে হয় তাদের। ১৯৬৬- ইংল্যান্ড ২ : পতুর্গাল ১ ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওই আসরে পর্তুগালের প্রাণভোমরা ছিলেন ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ইউসেবিও। টুর্নামেন্টে জ্বলে উঠেছিলেন তিনি। তার চমত্কার নৈপুণ্যে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের সম্ভাবনা তৈরী করেছিল পর্তুগাল। ববি চার্লটনের নৈপুণ্যে খেলা শেষ হওয়ার দশ মিনিট আগে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিক ইংল্যান্ড। কিন্তু ইউসেবিও একের পর এক প্রচেষ্টা চালালেও বার বার বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইংলিশ গোল কিপার গর্ডন ব্যাংকস। এরপর ৮৩ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ইউসেবিও সফল হলে শেষ পর্যন্ত একটি গোল হজম করতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে। ইউসেবিওর পর্তুগালের বিপক্ষে চরম চাপ নিয়ে খেললেও তাদের ২-১ গোলে হারিয়েই ফাইনালের টিকিট পায় স্বাগতিকরা। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালের ওই লড়াইটাকে এভাবেই মূল্যায়ন করেছিলেন ইংল্যান্ডের কোচ আলফ্রেড আর্নেস্ট রামজে, ‘টুর্নামেন্টে ওই ম্যাচটি আমাদের সবচেয়ে ভাল হয়েছিল।’ হারলেও ইংল্যান্ডের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছিলেন পর্তুগালের কোচ অটো গ্লোরিয়া। ফাইনালে ইংল্যান্ড জার্মানিকে হারাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তাই হয়েছিল। পশ্চিম জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল ইংল্যান্ড। ১৯৭০-ইতালি ৪ পশ্চিম জার্মানি ৩ কারো কারো মতে মেক্সিকো আসরের সেমিফাইনালের ওই লড়াইটাকে ‘বিশ শতকের সেরা ম্যাচ’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। খেলা শুরু হওয়ার অষ্টম মিনিটেই রবার্তো বনিনসেগনার নৈপুণ্যে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় ইতালি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে উয়ে শেনেলিনজার গোল করলে সমতা ফেরায় জার্মানি। কিন্তু মেক্সিকোর কাঠফাটা রোদে অনুষ্ঠিত ওই খেলাটিতে অতিরিক্ত সময়ে আরও চমক দেখা গেলো। সমতা ফেরানোর পর স্ট্রাইকার জার্ড মুলারের নৈপুণ্যে এগিয়ে যায় জার্মানি। পরক্ষণেই লুগি রিভার নৈপুণ্যে খেলায় সমতা ফেরায় ইতালি। ১১০ মিনিটে মুলারের গোলে ফের এগিয়ে যায় জার্মানরা। পরের মিনিটেই ইতালির গিয়ানি রিভেরার গোল বিষাদ ঢেলে দেয়। মেক্সিকো সিটির স্টেডিও অ্যাজতেকায় অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ওই ম্যাচে জার্মানিকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে ইতালি। যদিও তিনদিন পর একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে এই শক্তি ধরে রাখতে পারেনি ইতালি। ৪-১ গোলে সেলেচাওদের কাছে হেরে রানার্স-আপ হতে হয় আজ্জুরিদের। ১৯৮২- পশ্চিম জার্মানি ৩ : ফ্রান্স ৩ (পেনাল্টিতে ৫-৪ ব্যবধানে জেতে জার্মানি) বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের ইতিহাসে দুর্দান্ত আরেক ম্যাচ এটি। নির্ধারিত সময়তো বটেই, অতিরিক্ত সময়েও বুঝা যাচ্ছিল না কারা জিতবে। টাইব্রেকারে ফ্রান্সের শেষ শট মিস হলে ৫-৪ গোলের জয় নিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে পশ্চিম জার্মানি। স্বাগতিক স্পেনের সেভিয়াতে অনুষ্ঠিত ওই লড়াইটি শুরু থেকেই উত্তাপ ছড়ায়। খেলার ১৭ মিনিটে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় জার্মানি। কিন্তু জার্মানির হ্যারল্ড শুমাখার ফ্রান্সের প্যাট্রিক ব্যাটিনসনকে ঘাড়ে আঘাত দিলে পেনাল্টি পায় ফ্রান্স। এটা কাজে লাগিয়ে খেলায় সমতা ফেরান প্লাতিনি। এই সমতার মধ্যদিয়েই শেষ নির্ধারিত সময়ের খেলা। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে মরিন ট্রেসর এবং অ্যালেইন গিরেসের চমকপ্রদ গোলে ৩-১ গোলে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। তবে খেই হারায়নি জার্মানি। রুমেনিগের এবং ক্লস ফিশেরের গোলে খেলায় ৩-৩ গোলে সমতা ফেরে। কিন্তু টাইব্রেকারে ফ্রান্সের ম্যাক্সিম বোসিসের নেয়া শেষ শটটি জার্মানির গোলকিপার শুমাখার আটকে দিলে ফাইনাল নিশ্চিত করে জার্মানি। ফ্রান্স অধিকতর নান্দনিক ফুটবল খেললেও, তারকা সমৃদ্ধ জার্মানির কাছে হেরে যেতে হয় তাদের। ১৯৯৮- ফ্রান্স ২ : ক্রোয়েশিয়া ১ স্বাগতিক ফ্রান্স শেষ চারে যেতে পারবে কি-না এ নিয়ে সমালোচকদের অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সেমিতে গিয়ে সমালোচকদের জবাবটা ভাল করেই দিয়েছিল ফরাসিরা। সেমিফাইনালে দলটি মুখোমুখি হয় মেধাবি খেলোয়াড়সমৃদ্ধ ক্রোয়েশিয়ার। যুগোস্লাভিয়া ভাঙ্গার পর প্রথমবারের মতো মধ্য বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নে বিভোর তারা। গোলশূন্য থাকা প্রথমার্ধের খেলা শেষ হলেও দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার প্রথম মিনিটেই ডাভর সুকারের গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। পরের মিনিটেই লিলিয়ান থুরানের নৈপুণ্যে ঘুরে দাঁড়ায় ফ্রান্স। সমতা ফেরানো ওই গোলটাই থুরামের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল ছিল। খেলার ৬৯ মিনিটে জটিল একটি হাফ-ভলিকে গোলে পরিণত করেন থুরাম। তার এই গোলটিই জয় এনে দেয় স্বাগতিকদের। স্লেভেন বিলিচকে ফাউল করায় লাল-কার্ড পেয়েছিলেন ফ্রান্সের লরেন্ত ব্লাঙ্ক। ফলে নিজেদের মাঠে ব্রাজিলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য হতে পারেননি তিনি।