সমুদ্রে সাড়ে ১৯ হাজার বর্গ কিমি পেল বাংলাদেশ

সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তি হলো। বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকার অধিকারী হলো বাংলাদেশ। নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত স্থায়ী সালিশ আদালত (পিসিএ) ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং এর বাইরে মহীসোপান অঞ্চলে বাংলাদেশ নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত করলো। সোমবার স্থায়ী সালিশ আদালত ১৮১ পৃষ্ঠা এই রায় প্রদান করে। গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে রায় প্রকাশ করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ঢাকায় জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে রায় প্রকাশ করেন। এ সময়ে সমুদ্রসীমা মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে এজেন্ট সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মণি এমপি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মোস্তফা কামাল, সচিব (মেরিটাইম ইউনিট) ও ডেপুটি এজেন্ট রিয়ার এডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সালিশ ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তি হয়। তখন বিরোধপূর্ণ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটারের অধিকারী হয় বাংলাদেশ। আর ভারতের সঙ্গেও অনুরূপ রায় আসে। ট্রাইব্যুনাল ও সালিশ আদালত বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থাপিত তথ্য, তত্ত্ব, দলিল ছাড়াও ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক নীতির আলোকে রায় দেয়। পাশাপাশি মিয়ানমার ও ভারত উভয়েই সমদূরত্বের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে যুক্তি দেখায়। যা আদালত প্রত্যাখ্যান করে। ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে এখন থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানে বাংলাদেশের অবাধ প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত হবে। গভীর সমুদ্রে মত্স্য আহরণ ও সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে-বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল। ভারতের সঙ্গে মামলার রায়ের ফলে বাংলাদেশ সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সকল ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে আদালত বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশকে প্রদান করেছে। বিলীন দক্ষিণ তালপট্টি ভারতের ১৯৭০-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর সৃষ্ট বংলাদেশ ও ভারতের সমুদ্রসীমায় অবস্থিত দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ ১৯৮৫ সালের উড়িরচর ঘূর্ণিঝড়ের পরই সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়। অস্তিত্ব না থাকলেও বহুল আলোচিত তালপট্টি দ্বীপ এলাকাটি এই রায়ের ফলে ভারতের মধ্যে পড়েছে। ১৯৮০ সালের পর প্রণীত প্রতিটি মানচিত্রে তালপট্টিকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে রাখা হয়নি। ১৯৪৭ সালে রেডক্লিড প্রণীত সীমানা মানচিত্রেও এই দ্বীপটি বাংলাদেশের মধ্যে ছিল না। অধিকাংশ গ্যাস ব্লক বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে অবস্থিত ২৮টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে অধিকাংশই এখন বাংলাদেশের। ২০১২ সালের রায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ১৭টি ব্লকের মধ্যে ১১টি পেয়েছিল বাংলাদেশ। আর ভারতের দাবিকৃত ১০টি ব্লকের সবগুলোই বাংলাদেশ পেয়েছে। আর একটি ব্লক আগে থেকেই বাংলাদেশের ছিল। এক বিচারকের ভিন্নমত হেগ-এর পাঁচ বিচারক সমন্বয়ে গঠিত স্থায়ী সালিশ আদালতের অন্যতম সদস্য ভারতের ড. প্রেমারাজু শ্রীনিবাসা রাও কয়েকটি ক্ষেত্রে অপর চার বিচারকের সঙ্গে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) পোষণ করেন। তবে ড. রাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে একমত হন। একমত হওয়া বিষয়গুলো হচ্ছে সালিশ আদালতের এখতিয়ার, মামলার যুক্তি ও কোন উপায়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হবে। আর তিনি একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীমা নির্ধারণ, মহীসোপানের বিস্তৃতি সুনির্দিষ্টকরণ ও সীমানা নির্ধারণ রেখা টানার পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। বঙ্গোপসাগর ও ভূমির মূলবিন্দু থেকে সমুদ্রের দিকে ১৮০ ডিগ্রি বরাবর রেখা টানতে বাংলাদেশের দাবির বিপরীতে চার বিচারক ১৭৭ দশমিক ৫ ডিগ্রী বরাবর রেখা টানার সিদ্ধান্ত দেন। অন্যদিকে ড. রাও এর বিরোধিতা করেন। আদালতের অন্য বিচারকরা ছিলেন জার্মানির রুডিজার উলফ্রাম (প্রেসিডেন্ট), ফ্রান্সের জঁ পিরেরে কট, ঘানার টমাস এ মেনশা ও অষ্ট্রেলিয়ার আইভান শিয়াবার। মাছ ধরা ও জাহাজ চলাচলে সুবিধা সালিশ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ফলে গভীর সমুদ্রে ৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকায় অবাধে মাছ ধরতে পারবে বাংলাদেশিরা। পাশাপাশি হাড়িয়াভাঙ্গা নদী থেকে শুরু করে রায়মঙ্গল নদীতে বাংলাদেশি জাহাজ চলাচল করতে পারবে। ২০০৯ সালের আগের অবস্থা অনুযায়ী বাংলাদেশ এসব অঞ্চলে অবরুদ্ধ থাকত। কোন অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি পড়তে হত। সাংবাদিক সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেন, এই রায়ে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েরই বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। এই বিজয় বন্ধুত্বের বিজয়। দুই দেশের জনগণের বিজয়। চার দশক ধরে যে সমস্যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করছিল, আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে তার শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কোন সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক আদালতে পেশকৃত বাংলাদেশের দাবি নামা ও যুক্তি পুরোপুরি গৃহীত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬ কোটি মানুষের সার্বভৌম অধিকার রক্ষায় দৃঢ় ভূমিকা পালন করছেন। শেখ হাসিনার সরকারের সাহসী, দূরদর্শী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলেই এতবড় অর্জন সম্ভব হয়েছে। ডা. দীপু মনি বলেন, আজ আমাদের জন্য একটি আনন্দের দিন। সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই যে শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থে সমুদ্রে অধিকার আদায় করতে পেরেছি। সংবিধানে বর্ণিত নির্দেশনা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা যা অর্জন করেছি তার ফলে জাতি হিসেবে আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় হয়েছে। আজ প্রমাণ হল, আওয়ামী লীগই পারে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে। মত্স্য সম্পদ আহরণে ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে : রাষ্ট্রপতি বাসস জানায়, মত্স্য খাতে দেশের বিপুল সম্ভাবনার প্রতি গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ মঙ্গলবার বলেছেন, সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত রায় বাংলাদেশের জন্য সাগর থেকে মত্স্য সম্পদ আহরণের ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। জাতীয় মত্স্য সপ্তাহ- ২০১৪ উপলক্ষে মঙ্গলবার বঙ্গভবনের মাছের পোনা অবমুক্ত করার পর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষণদানকালে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আপনারা জানেন আমাদের ব্যাপক জলরাশি রয়েছে, বদ্ধ জলাশয় এবং নদী, খাল, হাওর, বাঁওড় ও বঙ্গোপসাগর। আজ (মঙ্গলবার) আমরা সাগরে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা লাভ করেছি এবং তা আমাদের জন্য প্রচুর মত্স্য সম্পদ আহরণের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।’ রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের সিংহ পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন এবং মত্স্য সপ্তাহ উপলক্ষে পুকুর, হাওর, বাঁওড়সহ সকল জলাশয়ে মাছ ছাড়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশেরও বেশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মত্স্য খাতের সাথে জড়িত এবং দেশের মোট রপ্তানি আয়ের দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ মত্স্য খাত থেকে আসে। তিনি মত্স্য উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ও অপরাপর উদ্যোক্তাদের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ এবং দেশের বিশাল জলজসম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে মত্স্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক, প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বক্তব্য রাখেন।