ছাত্রলীগের ৪ নেতাকর্মী গ্রেফতার
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৪, ২২:৫১
ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ ীয় কার্যনির্বাহী সদস্য এনামুল হক শামীমের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় অন্যতম এক পরিকল্পনাকারী ও দু’জন ভাড়াটে শ্যূটারসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। সোমবার রাতে রাজধানীসহ একাধিক এলাকা থেকে এই চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন তেজগাঁওয়ের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মনির হোসেন ওরফে মনির ওরফে রাসেল (২৮), মেহেদী হাসান ওরফে সৈকত ওরফে বুলেট (২১), হারুন (২৭) ও নজরুল ইসলাম ওরফে জুয়েল (২৩)। মনির ছাড়া এ তিনজনও তেজগাঁও থানা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী।
গ্রেফতারকৃতদের নিয়ে র্যাব সদর দফতরে এ ব্যাপারে গতকাল মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। র্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এটিএম হাবিবুর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃতরা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী দাবি করলেও তারা সকলেই ভাড়াটে কিলার-সন্ত্রাসী। কাওরান বাজার ও তেজগাঁওসহ আশপাশের এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি করা তাদের মূল পেশা। এরা কাওরান বাজারের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে আত্মগোপন করা আশিকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও এনামুল হক শামীম স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং রাজধানীর বেসরকারি পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
র্যাবের একটি সূত্র জানায়, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভাসিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি প্রফেসর ড. এমএ হান্নান ফিরোজের সঙ্গে শামীমের দ্বন্দ্ব-বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছেন, এক লাখ টাকার বিনিময়ে তারা শামীমের উপর গুলি চালান। একটি মোটরসাইলেযোগে গুলির ঘটনায় সরাসরি অংশ নেন মেহেদী, হারুন ও রানা। ঘটনার দুইদিন আগেও তথা গত ১৭ জুন তারা শামীমকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি ‘মিসফায়ার’ হওয়ায় মিশন ব্যর্থ হয়। এ বিষয়টি সেদিন শামীম বা আশপাশের কেউ বুঝতেও পারেননি। এরপর ১৯ জুন তারা একইভাবে ধানমন্ডির বাসা থেকে শামীম বের হলে তাকে অনুসরণ করতে থাকেন। শামীমের প্রাইভেট কারটি ৯/এ সড়কে ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে পৌঁছলেই মোটরসাইকেলের পেছনে বসেই মেহেদী ও হারুন শামীমকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যান। মোটরসাইকেলটির চালক রানা শামীমকে দেখিয়ে দেন। ওই ঘটনায় একটি গুলি শামীমের বাম হাতে বিদ্ধ হয়।
র্যাব কর্মকর্তারা বলেন, এই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রথমে মনির হোসেন নামে একজনকে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী মুন্সীগঞ্জ থেকে হারুন, রাজধানীর ফার্মগেটের তেজতুরী বাজার থেকে মেহেদী হাসান ও নজরুল ইসলাম জুয়েল নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে মনির ও জুয়েল হামলা পরিকল্পনায় জড়িত এবং টাকার বিনিময়ে হারুন ও মেহেদী সরাসরি গুলিবর্ষণে জড়িত বলে র্যাব জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা শামীমকে গুলি করার জন্য ২০ হাজার টাকায় অস্ত্র-গুলি ভাড়া করা হয় শেরেবাংলা নগর থানা শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সালাউদ্দিনের কাছ থেকে। চারটি গুলি খরচ করার কথা ছিল। চার রাউন্ড গুলির ব্যয় বাবদ আট হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। সালাউদ্দিন এসব অস্ত্র-গুলি সরবরাহ করেন তেজগাঁওয়ের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাঈদের মাধ্যমে। এদিকে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী রানা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে আটক অবস্থায় আছেন। তবে ডিবি পুলিশের কেউ এটি স্বীকার করেননি। সূত্রটি আরো জানিয়েছে, রানা পল্টন থানা পুলিশের সোর্স। ছাত্রলীগের ব্যানারে চাঁদাবাজি, থানার দালালিসহ নানা অপকর্ম করে থাকেন রানা। এই রানার মামা কামাল হোসেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির কর্মকর্তা।
র্যাবের সংবাদ সম্মেলনের মুনির বলেন, তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতি ও গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসা করেন। শামীমের উপর গুলি চালানোর পরিকল্পনা ঘটনার এক মাস আগের। জসিম নামে তার ব্যবসায়িক বন্ধু এক লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের এ কাজটি দেন। ঘটনা সম্পর্কে মনির বলেন, তিনি গ্রামে খালাতো ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন। এ সময় জসিম ফোনে জরুরিভাবে দেখা করার জন্য বলেন। পরে তিনি গুলিস্তানে নির্ধারিত একটি স্থানে গেলে জসিম সেখানে পরিচয় করান রানার সঙ্গে। রানাকে দেখিয়ে জসিম বলেন যে ওর মামা স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে চাকরি করেন। তার নাম কামাল হোসেন। কামাল ইউনিভার্সিটি থেকে অনেক টাকা কামাতেন। সেটি বন্ধ করে দিয়ে সেখানকার একজন কর্মকর্তা (এনামুল হক শামীম) তাকে বদলি করে দিয়েছেন। এ নিয়ে এনামুল তার মামাকে গালিগালাজ করেছেন। ঐ সময় ইউনিভার্সিটির মালিক হান্নান ফিরোজ শামীমকে অনুরোধ করেছিলেন বদলি না করার জন্য। কিন্তু হান্নান ফিরোজের ঐ অনুরোধ শামীম রাখেননি। এ কারণে শামীমকে শিক্ষা দিতে হবে। কি করতে হবে জিজ্ঞাসা করলে জসিম বলেন, ‘কয়েকটি পোলাপান (সন্ত্রাসী) জোগাড় করো। কর্মকর্তারে গুলি করতে হবে। তোমাদের সঙ্গে রানাও থাকবে। রানা ঐ কর্মকর্তাকে চিনে দিবে।’ এতে প্রথমে রাজি না হলেও পরে সম্মতি জানায়। তারপর কৃষকলীগ নেতা সালাউদ্দিনের সঙ্গে পার্টি অফিসে (গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়) দেখা হলে বিষয়টি জানিয়ে তাকে অস্ত্র-গুলি দিয়ে সহায়তার কথা বলি। এরই মধ্যে মনির মেহেদীকে এবং তার সহযোগী জুয়েল শ্যূটার হিসেবে হারুনকে ভাড়া করেন। সালাউদ্দিন সাঈদের মাধ্যমে দুটি অস্ত্র ও চার রাউন্ড গুলি মনিরের কাছে পৌঁছে দেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে মেহেদী বলেন, হারুন ভাই তাকে গুলি চালানো শিখিয়েছেন। হারুন তাকে বলেন, ‘তুই এক রাউন্ড গুলি চালাবি, আমি এক রাউন্ড গুলি চালামু ব্যস। বাঁইচা থাকলেও সমস্যা নাই।’ মেহেদী জানান, এ কাজের জন্য তাকে ২০ হাজার টাকায় ভাড়া করা হয়েছিল।
হারুন সাংবাদিকদের জানান, তিনি ২০ হাজার টাকা পাবেন বলে এ কাজে অংশ নিয়েছিলেন। হামলার দুদিন পর মেহেদীর মোবাইল ফোনে ৫ হাজার টাকা এবং হারুনের মোবাইল ফোনে কয়েক ধাপে ৯ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে মনির পাঠান বলে তারা জানান।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, মনির, জুয়েল, সালাউদ্দিন, সাঈদসহ এরা সবাই সন্ত্রাসী আশিকের সহযোগী। কাওরান বাজারের আড়ত, রেললাইন সংলগ্ন বস্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে তারা নিয়মিত চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম ঘটিয়ে থাকে। মনির কাওরান বাজারের ২০০৯ সালের ত্রিপল হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি। দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর ২০১২ সালে তিনি জামিনে বের হন। অপরদিকে মেহেদী এর আগে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় একটি মামলায় কিশোর অপরাধ সংশোধনাগারে ছিলেন।