সালাম মুর্শেদির কলাম

জয়ের চাবিকাঠি মেসির হাতে

দুই যুগ। আর্জেন্টিনা সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার পর কেটে গেছে ঠিক এতটা সময়। আজ তাদের সামনে সুযোগ সুদীর্ঘ সময়ের এই আক্ষেপ ঘোচানোর। টুর্নামেন্টের দুই আসরের শিরোপাধারীদের ফাইনালে খেলতে হলে মূল কাজটি করতে হবে লিওনেল মেসিকে। এই খুদে জাদুকর যদি নিজের সেরা ফর্মে দেখা দিতে পারেন, তাহলে আজ সাও পাওলোতে নেদারল্যান্ডসকে হারানোটা কঠিন হবে না তার দলের জন্য। তবে, আর্জেন্টিনাকে হতাশ করে ১৯৭৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল হারের প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত ডাচরাও। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দারুণ ছন্দেও আছে তারা। সুতরাং মেসি-সার্জিও অ্যাগুয়েরোদের উপযুক্ত জবাব দিতে প্রস্তুত আরিয়েন রোবেন-রবিন ফন পার্সিরাও। আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে দুর্দান্ত একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটি। আমার বিশ্বাস দু’দলের সমর্থকদের পাশাপাশি ম্যাচটি সাধারণ ফুটবল প্রেমীদের জন্যও বিশাল আনন্দের খোরাক যোগাবে। ‘আগে বিশ্বকাপ জেতো, তারপরই কেবল সর্বকালের সেরার প্রশ্ন’, মেসিকে অন্তত গত পাঁচ-ছয় বছর ধরেই শুনতে হচ্ছে এমন কথা। আসলে ফুটবল এমন একটা খেলা যেখানে, সর্বকালের সেরার কাতারে স্থান করে নিতে কেবল ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি চাই সর্বোচ্চ দলীয় সাফল্যও। পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনারা সেই কাজটি করে ফেলেছেন বলেই, সর্বকালের সেরা প্রশ্নে এখনো তাদের চেয়ে পিছিয়েই থাকতে হয় মেসিকে। তবে সর্বকালের সেরা হবার তাগিদ থাক বা না থাক, আজ নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে জিততে অনুপ্রেরণার অভাব হবে মেসির। কারণ, আমি আগেও বলেছি বিশ্বকাপ এমন একটি অর্জন, যা পাওয়া জন্য মুখিয়ে থাকেন প্রতিটি ফুটবলার। এই টুর্নামেন্টের মাহত্মই এমন যে, এটা যে কোন সাধারণ খেলোয়াড়ের মধ্য থেকেও অসাধারণ কিছু বের করে আনতে পারে। সে তুলনায় মেসি তো এই যুগের সেরা খেলোয়াড়। আজ মেসির নিজের সেরা রূপে ফেরাটা তার নিজের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমন তার দেশের জন্যও। এমনিতেই এই দলটি খুব বেশি মেসি নির্ভর। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে ইনফর্ম আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার চোট। কে কি ভাবছেন জানি না, তবে মেসি যদি দলের হূিপণ্ড হয়ে থাকেন তাহলে ডি মারিয়াকে তুলনা করা চলে রক্তের সঙ্গে, যা কিনা দেহের পুরো অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। মূল স্ট্রাইকারদের বাজে ফর্মে মারিয়াই দলের আক্রমণে অন্যতম প্রধানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। পাশাপাশি উইং দিয়ে চালিয়ে গেছেন একের পর এক আক্রমণ। অথচ, গুরুত্বপূর্ণ এই সময়েই কিনা আর্জেন্টিনা পাচ্ছে না এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকাকে। তাই মেসিকে আরো বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে। খেলোয়াড় হিসাবে তো বটেই, অধিনায়ক হিসাবেও তাকে সতীর্থদের উজ্জীবিত করতে হবে। তবে আর্জেন্টাইনের জন্য সুখবর হচ্ছে গঞ্জালো হিগুইনের ফর্মে ফেরা। পুরো টুর্নামেন্টে নিজের ছায়া হয়ে থাকা এই নাপোলি স্ট্রাইকার কোয়ার্টার ফাইনালে ছিলেন রীতিমতো বিধ্বংসী। তাছাড়া এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরছেন লেফট ব্যাক রোজোও। আজ হয়তো প্রথম একাদশেই নামবেন তিনি। তবে রক্ষণে মূল কাজটা পালন করবেন জ্যাভিয়ের মাশেরানো। নিজের কাজটা বেশ ভালোভাবেই বোঝেন তিনি। বার্সেলোনায়ও মূলত এই কাজটাই করতে হয় এই সাবেক লিভারপুল তারকাকে। আর রাইট ব্যাক হিসাবে বরাবরের মতোই থাকছেন পাবলো জাবালেতা। দুর্দান্ত ফর্মে আছেন এই ম্যানচেস্টার সিটি তারকা। তবে মেসি-হিগুইনদের চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত রোবেন-স্নাইডার-ফন পার্সিরাও। এই তিনজনের সমন্বয়ে গড়া ডাচদের আক্রমণভাগকে সম্মিলিতভাবে টুর্নামেন্টের সেরা আক্রমণভাগ বলেই হয়তো স্বীকার করবেন সবাই। তাদের দলীয় সমঝোতায় কোন ঘাটতি নেই। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও ভাস্বর তারা। বিশেষ করে রোবেনের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ আমি। কি দারুণ একটা সময়ই না কাটাচ্ছেন এই বায়ার্ন মিউনিখ তারকা। ত্রিশ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় তার জীবনের অন্যতম সেরা সময়টা কাটাচ্ছেন বলেই আমার মনে হয়। যতই তার ড্রিবলিং, স্কোরিং-পাসিং ক্ষমতা আর গতি দেখছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। রোবেন এই মুহূর্তে খেলাটাকে কি পরিমাণে উপভোগ করছেন সেটা তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজেই স্পষ্ট। তার পায়ে বল গেলেই রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে যায় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের মনে। যেটা রোবেনের সতীর্থদের সুযোগ করে দেয় গোল করার। তবে যেহেতু ম্যাচটা সেমিফাইনাল, তাই আমার মনে হয় কেউই অল আউট আক্রমণে যাবে না। নিজেদের রক্ষণটা আগে ঠিক করতে চাইবে দু’দলই। তবে, প্রথাগত আক্রমণাত্মক মানসিকতার কারণেই শেষ পর্যন্ত আক্রমণেই ব্যবধান গড়তে চাইবে তারা। তবে প্রথমে যদি কোন দল গোল পেয়ে যায় তাহলে দারুণ আক্রমণাত্মক এক ম্যাচই আমরা দেখবো সবাই। দেখাই যাক শেষ হাসি কে হাসেন? রোবেন নাকি মেসি।