এক লাখ মানুষের জন্য একজন চিকিত্সক!
আবুল খায়ের ও আব্দুল মালেক
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৪, ২৩:১৬
জনবল সংকটে কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে লক্ষ্মীপুর জেলার চিকিত্সাসেবা। এ জেলায় এক লাখ লোকের জন্য মাত্র একজন ডাক্তার ও ২ লাখ লোকের জন্য একজন নার্স রয়েছেন। মঞ্জুরিকৃত ৮১টি চিকিত্সক পদের মধ্যে ৪২টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। চিকিত্সক, নার্স ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট মিলিয়ে মোট ২৪০টি পদ শূন্য। তবে জেলার অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিত্সকদের সপ্তাহে একদিনও দেখতে পান না রোগীরা। এছাড়া রামগঞ্জ হাসপাতালে চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে রোগীদের কাছ ভিজিট নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলায় সদর হাসপাতাল ছাড়াও রয়েছে ৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ২১টি ইউনিয়ন পর্যায়ের সাব সেন্টার এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক। হাতের কাছে এতসব ব্যবস্থা থাকলেও যারা চিকিত্সাসেবা দিবেন তাদের সংখ্যাই সীমিত। এছাড়া জেলার সরকারি স্বাস্থ্য কার্যক্রমে নানা কারণে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে। এরমধ্যে ওষুধ পাচার হওয়া, রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেয়া অন্যতম। অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি অকেজো ও অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। টয়লেটে মলমূত্র উপচে পড়ছে, দুর্গন্ধে ব্যবহার করা যায় না। পরিষ্কার করার কেউ নেই। কর্মরত চিকিত্সকরা দিন-রাত থাকেন প্রাইভেট ক্লিনিকে। সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ হলেও তারা দায়িত্ব পালন করেন বেসরকারি হাসপাতালে। সার্জারী কনসালটেন্টের পদগুলো দীর্ঘদিন থেকে শূন্য থাকার কারণে ছোটখাট অপারেশন হলেও বড় ধরনের কোন অপারেশন হয় না। ফলে এ জেলার লোকজনকে চিকিত্সা সেবার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম যেতে হয়। তাছাড়া দালালদের উত্পাতে রোগী ও স্বজনরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জেলা সদর হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসা মরিয়ম বেগম বলেন, ২ দিন আগে তিনি তার স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করান। আশা করেছিলেন সরকারি হাসপাতালে তার স্বামীর ভালো চিকিত্সা হবে। এসে দেখেন, তার উল্টো। প্রতিদিন মাত্র একবার ডাক্তার আসেন, নার্সদেরকে খুঁজে পাওয়া যায় না। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেয় তা খুবই নিম্নমানের। হাসপাতালের পরিবেশ এতই খারাপ যে স্বামীকে সুস্থ করতে এসে এখন নিজেই অসুস্থ হবার উপক্রম হয়েছে।
হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সকালে কুলসুম আক্তার তার ৩ বছরের কন্যা শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি জানতেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেয়া হয়। কিন্তু ভর্তির কয়েক ঘন্টা পর তাকে বাইরে থেকে ওষুধ কেনার জন্য একটি স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হয়। জানতে চাইলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে বলেন, এ মানের ওষুধ আমাদের হাসপাতালে নাই।
জেলার চিকিত্সাসেবার এই চিত্র প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম ফারুক ভূঞা এ প্রতিবেদককে বলেন, শূন্য পদে লোক নিয়োগের জন্য প্রতিমাসেই আমরা মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট পাঠিয়ে থাকি। এছাড়া জেলা সমন্বয় সভায়ও এ নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, জনবল সংকটের কারণে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। ওষুধ সরবরাহের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ওষুধ আসছে। কোন রোগী যদি ওষুধ না পান, বুঝতে হবে সেটা চিকিত্সকের উদাসীনতা। আমি গত ২৪ জুন সদর হাসপাতালে গিয়ে ঘোষণা দিয়েছি যে আউটডোর, ইনডোর ও ইমার্জেন্সীতে আসা কোন রোগীর বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হবে না।
যেভাবে চলছে চার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
রামগঞ্জ:এ উপজেলায় দালালদের প্রতারণা, কর্তব্যরত ডাক্তারদের ভিজিট আদায় এবং নিয়মিত ডাক্তার না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সা নিতে আসা দরিদ্র রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ডাক্তারের জন্য রোগীরা হাসপাতালের গেটে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করছেন। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ডাক্তাররা অফিস টাইমে হাজিরা খাতায় সই দিয়ে বাইরে অন-কলে রোগী দেখতে চলে যান। আর হাসপাতালে যখন রোগী দেখেন, তখন সরকারি নির্দেশ অমান্য করে রোগীদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ভিজিট আদায় করে প্রাইভেট ক্লিনিকের প্যাডে ব্যবস্থাপত্র দেন। রোগীরা চেম্বার থেকে বের হলে দালালরা প্যাডের ঐ ঠিকানায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেতে বলেন। হাসপাতালে ওষুধের সরবরাহ থাকলেও রোগীদের তেমন কোন ওষুধ দেয়া হয় না। এছাড়া রোগীদের যে খাবার দেওয়া হয় তা অত্যন্ত নিম্নমানের ।
হাসপাতালের এক্সরে মেশিন ও অ্যাম্বুলেন্সটি চার বছর থেকে নষ্ট হলেও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট এবং ড্রাইভার ডিউটি না করেই বেতন নিচ্ছেন। ১২টি ফ্যানের মধ্যে ৬টি ফ্যানই নষ্ট, কক্ষগুলো অপরিষ্কার, প্রতিটি টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভিজিট নেয়া প্রসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হক জানান, রোগীদের কাছ থেকে ভিজিট নিতে ডাক্তারদের নিষেধ করা হয়েছে। এদিকে এ উপজেলার ২৪টি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ বিতরণের নামে সার্ভিস চার্জ হিসেবে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রামগতি: স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ৯ জনসহ উপজেলায় ১৮ জন চিকিত্সক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন ৪ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম চলছে আলেকজান্ডার ২০ শয্যা হাসপাতালের অবকাঠামোর মধ্যে। এতে চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
কমলনগর: প্রয়োজনীয় লোকবল আর যন্ত্রপাতি ছাড়াই চলছে কমলনগর উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। চিকিত্সকের ১০টি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ৪ জন। পাশাপাশি রয়েছে নার্সের সংকট। এক্সরে মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে গত ১০ বছর। আয়ার পদ আছে ২টি কিন্তু আয়া নেই। এছাড়া কমপ্লেক্সের সর্বত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির জেনারেটরের জন্য তেল বরাদ্দ মাত্র ২০ লিটার, ফলে অধিকাংশ সময়ই অন্ধকারে কাটাতে হয়। কারণ অধিকাংশ সময়ই এখানে বিদু্যুত্ থাকে না। পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ থাকলেও এ কমপ্লেক্সটি থেকে শুধুমাত্র প্যারাসিটামল ও খাবার স্যালাইন সরবরাহ করা হয়। রোগীদের খাবার অত্যন্ত নিম্নমানের। কিচেনে গিয়ে দেখা যায় বাবুর্চি মো. মোস্তফা অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে রান্না করছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন জানান, লোকবলের অভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে যথাযথভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ৩১ জন হলেও প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন রোগী ভর্তি হন। কর্তৃপক্ষকে বারবার বিষয়টি জানানো হলেও সমস্যার কোন সুরাহা হয়নি।
রায়পুর: জেলা সদরসহ বাকি তিন উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মান খারাপ থাকলেও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এখানে ডাক্তারসহ জনবল সংকট থাকলেও উপজেলাবাসী স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন নিয়মিত। এখানে প্রসূতি মায়েদের বিনামূল্যে চেকআপ, প্রসবকালীন সেবা ও অপারেশন করা হয়। এ সেবার আওতায় প্রতি মাসে উপজেলার ৪০-৫০ জন প্রসূতির অপারেশন করা হয়। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবার মোটামুটি পেয়ে থাকেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৫০ শয্যায় উন্নীত কমপ্লেক্সটির নতুন ভবন নির্মিত হওয়ায় এখানকার পরিবেশ মোটামুটি সন্তোষজনক। রোগীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, তারা মোটামুটি ভালো সেবা পাচ্ছেন এবং হাসপাতাল থেকে তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হয়। এছাড়া হাসপাতালের পরিবেশ ও খাবার মান মোটামুটি ভালো। তবে দীর্ঘদিন ধরে ডাক্তার সংকট এবং বিদ্যুতের অতিরিক্ত লোডশেডিং এর কারণে হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবা বর্তমানে কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোস্তফা খালেদ আহমেদ জানান, এ হাসপাতালে ১০ জন মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও আছেন ৬ জন। আর ১০টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১০ জন ডাক্তারের মধ্যে আছেন মাত্র ১ জন। এছাড়া হাসপাতালের অন্যান্য বিভাগের জনবল মোটামুটি আছে। তবে আমরা হাসপাতালে আসা রোগীদের প্রয়োজন অনুসারে যথাযথ চিকিত্সা দেওয়ার চেষ্টা করি।