রমজানে বন্দরনগরীর মসজিদে পানি নেই

‘মসজিদে পানি নেই, বাসা থেকে অজু করে আসবেন’। নগরীর করমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম গত কয়েকদিন ধরে আযান শেষে মাইকে এই ঘোষণা দিচ্ছেন। পবিত্র রমজান মাসে এই ধরনের ঘোষণা নগরীর অধিকাংশ মসজিদে দেয়া হচ্ছে। পানি সংকটে মুসল্লিদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মসজিদের পাশাপাশি মহানগরীর প্রায় সব এলাকায় পানির চরম সংকট চলছে। যেসব মসজিদ বা বাসায় নিজস্ব নলকূপ নেই রমজান মাসে তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। নগরীর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোরশেদ আকতার চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমার এলাকায় ৩৭টি মসজিদ রয়েছে। প্রতিটিতে পানি সংকটে মুসল্লিদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সপ্তাহে একদিনও ওয়াসার পানি পাওয়া যায় না। উত্তর সরাইপাড়া চৌধুরী মসজিদের পেছনে বিশাল এলাকা জুড়ে ওয়াসার বিশুদ্ধ পানি সংকটে বসবাসকারীদের জীবন যাপন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দূরের পুকুর ও জারের পানি কিনে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের ভাউজারে করে কিছু পানি সরবরাহ দিচ্ছি। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল।’ পানি সংকট নিরসন ও বিতরণ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন করতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ রমজান মাসের আগে অনেকগুলো উদ্যোগের কথা বলেছিলেন। পরিকল্পনার মধ্যে ছিল কয়েকটি পুরাতন গভীর নলকূপ মেরামত ও নতুন স্থাপন করে পানি সরবরাহ বাড়ানো, বিতরণ ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে করতে পাম অপারেটরদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও পানির সংকটপূর্ণ এলাকায় ওয়াসার ভাউজারে করে বিনামূল্যে পানি সরবরাহ করা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এসব উদ্যোগের মধ্যে কালুরঘাট এলাকায় পুরাতন ৪টি নলকূপ মেরামত ও পাম্প অপারেটরদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা ছাড়া বাকি উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। এ প্রসঙ্গে ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তপন দাশ ইত্তেফাককে বলেন, ‘পানি সংকট নিয়ে বড় ধরনের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কোন এলাকা থেকে প্রচণ্ড চাপও আসেনি। পানি উত্পাদন দৈনিক সাড়ে ১৮ কোটি লিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ কোটি লিটারে উন্নীত হয়েছে।’ রমজান মাসে ওয়াসার বিনামূল্যে পানি সরবরাহ প্রসঙ্গে এক কর্মকর্তা জানান, গত এক সপ্তাহের মধ্যে বিনামূল্যে কোন পানি সরবরাহ দেয়া হয়নি। কোন এলাকা থেকে চাহিদাও আসেনি। বিনামূল্যে পানি পেতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি সুপারিশ নিয়ে আসতে হবে। এসব পানি সরবরাহের জন্য ওয়াসা একটি খোলা ট্রাক ভাড়া করেছে। ট্রাকে ট্যাংকি বসিয়ে পানি সরবরাহ দেয়া হবে। নগরীতে পানির চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি লিটার। কিন্তু ওয়াসার পানি সরবরাহ ২০ কোটি লিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তারপরে ওয়াসার কর্মকর্তাদের দাবি এলাকা থেকে পানি সংকট নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আসছে না এবং ভাউজারে পানি বিক্রি দৈনিক ১০০ গাড়ি থেকে কমে ৫০ গাড়িতে চলে এসেছে। তাহলে পানির চাহিদা কিভাবে মেটাচ্ছে? খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে অব্যাহত পানি সংকটের কারণে মানুষ ওয়াসার উপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে। নিজ উদ্যোগে বা কয়েকজন মিলে নলকূপ বসানোর হিড়িক পড়েছে। এক্ষেত্রে ওয়াসার অনুমোদনের নিয়ম থাকলেও তার তোয়াক্কা করছে না পানি কষ্টে অতিষ্ঠ নগরবাসী। যত্রতত্র নলকূপ বসানোর কারণে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। নগরীতে পানি পেতে ৩৫০ ফুটের বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে। বৃষ্টিতে দূষিত পানিতে সয়লাব ও তাপমাত্রা বাড়লে বিশুদ্ধ পানির সংকট বৃদ্ধি নগরজীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের লোডশেডিং ও পানির সংকট দু’টোই হঠাত্ করে বেড়ে যায়। গত ২/৩ দিন ধরে গরমের সাথে লোডশেডিং ও পানি সংকট তীব্রতায় জনজীবন নাভিশ্বাস করে তুলেছে। ওয়াসা সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রায় ৫২ হাজার পানি সংযোগ রয়েছে। নতুন সংযোগ প্রদান অব্যাহত রয়েছে। একটি লাইনে ৩০টির স্থলে নতুন সংযোগের ফলে ৬০টি হয়েছে। ফলে পাইপ লাইনের শেষ প্রান্তের গ্রাহকদের কাছে পানি পৌঁছানো যাচ্ছে না। পাইপলাইনে পানির চাপ কমে যায়। নতুন সংযোগের কারণে এ ধরনের সমস্যা বেড়েছে বলে ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান।