নারায়ণগঞ্জের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যা মামলায় তারই বন্ধু পিন্টু দেবনাথকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। এছাড়া তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিককে ৭বছরের সশ্রম কারাদণ্ড সেইসঙ্গে আরও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে নিহতের পরিবারকে প্রদান করতে আদেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আনিসুর রহমান আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। এই মামলায় খালাস পেয়েছেন প্ররোচনার অভিযোগে অভিযুক্ত আমলাপাড়া এলাকার আব্দুল্লাহ আল মামুন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, মামলাটি বেশ স্পর্শকাতর ছিল। সে কারণেই দ্রুত মামলাটি শেষ করা হয়েছে।
মামলার বাদী নিহতের ভাই বিপ্লব ঘোষ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, যার ফাঁসির আদেশ হয়েছে সেটা দ্রুত কার্যকর চাই। তবে আমরা বাপেন ভৌমিকের যাবজ্জীবন ও মামুনের ৭ বছর কারাদণ্ড প্রত্যাশা করেছিলাম। এখানে এক আসামিকে খালাস দেওয়ায় আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করবো। আমার ভাই হত্যার বিচার হলে ও দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি পেলেই আমাদের পরিবার শান্তি পাবে।
গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যা মামলার চার্জশীট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করা হয়। প্রবীর ঘোষ হত্যায় ২০৩ পাতার চার্জশীট আদালতে দাখিল করা হয়। মামলায় ৩০ জন সাক্ষী থাকলেও ২৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। প্রবীর হত্যায় বন্ধককৃত স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, মোবাইল সেট, রক্তের দাগ লেগে থাকা কোমরের বেল্ট, সিমেন্টের ব্যাগসহ বিভিন্ন আলামত উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে: মওদুদ
অভিযুক্তরা হল- কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার চন্দনপুর গ্রামের মৃত সতীশ দেবনাথের পুত্র বর্তমানে আমলাপাড়া কেসি নাগ রোডের ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দেবনাথ (৪১), তার সহযোগী কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার ঠেটালিয়া গ্রামের কুমদ ভৌমিকের পুত্র বাপন ভৌমিক ওরফে বাবু (২৭) ও আমলাপাড়া কেবি সাহা রোডের মৃত হাজী মহসিন মোল্লার পুত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন মোল্লা (৫১)।
মামলার বিবরণী সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৮ জুন রাতে নিখোঁজ হয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ। পরে গত ৯ জুলাই সড়কে শহরের কালীরবাজার এলাকা থেকে পিন্টু দেবনাথ ও বাপন ভৌমিক বাবুকে গ্রেফতার করে ডিবি। তাদের দেয়া তথ্য মতে রাতেই শহরের আমলাপাড়া এলাকার রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে প্রবীর ঘোষের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
জবানবন্দীতে পিন্টু বলেন, ঈদ উপলক্ষে শান্ত পরিবেশ থাকা প্রবীর ঘোষকে ১৮ জুন রাতে বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহকে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খণ্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লা-স্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিষ্কার করে ফের প্রবীর ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।
ডিবির রিমান্ডে পিন্টু আরো জানায়, প্রবীরের টাকায় ক্রয়কৃত স্বর্ণ ভবনের দোকান, বন্ধকী টাকা আত্মসাৎ ও ভয়ভীতি কারণে প্রবীরকে হত্যা করে।
ইত্তেফাক/বিএএফ