মিনেইরোর কান্না!
প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০১৪, ২১:২০
মারাকানার কান্না ভোলার মিশন ছিল, ছিল ষষ্ঠবারের মত ট্রফি তুলে ধরার লক্ষ্য। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল। ৬৪ বছর আগে দু:খ ভোলা তো দূরের কথা, বরং আরেকটা কান্নার রাত পাড় করতে হল। এবার কাঁদালো জার্মানরা। বেলো হরিজন্তের স্ট্যাডিও মিনেইরোতে হারলো ব্রাজিল, কাঁদলেন ডেভিড লুইজ, হুলিও সিজার, থিয়াগো সিলভারা।
৭-১ গোলের পরাজয় — এ এমনই এক লজ্জার ইতিহাস যা ম্লান করে দিলো ব্রাজিলের এতোদিনের ঐতিহ্যকে। পাঁচটি বিশ্বকাপ শিরোপা, নয়টি বিশ্বকাপের ফাইনাল সব যেন মিথ্যা হয়ে গেল স্রেফ একটা ম্যাচের হিসাব-নিকাশে।
এমন একটি রাতকে সত্যিই ভুলে যেতে, মুছে ফেলতে চাইবে ব্রাজিল। কিন্তু সত্যকে কি আর প্রত্যাখ্যান করা যায়? ব্রাজিলও পারছে না। এটাই যে তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে পরাজয়। ১৯২০ সালের কোপা আমেরিকায় উরুগুয়ের বিপক্ষে ৬-০ গোলে হেরেছিল ব্রাজিল। তারপর জার্মানির বিপক্ষে এই সেমিফাইনালটিই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের হার।
দেশের মাটিতে এত বড় ব্যবধানে আগে কখনোই হারেনি ব্রাজিল। ১৯৩৯ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে সেলেসাওরা হেরেছিল ৫-১ ব্যবধানে।
১৯৯৮ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৩-০ গোলে হেরে শেষ হয়েছিল ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন। আজকের আগপর্যন্ত সেটাই ছিল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের হার।
বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সাতটি গোল হজম করার লজ্জাজনক রেকর্ডটিও ব্রাজিল গড়েছে জার্মানির বিপক্ষে এই সেমিফাইনালে। ১৯৩৮ সালে তারা পোল্যান্ডের বিপক্ষে হজম করেছিল পাঁচটি গোল। সেই ম্যাচটি অবশ্য ব্রাজিল জিতেছিল ৬-৫ গোলে।
বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ডটিও নতুন করে গড়েছে ব্রাজিল। এর আগে ১৯৫৮ সালের ফাইনালে ব্রাজিলই স্বাগতিক সুইডেনকে হারিয়েছিল ৫-২ গোলে। ১৯৭০ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে ৪-১ গোলে জিতেছিল ইতালি।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে জার্মানি। এর আগে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের দুইটি সেমিফাইনালেই আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে পেয়েছিল ৬-১ গোলের জয়। ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়াকে হারিয়েছিল এই একই ব্যবধানে। এবার সেই অস্ট্রিয়ার পাশে নাম লেখালো ব্রাজিল।
ব্রাজিলের লজ্জার ইতিহাসটা এখানেই থামছে না। তাদের সাথে একই সমতায় চলে এসেছে জায়ার ও হাইতির মত দলগুলো। প্রথমার্ধেই পাঁচটি বা তার বেশি গোল হজম করার অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত এই তিনটি দেশেরই হয়েছে।
১৯৩৮ সালের পর বিশ্বকাপে এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে ১১টি গোল হজম করতে হলো ব্রাজিলকে। এবারের বিশ্বকাপেও তারা সর্বোচ্চ গোল হজম করা দল। ব্রাজিলের এই লজ্জার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতেও। ম্যাচের পরপরই ব্রাজিলের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক ফোলহা ডি সাওপাওলোর অনলাইন সংস্করণে শিরোনাম ছিল এমন, ‘ঐতিহাসিক লজ্জা’।
ফোলহার শীর্ষ কলামিস্ট জুকা কুফরি দুঃখ করে লিখেছেন, ‘ব্রাজিলীয় ফুটবলের ধূসর-দশা!’ তিনি একটি তথ্যও তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন, পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও ব্রাজিল স্বাগতিক হয়েও দুবার বিশ্বকাপ হারানো দ্বিতীয় দেশ।
গ্লোবো স্পোর্টস তাদের সংবাদ-পোর্টালে এই হারকে অভিহিত করেছে ‘চূড়ান্ত অবমাননা’ হিসেবে। রিও ডি জেনিরোর শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ও গ্লোবো শিরোনাম দিয়েছে কোচ লুইস ফেলিপে স্কলারির স্বীকারোক্তি দিয়ে। ম্যাচ শেষে এই হারের যাবতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ব্রাজিল কোচ বলেছেন, ‘সব দায় আমারই’।
ইউওএল—এর শিরোনাম ছিল ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে পরাজয়’। সংবাদের ভিতরে তারা লিখেছে, ‘জার্মানি কি আসলেই ব্রাজিলের চেয়ে সাতগুণ ভাল দল? নাকি মাঠের ভুলগুলোরই খেসারত গুণেছে বাজিল?’
ম্যাচটিকে বর্ণনা করতে বারবারই চলে আসছে ৬৪ বছর আগের সেই ফাইনালের প্রসঙ্গ। ঘরের মাটিতে সেবারই যে সর্বশেষ কোন বিশ্বকাপের ম্যাচ হেরেছিল ব্রাজিল। আর ১৯৭৫ সালে কোপা আমেরিকার ম্যাচে পেরুর কাছে পরাজয়ের পর নিজেদের মাঠে কোন ম্যাচই হারেনি ব্রাজিল। অতিমানবীয় সেই রেকর্ডের অবসান ঘটালে জার্মানি। তাই বলে এভাবে!
কাঁদলো স্ট্যাডিও মিনেইরো, কাঁদলো ব্রাজিল!