অতিমানবীয় জার্মান যন্ত্র

পাগলামী! অবিশ্বাস্য! অতিমানবীয়— জার্মান পত্রিকা বিল্ড এভাবেই লিখেছে। ঠিক তাই বেলো হরিজন্তেতে গত মঙ্গলবার রাতের সেমিফাইনালকে বর্ণনা করতে এই তিনটি শব্দই সবচেয়ে মোক্ষম। কি নিষ্ঠুর ফুটবল! প্রথম মিনিট দশেক ব্রাজিলিয়ান আক্রমণ সামলালো। একটু গুছিয়ে নিয়ে শুরু করলো আক্রমণ। আর তাতেই লণ্ডভণ্ড ব্রাজিল। গুণে গুণে সাতটা গোল। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন এর চেয়ে ন্যক্কারজনক আর হয়তো শেষ হতে পারতো না। লাতিনদের সামনে বরাবরই জার্মানি এমন রুদ্রমূর্তি নিয়ে হাজির হয়। চার বছর আগেও কোয়ার্টার ফাইনালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন তারা। আবার ২৪ বছর আগে ফাইনালেও এই জার্মান যন্ত্রই হয়েছিল কিংবদন্তী ফুটবলার ম্যারাডোনার কান্নার কারণ। এবার ব্রাজিলিয়ানদের নাকের জল চোখের, চোখের জল এক করলো জার্মানরা। এর মধ্যদিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের নতুন রেকর্ড গড়লো জার্মানি। এর আগে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের দুইটি সেমিফাইনালেই আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে জিতেছিল ৬-১ ব্যবধানে। ১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানিও অস্ট্রিয়াকে হারিয়েছিল এই একই ব্যবধানে। আরো অনেক রেকর্ড নতুন করে লিখেছে জার্মানি। ব্রাজিলের বিপক্ষে মাত্র ২৯ মিনিটের মধ্যেই ৫টি গোল করেছে জার্মানরা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটা দ্রুততম পাঁচ গোলের রেকর্ড। আগের রেকর্ডটি ছিল যুগোস্লাভিয়ার। ১৯৭৪ সালে জায়ারকে ৩০ মিনিটের মধ্যে পাঁচ গোল দিয়েছিল তারা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানি এখন সর্বোচ্চ গোলের মালিক। ২২৩টি গোল করে গত ম্যাচে তারা ছাড়িয়ে গেল সেই ব্রাজিলকেই। ব্রাজিলের গোল সংখ্যা ২২০টি। এই জয় দিয়ে অষ্টমবারের মত ফাইনালে উঠলো জার্মানি। এটাও নতুন এক রেকর্ড। এই ম্যাচ দিয়েই ব্রাজিলিয়ান রোনালদো ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলদাতার রেকর্ডটা এককভাবে নিজের করে নিলেন মিরোস্লাভ ক্লোসা। চারটি বিশ্বকাপ খেলা ফরোয়ার্ডের গোল এখন ১৬টি। আর তিন বিশ্বকাপ খেলা রোনালদো করেছিলেন ১৫টি গোল। ক্লোসা অবশ্য এবার চোখ রাখছেন ফাইনাল ম্যাচের দিকে, ‘এখন আমরা ফাইনালে চলে এসেছি। নেদারল্যান্ডস বা আর্জেন্টিনা— আমাদের সামনে যেই আসুক না কেন আমাদের নিজেদের খেলাটা খেলতে হবে। দুটো দলই ভাল। কাউকেই হালকা ভাবে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। আশা করি শেষ পর্যন্ত জয়টা আমাদেরই হবে।’ ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন টমাস মুলার। এই গোলটি দিয়ে নতুন এক ইতিহাসই রচনা করে ফেললেন তিনি। ফুটবল ইতিহাসে মাত্র ১৩তম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে তিনি করলেন নিজের দশম গোল। বয়স মাত্র ২৪। কে জানে! হয়তো একদিন মিরোস্লাভ ক্লোসাকে পিছনে ফেলে দেবেন তিনি! জার্মান কোচ জোয়াকিম লোও চোখ রাখছেন পরের ম্যাচের দিকেই। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব দক্ষতার সাথে নিজেদের পরিকল্পনাগুলো কাজে লাগাতে পেরেছি। এখন আমাদের সকল দৃষ্টি ফাইনালের দিকেই। সেই ম্যাচ নিয়েই এখন আমরা কাজ করছি। আশা করছি সামনে যেই থাকুক। এবার আমরাই জিতবো।’ এই ব্রাজিলের কাছেই ২০০২ সালে ইয়োকাহামা স্টেডিয়ামে ২-০ গোলে ফাইনালে হেরে বিশ্বকাপ স্বপ্নে মাটি চাপা দিতে হয়েছিল জার্মানিকে। সেই ম্যাচে দুই গোল করা নায়ক রোনালদো গতকালও ছিলেন স্টেডিয়ামে। তার সামনেই ঘটলো ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লজ্জার ঘটনার। স্পেনের ফুটবল বিষয়ক পত্রিকা মার্কা যেমন লিখেছে — ‘বিশ্বকাপ অবমাননা!’