সালাম মুর্শেদির কলাম

স্কোলারিকে বড় দায় নিতে হবে

৭-১! যে কোন ফুটবল ম্যাচের বিচারেই অদ্ভুত একটা ফল এটা। আর সেই খেলাটা যদি হয়, বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল, বিস্ময়ের মাত্রাটা আকাশ ছুঁতে বাধ্য। আর যদি বলা হয় সাত গোল হজম করা দলটির নাম ব্রাজিল, তখন আর বিস্ময় নয়; রীতিমতো অবিশ্বাস্য লাগে শুনতে। আমি নিশ্চিত এক সপ্তাহ আগেও যদি কেউ বলতো একথা, তাকে পাগল ঠাউরাতো লোকে। অথচ, গত মঙ্গলবার রাতে বেলো হরিজোন্তেতে সেটাই হলো। আমার দেখা মতে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রাতে ব্রাজিলের জালে সাতবার বল পাঠালো জার্মানি! যদি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের এমন লজ্জাজনক হারের কারণ খুজতে বলা হয়, আমি বলবো ব্রাজিল কোচ লুইস ফেলিপে স্কোলারিকেই নিতে হবে সেই পরাজয়ের দায়ভার। কিছুটা দায় বর্তাবে খেলোয়াড়দের কাঁধেও। ব্রাজিল এবং জার্মানির মধ্যে শক্তিমত্তায় পার্থক্যটা খুব সামান্য। দলের সবচেয়ে সফল এবং ধারাবাহিক দুই খেলোয়াড় নেইমার এবং থিয়াগো সিলভাকে হারিয়ে নিশ্চিতভাবেই কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। তবে সেটা সাত গোল খাবার মতো নিশ্চয়ই নয়। অথচ খেলা দেখে মনে হলো এটা স্কলারির মাথায়ই ছিল না। নেইমারের বিকল্প হিসাবে নামানো হলো বার্নার্ডকে। কিন্তু মাঠে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল কই? সিলভার অনুপস্থিতিতে প্রথমবারের মতো নামানো হল দান্তেকে। কিন্তু এই বায়ার্ন মিউনিখ সেন্টারব্যাক যেন প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের ভয়ে জায়গা থেকে নড়তেই চাইলেন না। আমি জানি না স্কলারির হাতে এর চাইতে ভাল কোন বিকল্প ছিল কিনা। দল নির্বাচনের পর দেখা যাক কৌশলের কথা। স্কলারির মতো অভিজ্ঞ একজন কোচ, যে কিনা ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বছরের পর বছর কাজ করে আসছেন, তার কাছ থেকে এমন ভুল নিশ্চয়ই সমর্থকরা আশা করেননি। খেলার প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক খেলতে চাইলো ব্রাজিল। দলের সবচেয়ে বড় তারকাটি অনুপস্থিত, এমন অবস্থায় আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নেয়াটাই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। আমরা জার্মানিকে দেখেছি, শেষ ষোলো-কোয়ার্টার ফাইনালেও পজেশনাল ফুটবল খেলতে। গোল দেয়ার চেয়ে বল নিজেদের পায়ে রাখাটাই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্রাজিল একটি গোল হজম করার পরও নিজেদের রক্ষণের দিকে নজর দেয়নি। উল্টো আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে গেল। ফলাফলটা হল ভয়াবহ। জার্মানির গোলমুখে ব্রাজিল যখন বল হারাল তখন তাদের নিজেদের অর্ধ ছিল একেবারে অরক্ষিত। পাল্টা আক্রমণে দারুণ শক্তিশালী জার্মানি কাজে লাগালো সেই সুযোগটাই। দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম গোলগুলো হলো সেখান থেকেই। নিজেদের গোল সীমানায় বলের দখল নিয়ে তারা মুহূর্তেই চলে গেল পাল্টা আক্রমণে। অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক মানসিকতা দেখাতে গিয়ে ব্রাজিলের গোলপোস্ট তখন প্রায় খালি। শুকনো পাটকাঠির মতো ব্রাজিল রক্ষণ ভেঙ্গে ফেললো জার্মানি এবং একের পর এক গোল দিতে থাকলো। তৃতীয় বিষয়টি আমি বলবো ব্রাজিলের মধ্যমাঠকে নিয়ে। মানুষ বলবে এই রাতে ব্রাজিলের মধ্যমাঠ ছিল একেবারে নিস্ক্রিয়। আমি বলি এই রাতে মধ্যমাঠ কি আদৌও ছিল! সবাই আক্রমণে যাওয়ায় মাঝমাঠ ছিল প্রায় খালি। সিলভার অনুপস্থিতিতে রক্ষণের মূল কাজ যার দায়িত্বে ছিল সেই ডেভিড লুইজ ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। আক্রমণে সিদ্ধহস্ত লুইজকে প্রথাগত ডিফেন্ডারের ভূমিকা পালন করতে হওয়াতেই হয়তো তার এমন বদলে যাওয়া। তাছাড়া রাইট উইং থেকে আক্রমণের ধার বাড়াতে দানিয়েল আলভেজকে খুব প্রয়োজন ছিল। স্কলারি এখানেও বড় একটা ভুল করেছেন বলে আমার মনে হয়। অন্যদিকে জার্মানির খেলা ছিল একেবারে নিখুঁত। কোচ জোয়াকিম লোয়ের পরিকল্পনার স্বার্থক বাস্তবায়ন করেছে তারা। নিজেদের রক্ষণ প্রায় জমাট রেখেছিল তারা। তারপরও ব্রাজিল হয়তো কিছুটা সুযোগ বের করতে পেরেছিল। কিন্তু গোলপোস্টের সামনে ম্যানুয়েল ন্যুয়ার ছিলেন রীতিমতো দুর্লঙ্ঘ। টমাস মুলার, আন্দ্রে স্কুরেলরা ছিলেন দারুণ সফল। টনি ক্রুজের কথা বিশেষ করে বলবো আমি। গোল করায় যেমন দক্ষ তেমনি, সেট পিস রচনায়ও দুর্দান্ত এই বায়ার্ন তারকা। তবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় রোনালদোকে ছাড়িয়ে গিয়ে সবাইকে ম্লান করে দিয়েছেন মিরোস্লাভ ক্লোসা। আসলে রাতটাই ব্রাজিলের ছিল না। যদি থাকতো তাহলে অস্কার আরেকটি গোল পেতেন, স্কুরেল তার দ্বিতীয় গোলটি দিতে পারতেন না। এমন একটা রাত এটা ছিল যেদিন কোন কিছুই ব্রাজিলের পক্ষে ছিল না। তবে একই সাথে জার্মানির কৃতিত্বও আপনাকে স্বীকার করতে হবে। যোগ্য দল হিসাবেই ফাইনালে খেলছে তারা।