জলবায়ু প্রকল্প তদারকিতে কমিশন গঠনের আহ্বান

জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলের অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে ব্যবহার হয় কিনা তা দেখভাল করতে একটি কমিশন গঠনের আহবান জানানো হয়েছে। গতকাল বুধবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ আহবান জানানো হয়। রাজধানীর ব্রাক ইন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন:প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় খরচ করে না। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্পে এ অর্থ ব্যয় করে। সেই প্রকল্পের একজন পরিচালক থাকেন। কিন্তু প্রকল্পের অর্থ ঠিকমতো খরচ হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং এর যথাযথ ব্যবস্থা নেই। এ ব্যাপারে মনিটরিং জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, অনেক সময় আমরা সমালোচনা পছন্দ করি না। কিন্তু সুশীল সমাজের মূল্যায়ন আমাদের আমলে নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের অভ্যন্তরে থেকে যারা কাজ করেন তারা সমস্যাটা একভাবে দেখেন। অনেক সময় আমরা ত্রুটি-বিচ্যুতি ঢেকে রাখি। আবার বাইরে থেকে যারা আমাদের কাজ দেখেন তারা পৃথকভাবে আমাদের মূল্যায়ন করেন। তিনি বলেন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কাজ অন্য মন্ত্রণালয় থেকে ভিন্ন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে আমরা অর্থ দেই। কিন্তু সে অর্থে কতটুকু কাজ হয় তা সুষ্ঠুভাবে মনিটরিং হয় না। এক্ষেত্রে তিনি বলেন, আমি কোন দোষারোপের খেলায় (ব্লেম গেম) বিশ্বাস করি না। কাজ করার ক্ষেত্রে সবার ঘাটতি আছে। আমরা যদি নিজেদের কাজটি ঠিকমতো করি তাহলে এ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে। দাতাদের অর্থায়নের ব্যাপারে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল নয়, দাতারা দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রেও অর্থের প্রতিশ্রুতি দেয়। যদিও পুরোটা তারা কখনোই দেয় না। তবে বিশ্ব অর্থনীতি এখন ভালোর দিকে যাচ্ছে। এভাবে চললে কিছু অর্থ আমরা পেতেও পারি। তিনি বলেন, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি বঙ্গবন্ধু সরকার নিজস্ব অর্থায়নে শুরু করেছিলো। দাতারা আমাদের আগ্রহ দেখতে চায়। এরপর তারা সাহায্য দেয়। এক্ষেত্রে হতাশ হবার কিছু নেই। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবি’র জলবায়ু প্রকল্পের সমন্বয়ক মু. জাকির হোসেন খান। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ড-বিসিসিআরএফ’ এ দাখিলকৃত প্রকল্প প্রস্তাব কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে অযোগ্য বিবেচিত হলেও ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড-বিসিসিটিএফ’ হতে ওই প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। টিআইবি ‘বিসিসিটিএফ’ তহবিলপ্রাপ্ত ৪০টি এনজিও বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে কতগুলো চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পর্ষদের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত থাকা, পিকেএসএফ প্রদত্ত ঠিকানা অনুযায়ী এনজিওর অবস্থান খুঁজে না পাওয়া, রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে প্রকল্প প্রাপ্তি, বাধ্যতামূলক সত্ত্বেও প্রকল্প এলাকায় অফিস না থাকা, বাসাকে লিয়াজোঁ অফিস হিসেবে ব্যবহার করা, নির্বাচিত এনজিও’র অন্য প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত্ ও প্রাক্কলনের ২০ শতাংশ কমিশন হিসেবে গ্রহণের অভিযোগ উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, জলবায়ু তহবিল ছাড়, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং অভিজ্ঞ ও স্বার্থবহির্ভূত বিশেষজ্ঞ বা নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সভায় ‘বিসিসিটিএফ’ ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিদারুল আহসান বলেন, এ খাতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতনতা অবলম্বন করা হয়। যে কারণে কোন কোন প্রকল্প আটকে দেয়া হয়েছে। তহবিলের অর্থ যাতে ঠিকমতো খরচ করা হয় সেদিকে মন্ত্রণালয়ের যথেষ্ট নজর রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আগামী ২০ বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে অবস্থানকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান সবার শীর্ষে। সরকারকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সদিচ্ছার প্রমাণ দেখাতে হবে। মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন মহাহিসাব নিরীক্ষক মাসুদ আহমেদ, টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি সুলতানা কামাল, সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান, উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী প্রমুখ।