সমুদ্র জয়ে বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতের রায়ে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় জনমনে স্বস্তি বিরাজ করছে। চার দশকের এই বিরোধ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদালতে ফয়সালা হওয়ায় সরকার, নীতি নির্ধারক, অভিজ্ঞ মহল ও সর্বপরি সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সমুদ্র জয়ের ঘটনা কেবল স্বস্তিদায়ক নয়, গৌরবেরও বিষয়। অনেকে সমুদ্র বিজয়কে সরকারের নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বঙ্গোপসাগরের ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার ও ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং এর বাইরে মহীসোপান অঞ্চলে বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত করে নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত স্থায়ী সালিশ আদালত (পিসিএ) মঙ্গলবার ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। এ রায়ের মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ দশটি তেল-গ্যাস ব্লকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে। পাশাপাশি দুই বছর আগে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ৮০ হাজার বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে ৭০ হাজার বর্গ কিলোমিটারে বাংলাদেশের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে প্রাণীজ-অপ্রাণীজ, প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান ও আহরণের ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা নেই বাংলাদেশের। তবে নিরাপদ সমুদ্রসীমা প্রতিষ্ঠা ও সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির ঘটনা প্রমাণ করে যে, শান্তিপূর্ণ, আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলে যেকোনো সমস্যারই সমাধান সম্ভব। চার দশক ধরে ঝুলে থাকা সমুদ্র বিরোধের অবসান সকল পক্ষের জন্যই সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। বিদ্বেষ বা তিক্ততার কোনো সুযোগ এক্ষেত্রে নেই। কারণ আন্তর্জাতিক আইন ও আদালত ন্যায্যতার ভিত্তিতেই ন্যায় বিচার করেছে। জয়-পরাজয় নয় গ্রহণযোগ্য শান্তিপূর্ণ সমাধানই এক্ষেত্রে বিবেচ্য। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও ভারতে বাংলাদেশের প্রাক্তন হাইকমিশনার ফারুক চৌধুরী গতকাল বুধবার ইত্তেফাককে বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে তত্কালীন বঙ্গবন্ধু সরকার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল এ রায়ের মাধ্যমে তার সুন্দর সমাপ্তি ঘটলো। ন্যায্যতাভিত্তিক নীতি গ্রহণে বাংলাদেশের দাবি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ ন্যায় বিচার পেয়েছে। মীমাংসার ফলে কেবল বাংলাদেশ নয় ভারত ও মিয়ানমার নিজ নিজ সমুদ্র সীমানায় নিজস্ব কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালাতে পারবে। হার-জিত নয় এখানে ন্যায় বিচারের প্রশ্ন প্রাধান্য পেয়েছে। চার দশকের জট খুলেছে ও বিরোধ মিটেছে। এটা আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি। শান্তিপূর্ণ উদ্যোগে যে সুফল আসে এটাই তার প্রমাণ। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিকুল ইসলাম বলেন, সমুদ্র বিজয় বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের বিজয়। চার দশকের এই বিরোধ দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায় ছিলো। আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে তার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হওয়ায় আমরা খুশি। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের মতে, জয়-বিজয় বুঝি না। আমরা যেটুকু পেয়েছি তার নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। দেশের উন্নয়নে সমুদ্রসীমার সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। কলেজ ছাত্রী রিপা রুদ্র বলেন, এই মামলায় বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে। তবে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই রায়ে সন্তুষ্ট। আদালতে যাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কূটনৈতিক পরিপক্বতা দেখিয়েছে।