সেই রোমেরোই নায়ক!
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৪, ১৯:২৬
চলতি বিশ্বকাপের ঠিক কয়েকদিন আগে একবার ফিরে যান তো! স্মৃতির পাতা কি বলছে? আর্জেন্টিনার পক্ষে সম্ভাব্য তারকা হয়ে উঠতে পারেন কে? লিওনেল মেসি, সার্জিও অ্যাগুয়েরো, অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, হ্যাভিয়ের মাশেরানো কিংবা গঞ্জালো হিগুয়েন — অনেকগুলো নামই আসবে ঘুরে-ফিরে!
সেই সময়টা কেউ কি একবারের জন্যও বলেছিল সার্জিও রোমেরোর নাম? প্রশ্নের উত্তরটি হল ‘না’! কিন্তু নিজেদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় থেকে মাত্র এক ম্যাচ দূরে থাকতে সব হিসাব নিকাশ বদলে দিলেন এই গোলরক্ষক। হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার অন্যতম ভরসার প্রতীক। তিনিই যে আর্জেন্টিনাকে তুলে দিলেন ফাইনালের মঞ্চে। তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার না করে আর কিই বা উপায় আছে! নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে ডাচদের দু’টি শট ঠেকিয়ে দেন রোমেরো। নিজেদের পেনাল্টি শটগুলো ঠিকঠাক নিয়ে ৪-২ ব্যবধানে জিতে যায় আর্জেন্টিনা। এখানে নায়ক তো সেই সার্জিও রোমেরো, বিশ্বকাপ শুরু হবার আগে দারুণ আক্রমণভাগের আর্জেন্টিনার সবচেয়ে দুর্বলতা বলে যাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন ফুটবল বোদ্ধারা।
শেষবার আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল ১৯৯০ সালে ইতালি বিশ্বকাপে। সেমিফাইনালে স্বাগতিকদের টাইব্রেকারেই হারিয়ে ফাইনালে এই জার্মানিরই মুখোমুখি হয়েছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার দল। ১৯৮৬ সালে জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জেতা আর্জেন্টিনা ১৯৯০ সালে হেরেছিল। আর গত দুই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে এই জার্মানির কাছে হেরেই বিদায় নিয়েছিল দু’বারের চ্যাম্পিয়নরা। কোস্টারিকার বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে শেষ সময়ে সিলেসেনের বদলে বিশেষজ্ঞ গোলরক্ষক টিম ক্রুলকে নামিয়েছিলেন লুইস ফন গাল। সেই ম্যাচে দু’টি শট ঠেকিয়ে দলকে জয় এনে দিয়েছিলেন নিউক্যাসেলের এই গোলরক্ষক। এবার মূল গোলরক্ষকের ওপরই আস্থা রেখেছিলেন তিনি।
রুন ভ্লারের প্রথম শটটি বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন রোমেরো। রবেনের পরের শটটি ঠেকাতে পারেননি তিনি। স্নেইডারের তৃতীয় শটটি ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন উজ্জ্বল করে তুলেন রোমেরো। ডার্ক কাউটের পরের শটটি লক্ষ্যে পৌঁছালে আশা টিকে থাকে ডাচদের। কিন্তু মেসিরা কেউ ভুল করেননি।
আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রথম তিন শটে সিলেসেনকে পরাস্ত করেন মেসি, গ্যারায় ও আগুয়েরো। রড্রিগেসের চতুর্থ শট থেকে গোল হতেই আনন্দে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকরা। মেসির আনন্দটাই বেশি করে চোখে পড়লো। ফুটবল ইতিহাসে অমরত্ব পাওয়ার মঞ্চে উপস্থিতি নিশ্চিত হলো যে এই ফুটবল জাদুকরের। আর মেসির ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করলেন কে? কে আবার ! সেই সার্জিও রোমেরো!
শুধু এ ম্যাচেই নয়, গোটা টুর্নামেন্টেই দুর্দান্ত খেলেছেন রোমেরো। তাঁকে পরাভূত করা গেছে মাত্র তিনবার। বিশ্বকাপে চার সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম গোল খাওয়া গোলরক্ষক। অথচ বিশ্বকাপের আগে রোমেরোর ওপর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ভরসা ছিল সামান্যই। ক্লাব ফুটবলেই যে নিয়মিত ছিলেন না তিনি! ইতালির সাম্পদোরিয়া থেকে গেল বছর ধারে এসেছেন ফরাসি ক্লাব মোনাকোয়। কিন্তু কোচ ক্লদিও রানিয়েরির সুনজরে ছিলেন না ২৭ বছর বয়সী এ গোলরক্ষক। সাইড বেঞ্চে বসেই কেটেছে সময়। ফরাসী লীগ ওয়ানে মাত্র তিন ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়েছিল তাঁর।
কাকতালীয় হলেও সত্য যে, রোমেরোর আজকের সাফল্যের পেছনে ডাচ কোচ লুই ফন গালের ভূমিকা অপরিসীম! ২০০৭ থেকে ২০১১ — এই চার বছর ডাচ ক্লাব আল্কমারে যখন ছিলেন, তখনই কোচ হিসেবে পেয়েছিলেন ফন গালকে। স্বদেশী ক্লাব রেসিং ছেড়ে ওই প্রথম ইউরোপে পাড়ি জমান রোমেরো। আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক তাই বললেন, ‘ফন গালের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন রীতির একটা দেশে গিয়েছিলাম। হল্যান্ডে থাকার সময় তিনি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। আমার সঙ্গে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতেন। অনেক কিছু বলতেন। সত্যটা হলো, তিনি খুব ভালো একজন শিক্ষক। ভিনদেশী হয়েও তিনি আমাকে যেভাবে সহায়তা করেছেন, আমি তাঁর কাছে চিরঋণী।’
বিপক্ষ দলের হলেও আজও ফন গাল শিষ্যের প্রশংসা করতে ভুল করেননি। আদর্শ শিক্ষকের মতোই বললেন, ‘রোমেরোকে আমি পেনাল্টি ঠেকানো শেখায়নি। আমরা একই ক্লাবে ছিলাম। খেলাটা নিয়ে অনেক কিছু ওকে শেখাতে চেয়েছি। ওর প্রতিভা দেখেই কিন্তু ওকে ইউরোপে এনেছিলাম।’ দিন শেষে গোটা দলের হয়েই যেন কথা বললেন সার্জিও রোমেরো, ‘এই মুহূর্তটা উপভোগ করো, আমরা এটা উপভোগ করবো আর আগামীকাল ফাইনালের জন্য কাজ শুরু করবো। আমি খুবই আনন্দিত, সবকিছুর জন্য আমি খুশি। পেনাল্টি ভাগ্যের ব্যাপার, এটাই বাস্তবতা। নিজের উপর আমার আস্থা ছিল এবং সৌভাগ্যবশত সবকিছু ভালোর দিকে গেছে।’
এবার শেষটা ভাল হলেই নতুন ইতিহাস রচনা করবে আর্জেন্টিনা!