‘দলীয় রাজনীতি কবিকে বৃত্তাবদ্ধ করে রাখুক এটা কবিতার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক’
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৪, ১৯:২৮
শুভ জন্মদিন
তিতাসের পাড় থেকে পালিয়ে আসা এক গ্রাম্যবালক। ভাঙা সুটকেস নিয়ে শহরে আসা এক স্বপ্নবাজ—তিনি সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। সময়ের প্রতিটি চিহ্ন তিনি নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন নিজস্ব ভাব, ভাষা ও ভঙ্গিতে। তাঁর লেখায় পাওয়া যায়—বাংলাদেশের নদী, নারী, ফুল, পাখি, বৃক্ষ ও গ্রামীণ সংস্কৃতিসহ বাংলার ঐতিহ্য। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে তিনি পরিণত হয়েছেন বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তিতে। এই কিংবদন্তি কবি ১৯৩৬ সালে ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লোক-লোকান্তর (১৯৬৩)’। ‘লোক- লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ মাত্র এ দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান ১৯৭৩ সালে ‘সোনালী কাবিন’ প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে সাহিত্যপ্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি একুশে পদকসহ বেশ কিছু সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, প্রায় ষাটবছরের কবিজীবনে তিনি অসংখ্য কবিতা লিখেছেন এবং এখনো অন্যের সাহায্যে লিখে চলছেন। আজ ১১ জুলাই কবির ৮০তম জন্মদিন। কবির সঙ্গে কথা বলেছেন ইমরান মাহফুজ
প্রশ্ন : আপনি কবি না হলে কী হতেন? অথবা অন্য কিছু না হয়ে কেন কবি হলেন?
আল মাহমুদ : অনেকবার বলেছি আমি কবি না হলে সঙ্গীতশিল্পী হতাম। একসময় আমার শহরকে বলা হতো সঙ্গীতের শহর। পরিবেশটাও ছিল সঙ্গীতের। আর এখন কেন কবিতা লিখি—এই কাজটি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ওভাবে আমার তেমন দক্ষতা নেই। তাই আমি স্থির করেছি, আমি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কবিতা নিয়ে বেঁচে থাকব—এই প্রতিজ্ঞার পর আমার চারদিকের পরিবেশ ফণা তুলেছিল। তবে কখনো মনে হয়নি উদ্যত ফণার ছোবলে নেতিয়ে পড়ি। বৈশাখের ঝড়ে নুয়ে পড়লেও আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছি। এই দাঁড়ানোটাই সম্ভবত আমাকে কবি হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
প্রশ্ন : সম্প্রতি কবি-লেখকদের কেউ কেউ রাজনীতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। এতে কবিতা বা রাজনীতির কতটা উপকার হচ্ছে বলে মনে করেন?
আল মাহমুদ : আমাদের দেশের কবি-লেখকদের প্রধান সমস্যা হলো দলীয় বৃত্তে জড়িয়ে পড়া। রাজনীতিবিদরা এদের দলীয় শিবিরে টেনে আনে। রাষ্ট্র কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করুক—এটা কবি মাত্রই আশা করে। কিন্তু দলীয় রাজনীতি কবিকে বৃত্তাবদ্ধ করে রাখুক এটা কবিতার জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। দলীয় বৃত্তে আবদ্ধ কবি মাত্রই আক্ষেপের রোগে আক্রান্ত। এ রোগ যক্ষ্মার চেয়েও ক্ষয়কারী এবং কর্কটের চেয়েও উত্কট।
প্রশ্ন : আমরা দেখছি কবিতা জনপ্রিয়তার দিক থেকে এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে, অন্যদিকে কথাশিল্পের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছে দিন দিন। এক্ষেত্রে আপনার অভিমত কী?
আল মাহমুদ : আসলে বিষয়টা হচ্ছে—বাংলাদেশে কথাসাহিত্যের চেয়ে কবিতাকেই মৌলিক সাহিত্য হিসেবে ধরা হয়েছে। আজকের এ অবস্থায় এসে কবিতা পরিপূর্ণতাও লাভ করেছে। আর কথাশিল্প প্রথম থেকেই অগ্রসর সাহিত্য ও জনপ্রিয়।
প্রশ্ন : আপনার অনেক লেখায় দেহ আর কাম এসেছে নানাভাবে। এ নিয়ে বলতে গেলে কী বলবেন?
আল মাহমুদ : আমি নিত্য নারীসত্তার আদান প্রদানের মধ্যে মূলত জ্বলে উঠি। আর আমি আমার কবিতায় যেসব নারীর শরীরের সৌন্দর্যচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছি তা বিশেষ কোনো একজন মানবীর পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা নয়। একজনের দেহে নানা বৈচিত্র্য তথা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যোগ করে তাকে পূর্ণ করে তুলতে চেয়েছি মাত্র। কবিতায় আমি নর-নারীর জীবনের রহস্যময় অন্তরালকে উম্মোচনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। একটি জীবনের উপস্থাপন ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রশ্ন : কবিতার মতো অসংজ্ঞায়িত প্রেম বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
আল মাহমুদ : পৃথিবীতে প্রেম হলো মানব সম্পর্কের সবচেয়ে অদ্ভুত আর সবচেয়ে জটিল একটি বিষয়। এ প্রেম নর-নারীর দৈহিক এবং মানসিক বিনিময়ের মাধ্যমেই হয়। প্রেম কবি ও কবিতার একটি মহার্ঘ্য বিষয়। তবে জেনে রেখো—প্রেমের কৌশল কখনো প্রেম নয়।
প্রশ্ন : কবি হতে এসেছিলেন গ্রাম থেকে ঢাকায়। ঘুরেছেন অনেক পথ। পেছনের কথা যদি বলতেন—
আল মাহমুদ : আমি ঢাকায় এসেছিলাম খদ্দরের পিরান গায়ে এবং পরনে খদ্দরের পাজামা ও রবারের স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে। বগলের নিচে ভাঙা সুটকেস নিয়ে, যার গায়ে গোলাপফুল আঁকা ছিল। এসেছিলাম অবশ্যই কবি হতে। আজ অনেক বছর শহরে আছি। আমার সুটকেসের ভেতর আমি নিয়ে এসেছিলাম বাংলাদেশের সবগুলো নদী, পাখি, পতঙ্গ, নৌকা, নর-নারীসহ বহমান বাংলাদেশ। জাদুকররা যেমন তাদের দ্রষ্টব্য দেখায়, আমার ভাঙা সুটকেস থেকে জাতিকে সেরকমই কিছু দেখিয়েছি। আমার দ্রষ্টব্য দেখে বাংলার মানুষ কখনো কখনো হাততালি দিয়েছে, আবার কখনো অশ্রুসিক্ত হয়েছে। আমি যখন এসেছিলাম তখন আমার বন্ধুদের বগলের নিচে থাকত সিলেক্টেড পয়েমস জাতীয় ইউরোপের নানা ভাষার নানা কাব্যগ্রন্থ। আমি যেমন আমার ভাঙা সুটকেস থেকে আমার জিনিস বের করে দেখিয়েছি, তারাও তাদের বগলের নিচের পুঁজি থেকে নানা ভেলকি দেখিয়েছে। আমি এখনো এই শহরেই আছি। আমার সব বন্ধুদের সেই সৌভাগ্য হয়নি, তাদের নাম ক’জন তরুণই আর উচ্চারণ করে? একটা কথা মনে রাখবে—সাহিত্য তখন কোনো প্রতিযোগিতার ব্যাপার ছিল না, এখনো নেই। ছিল আনন্দের বিষয়, ভষ্যিতেও তা-ই থাকবে।
প্রশ্ন : আপনি একটি লেখায় বলেছিলেন—‘জগত্ বদলে যায় মানুষের স্বপ্নে’। কিভাবে একটু খুলে বলবেন কী?
আল মাহমুদ : হ্যাঁ সত্যি জগত্ বদলে যায় মানুষের স্বপ্নে, মানুষের আশায়, মানুষের বিশ্বাসে ও মানবতার ধর্েম। সর্বোপরি মানুষের বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে। এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শুধু গবেষণায় আয়ত্ত্বে আসেনি। এটা মানুষ হঠাত্ পেয়ে যায়। যেমন একজন কবি ছন্দ, মিল ও উপমা অলৌকিকভাবে পেয়ে একদিন অসাধারণ কাব্য সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন : তিরিশের দশকের কবিদের কবিতায় বিদেশি কবি ইয়েটস, টিএস এলিয়টের প্রভাব পড়েছিল—যেটা আপনার অনেক লেখায় পাই। আপনার কবিতায়ও বাইরের প্রভাব আছে, স্বীকার করেন?
আল মাহমুদ : প্রকৃত কথা হচ্ছে—কবিদের একটি দেশ থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে ত্রিশের কবিদের কোনো দেশ ছিল না। বাধ্য হয়েছে অন্যের দ্বারস্থ হতে। অনেক পরে তারা বুঝলেন—দেশ লাগে, কিন্তু পারেননি। বুদ্ধদেব ফিরলেন মহাভারতে। শেকড়ের টানে অথবা সোঁদা মাটির গন্ধে যে কবির ঘুম ভাঙে, তাকে অন্যের দ্বারস্থ হতে হয় না।
প্রশ্ন : অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে এখন পূর্ণ মানব আপনি। সাহিত্যজীবনে আপনাকে প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছে। আজ বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। এই পরিপূর্ণতা কেমন উপভোগ করছেন?
আল মাহমুদ : আমি কেবল কবি ছাড়া আর কিছুই নই। আর আমার আজকের এই অবস্থা এমনিতেই সৃষ্টি হয়নি। সাধারণ মানুষ ছিলাম। গ্রাম থেকে এসেই সাহিত্যচর্চায় লেগে যাই। বলতে পারি, কখনো অবহেলা, ফাঁকিবাজি করিনি। তারপরও অনেক আঘাত আমাকে সহ্য করতে হয়েছে। কবিতার অবদানেই আমি আজ প্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে কবিতাই আমার বাড়িঘর। ভালোই লাগে।
প্রশ্ন : আপনার কথা ধরেই বলছি—সৈয়দ আলী আহসান এবং আপনি দু’জনেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করেছেন। অথচ একটি বিশেষ রাজনৈতিক আনুকূল্যের কারণে আপনাকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে তত্পর একটা শ্রেণি। কেন?
আল মাহমুদ : আমি তো মুক্তিযোদ্ধাই ছিলাম। আমি মনে করি, আমাদের বিরুদ্ধে যারা এসব প্রচার করে, তারা বিজয়ী হয়নি। তারা পরাজিত হয়েছে। কোথায় এখন তারা?
প্রশ্ন : আপনি বলেছিলেন—বিস্মৃতি হলো মানুষের একটি মহত্ গুণ। এটা কেন, কিভাবে?
আল মাহমুদ : আমরা ভুলে যাই বলে বেঁচে থাকার আনন্দটা আমাদের ছেড়ে যেতে চায় না। অনেক কথা সময়মতো ভুলে গেছি বলেই ভাইকে ভাই বলি, বোনকে বোন আর বন্ধুকে বন্ধু, পত্নীকে অপরিচিত বলে মনে হয় না। অতীতের স্মৃতি সময়ের স্রোতের ভেতর কর্পূরের মতো গলে যায় বলে পরস্পরের দিকে মুখ তুলে তাকাই। প্রিয়জনকে বলি প্রিয়তমাসু। আসলে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা হলো মানুষের চরিত্রের মধ্যে আল্লাহর অপরিসীম করুণা।
প্রশ্ন : ভাষা আন্দোলনের সময় আপনি কোথায় ছিলেন?
আল মাহমুদ : আমি মফস্বলে ছিলাম। তখনো ঢাকায় আসিনি। তবে ঢাকার সেই উত্তাপের আঁঁচ গ্রামগঞ্জসহ একেবারে মফস্বলেও লেগেছিল। আমাদের মফস্বলে ভাষা আন্দোলনের একটি কমিটি করা হয়েছিল। তাদের একটি লিফলেটে আমার ‘ফেব্রুয়ারীর একুশ’ নামে কবিতা ছাপা হয়েছিল। সেটি লেখার অপরাধে আমার নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়। সে ঝামেলায় বাড়িতে থাকতে পারলাম না। যে কারণে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসি।
প্রশ্ন : রবীন্দ্র-নজরুলের পরে পঞ্চাশের অনেক কবিই গান লিখেছেন, আপনি বাদে। কেন গান লিখতে ইচ্ছা হয়নি আপনার?
আল মাহমুদ : আমি তো এমনিতেই লিরিক্যাল পয়েট। যাকে বলে গীতপ্রবণ কবি। তাছাড়া আমি ছন্দ, অন্ত্যমিল ভালোবাসি। ফলে আমি গানের চেয়ে কাব্যের যে ছন্দ এবং মিল তা কবিতায় প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলাম।
প্রশ্ন : জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছেন, দীর্ঘসময়ের কোনো সুখস্মৃতি মনে পড়ে?
আল মাহমুদ : আমার জীবনের কোনো সুখস্মৃতি নেই। আমি দরিদ্র পরিবারে জন্মেছিলাম এবং সারা জীবন কষ্টের মধ্যে কাটিয়েছি। তবু যদি কোনো সুখের কথা বলো, তাহলে একটা মনে পড়ে—সারা জীবনেই যখন সামান্য অবকাশ পেয়েছি সেই সময় বই পড়ে কাটিয়েছি। পড়াটাই ছিল আনন্দানুভূতির উজ্জ্বল উদাহরণ। আর যখনই সুখের কথা ভাবি, তখনই দেখতে পাই, শীতকালে গায়ে কম্বল জড়িয়ে কোনো বইয়ের ওপর উপুড় হয়ে আছি।
প্রশ্ন : এবার আশিতে পা রাখছেন আপনি, মানবজীবনে সকলকেই মুত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। চিরন্তন সত্য এ বিষয় নিয়ে আপনার চিন্তা হয়?
আল মাহমুদ : আসলে বিষয়টা হচ্ছে, আমি যখন মৃত্যুর কথা চিন্তা করি, তখন নানা ধরনের কথা সামনে এসে দাঁড়ায়। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মৃত্যুর ভয়াবহতা সম্বন্ধে চিরস্থায়ী ধারণা গড়ে ওঠে। আর আমি আমার পিতার মৃত্যুমুহূর্ত স্বচক্ষে দেখি নি। তবে তাঁর মৃত্যু আমাকে এমন এক অলৌকিকতার ইঙ্গিত দিয়েছে, আপনজনের মৃত্যুর কথা মনে হলেই, আমার বাবার পৃথিবী থেকে চিরকালের জন্য অন্তর্হিত হওয়ার পূর্বমুহূর্তের ইঙ্গিতটি স্মরণ হয়। মৃত্যুর এই একটি দৃষ্টান্ত আমাকে অনিঃশেষ জগতের দিকে ইঙ্গিত দেয় একা একা।