মামুন মুস্তাফার কবিতার বই ‘একাত্তরের এলিজি’
লাল পাড় সবুজ জমিনে আঁকা চিত্রকাব্য
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৪, ১৯:২৯
বাংলাদেশ উচ্চারণ করতে গেলে যে রক্তমাখা সময় আমাদের ছুঁয়ে দেয় তার মূল কেন্দ্র একাত্তর, তথাপি আমাদেরকে আরও স্পর্শ করে ভাষা সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান তথা ত্যাগ ও বিজয়ের মিশ্র ইতিহাস। এই বৃহত্ ব-দ্বীপের মানুষের মাঝে ’৭১ সাল এত বেশি গুরুত্ব বহন করেছিল যে আজ সারা পৃথিবী তা অবগত। যারা একাত্তরের সেই দুর্দান্ত সময়ে বা মূল সময় অতিক্রম করে জন্মেছি, তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই, গল্প, চিঠি পড়ে জেনেছি এবং ডকুমেন্টরিতে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের রোমহর্ষক ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস গভীরতরভাবে জানার জন্য যুদ্ধকালীন লিখিত যে চিঠিগুলো উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে থেকেও চরম সত্য উঠে এসেছে। চিঠিগুলোর মাধ্যমে জানা যায়, মা ও মাতৃভূমির জন্য এদেশের মানুষের সীমাহীন আবেগ, প্রিয়তমার জন্য উত্কণ্ঠা, অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার দৃঢ় সংকল্প, প্রিয়জন হারানোর আর্তি এবং আরও অনেক অনুচ্চারিত কথার ইতিহাস। চিঠিতে পাওয়া সেই হাহাকার মেশানো আর্তি, যা নতুনভাবে আমাদের শপথ নিতে প্রাণিত করে।
সেই শপথের অঙ্গীকারে আত্মত্যাগীদের ঋণ শোধ করার জন্য নব্বইয়ের দশকের সৃজনচঞ্চল কবি মামুন মুস্তাফা কলম ও কালির আল্পনায় তৈরি করেন ‘একাত্তরের এলিজি’। তাঁর এই ‘একাত্তরের এলিজি’ মুক্তিযুদ্ধের সময় বসে লেখা মুক্তিযোদ্ধাদের পত্রগুচ্ছের বিম্বিত রূপ। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু যেমন আবিষ্কার করেছিলেন গাছের প্রাণ আছে, তেমনি সত্তরের দশকে জন্ম নেয়া এবং নব্বইয়ের কাব্যলোকে বিকশিত কবি মামুন মুস্তাফা বুঝিয়ে দিয়েছেন, চিঠির ভেতরেও এক ধরনের প্রাণ থাকে, প্রাণের কথা থাকে। যা সাদা চোখে দেখা যায় না, দেখতে লাগে উপলব্ধির চোখ। ‘একাত্তরের এলিজি’র মধ্যে প্রবেশ করে দেখা যাক—মুক্তিযোদ্ধাদের হূদয়ের কত গভীরে পৌঁছে কবি পাঠকদের কতটুকু নস্টালজিক করে তুলতে পেরেছেন।
মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম মাহবুবুর রহমানের চিঠি অবলম্বনে লিখিত প্রথম এলিজির শিরোনাম ‘নাদমন্ত্র’ যা থেকে বোঝা যায় সম্পূর্ণ বইটির অন্তর্নিহিত ধারাবাহিকতা। কবি মামুন মুস্তাফা এই চিঠির সম্পূর্ণ গভীরে গিয়ে তুলে এনেছেন অথৈ ভাব তথা অব্যক্ত কথার নির্যাস, ‘মাগো জানি না কোন্ অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়িয়েছি। তোমার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে, মমতাকে পিছে ফেলে, তোমার শতছিন্ন আঁচলের স্নেহছায়া উপেক্ষা করে বারাসাতের অন্ধকার গলিতে আমি এক উদ্বাস্তু। আমিও তো দেখলাম তোমার বুকের ভেতরে উছলে ওঠা এক অজানা নদীর উজান। ক্রমশ বিলীয়মান সেই অন্তর্লীন ঢেউ। তুমি এই মহাপৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করেছিলে অগ্রগামী এক মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। ...শহরের সমস্ত দেয়াল কলঙ্কিত শত্রুর বুলেটের আঘাতে। ...আমরা গুটিকয় পরাস্তজন ফিরে চলি সুজাতাদের বাড়ি... শ্যামলের বহুবচনীয় সংসার কী এক দুরূহ মুখোশ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে নিষিদ্ধ রাতে, সুজাতাকে দাহ করা সম্ভব হয়নি। মাগো, জানি অনেক দামে কিনতে হবে স্বাধীনতা। তবু চাই তোমাদের অবসাদ, ক্লান্তি মুছে যাক অনেক বেহুদা সঙ্গমের রাত্রিশেষে...’ (নাদমন্ত্র, পৃষ্ঠা : ৯)।
বাংলা কাব্যসাহিত্যে এ এক নতুন দ্যোতনা। সাহিত্যপ্রেমীদের ভাবতে বেগ পেতে হবে চিঠির নির্যাস কী করে কাব্যরূপে প্রতিষ্ঠা পায়। তবে এটি সম্ভব হয়েছে মামুন মুস্তাফার মতো মননশীল ও সৃজনশীল লেখকের কারণে। ‘একাত্তরের এলিজি’ কাব্যের প্রতিটি ছত্রে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সাহিত্যে এমন পত্রকাব্য খুব একটা দেখা যায় না। প্রাথমিক দিকে পত্রকাব্য উপস্থাপন করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং তার ধারাবাহিকতায় আজ লেখা হয়েছে নতুন ধারার কাব্য এবং যার প্রবক্তা মামুন মুস্তাফা নিজেই। তিনি কাব্যের প্রতিটি পরতে পরতে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের মূলচেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে কাব্যরসের বাহুল্য স্রোতে গা ভাসিয়ে দেননি।
যদিও প্রাচীন গ্রিকে Elegy মূলত শোকাত্মক কবিতা নয়, বরং শোকগাথায় (Elegy) কবি ব্যক্তিগত বা জাতীয় শোককাহিনিকে ভাষা দান করেন। আর কবি মামুন মুস্তাফা এখানে জাতীয় শোককাহিনিকে নতুন ভাষা দান করে এলিজিকে নতুনরূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন অর্থাত্ এখানে কবির ব্যক্তিগত বেদনা সর্বমানবের বেদনারূপে ভাষা পেয়েছে। কালজয়ী কিছু মুক্তিপিপাসু চিঠির কাব্যরূপ প্রতিষ্ঠার সফল প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে কবি মামুন মুস্তাফার কাব্যভাষাও যুদ্ধদিনের বারুদের গন্ধে ঝাঁঝালো, অথচ সরল ও সাধারণ। ‘একাত্তরের এলিজি’ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—কবি মামুন মুস্তাফার চোখ এবং অনুভূতির জালে ধরা পড়া ‘একাত্তর’ কতটা ট্রাজেডির অন্ধকারে মোড়া।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাদশা মিয়া তালুকদার তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী ফিরোজা-কে মৃত্যুশয্যা থেকে যে মর্মান্তিক চিঠিটি লিখেছিলেন, তাকে অবলম্বন করে কবি মামুন মুস্তাফা উচ্চারণ করেন ট্রাজেডির অমোঘ বাণী—‘সক্রেটিসের হেমলক কতখানি নিঃসঙ্গতায় ভরা ছিল! ...তবু বিদায়ে, দয়িতা আমার, তোমাকে বলে যাই—বিজয়ের কড়া নড়বেই তোমার দরজায়। অথচ আজ এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আমার সন্তানের কচিমুখ শ্রাবণের ধারা হয়ে ঝরছে আমার বুকে। আহ, মৃত্যু কত শীতল, পেলব...কত অহঙ্কারী!...’ (এই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, পৃষ্ঠা : ১৮)। এখানে কবি মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক বিষয়গুলো আরো ধারালো করে আমাদের চেতনাকে স্পর্শকাতর করে তুলেছেন। আমরা ‘একাত্তরের এলিজি’ পড়ে আরও উপলব্ধি করতে পারি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শাফী ইমাম রুমীর চিঠির মধ্যে যে আগুন, কালের বিবেচনায় তা কতটা প্রয়োজনীয় ছিল। কবি যথার্থই লিখেছেন, ‘আগুন কতটুকু পুড়িয়ে মারে? কিন্তু ওদের নৃশংসতা, যা শুনতে পাও— তার থেকেও বীভত্স! অথচ এও জানি, একই ধরনের হিংস্রতা নিয়ে আমরাও ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। মারণাস্ত্র-ভালোবাসায় বীর বাঙালি লিখে যাবে স্বাধীনতার অমোঘ ইতিহাস’ (ভোর হবেই, আরোগ্য অরুণোদয়, পৃষ্ঠা : ২৬)। এ কথা শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে বাংলাদেশের আপামর মানুষের জীবনে।
আলোচিত গদ্যের পরিণতি টানা খুব দুরূহ, কেননা প্রকৃত মুক্তির যুদ্ধ আজও যেন শেষ হয়নি। তবু সমাপ্তি টানার প্রয়োজনে এটুকু বলা জরুরি যে, ‘একাত্তরের এলিজি’ ত্যাগের আলোকে লেখা একটি সার্থক শোকগাথা। উল্লেখ্য যে, বিজয় যখন আমাদের অনেক দূরে ছিল তখন চিঠি লেখা হয়েছে শুধু আশায় বুক বেঁধে। পত্রলেখকেরা মৃত্যুকে পকেটে পুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রতি মুহূর্ত। পৃথিবীর বুকে মহান মানুষের স্থান পাওয়া সেই তরুণ যোদ্ধাদের লেখা ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ‘একাত্তরের চিঠি’ আরো উজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়াবে ‘একাত্তরের এলিজি’র সম্ভ্রান্ত কাব্যলোকে, সাহিত্যের কাব্যবিশ্লেষণে এমন এক্সপেরিমেন্ট অনুপেক্ষনীয়।