নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মানদণ্ডে রমজান

নৈতিক গুণাবলী যোগ্যতা, মানবীয় তত্পরতা, সহযোগিতা, কর্ম-কীর্তি এবং ইবাদতমূলক চেতনার মধ্যেই মনুষ্যত্বের বিকাশ। এছাড়া শুধুমাত্র ক্ষুধা-তৃষ্ণা, বংশবৃদ্ধি আর টিকে থাকার চেষ্টায় ব্যস্ত, সংগ্রামী তত্পরতা পাশবিক! পরমপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. আ ন ম রইছউদ্দিনের ভাষায় “মানবতা ও নৈতিকতাহীন মানুষ চেহারায় মানুষ হলেও প্রকৃত মানুষ নয়”। ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, তওবা, মাগফিরাতের মহিমায় সমুজ্জ্বল ‘রমজান’ প্রকৃত মানুষের জন্য এক অপূর্ব সুযোগ। যাকে হাদিসে ‘শাহরুন আযিম’ ‘শাহরুম মুবারক’ বলা হয়েছে। এমাসের সবমূহুর্ত, সবকাজ মহাপ্রভুর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদন করাই মু’মিন বান্দার একমাত্র কর্তব্য। রমজান মাস মহান আল্লাহ্র ‘রহমতের সওগাত’। যা মানুষের মধ্যে ধর্মভীরুতা সৃষ্টি করে। ধর্মভীরুতাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘তাকওয়া’ বলা হয় এবং ‘তাকওয়া’র গুণে গুনান্বিতকে ‘মুত্তাকি’ বলে। রমজানের সিয়াম সাধনার তাত্পর্য প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন “লা-আল্লাকুম্ তাত্তাকুন” ‘যেন তোমরা ধর্মভীরুতা অর্জন করতে পার’ (বাকারা: ১৮৩)। ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন “মুত্তাকি তারাই যারা আল্লাহ্র শাস্তির ভয়ে তাঁর নিষেধাজ্ঞা গুলো এড়িয়ে চলে এবং রহমতের আশায় আদেশসমূহ মেনে চলে”। রমজানে মুসল্লির ভীড়ে ভরে ওঠছে মসজিদের বারান্দা ও ছাদ, ঘরেঘরে ওঠছে আল-কুরআনের আওয়াজ— আকুল-ব্যাকুল হয়ে পাপমোচন ও মহান আল্লাহ্র তুষ্টিতেব্যস্ত এবং ইবাদতের কল্যাণে পরিশুদ্ধ সবাই। কেননা, এ মাসে ঘোষণা করা হয় “হে ভালোর অন্বেষী অগ্রসর হও মন্দের অন্বেষী থামো” (তিরমিযি)। আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও ধর্মভীরুতা দ্বারা মু’মিনবান্দা ‘সিফাতেরব্বানী’ বা আল্লাহ্র গুণে গুনান্বিত হয়, তার মধ্যে আল্লাহ্র ভালবাসা জেগে ওঠে-“রোজা পালন করা আল্লাহ্র প্রতি গভীর মহব্বতের অন্যতম নিদর্শন। কেননা, কারো প্রতি মহব্বত জন্মিলে, তাকে লাভ করবার জন্য প্রয়োজনে প্রেমিক পানহার বর্জন করে এবং সবকিছু ভুলে যায়। ঠিক তেমনিভাবে রোজাদার ব্যক্তিও আল্লাহ্র মহব্বতে দেওয়ানা হয়ে সব কিছু ছেড়ে দেয়। এমনকি পানাহার পর্যন্ত ভুলে যায়। তাই রোজা হলো আল্লাহ্র মহব্বতের অন্যতম নিদর্শন” (ফতওয়া আলমগীরী ১ম খন্ড পৃ:২০২)। ৬২৪ খ্রিঃ এর ১৪ শাবান রমজানের রোজা ফরজ হয়। এমাসের শ্রেষ্টতম রজনী ‘লাইলাতুল কদরে’ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট আসমানী কিতাব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর প্রতি অবতীর্ণ হয়- “মহিমান্বিত রমজান মাস, এতে মানব জাতির পথ প্রদর্শক এবং সত্পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে” (বাকারা:১৮৫)। এ মাসেই যাবুর ০৬ রমজান, তাওরাত ০১ রমজান, ইঞ্জিল ১২ রমজান অবতীর্ণ হয়। ‘সাওমে’র বহুবচন ‘সিয়াম’ অর্থ বিরত থাকা, থেমে যাওয়া, বর্জন করা। যার ফারসি রূপ ‘রোজা’। প্রকৃত সিয়াম সাধনা, খাদ্যাভ্যাসে কৃচ্ছ্রতার মাধ্যমে মানুষের জৈবিক লালসাকে নিবৃত্ত করে, ফলে আত্মিক বা অধ্যাত্ম আবেগ অনুভূতি জেগে ওঠে। এভাবেই বান্দা আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মহিমায় সারা বছর পরিশীলিত জীবনবোধের যোগ্যতা অর্জন করে। আরবি ‘রময’ শব্দমূল থেকে বিকশিত ‘রমজান’ দহন, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে নিঃখাদ-নিঃষ্কলুশ ও বক্রতা-বিকৃতি মুক্ত খাঁটি, পবিত্রকরণের মূলগত ও তাত্পর্যগত অর্থ বহন করে। রমজানে সিয়াম সাধনার তাত্পর্য প্রসঙ্গে সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ্ বলেন “কুতিবা আলাইকুম... “হে বিশ্বাসীগণ তোমাদের জন্য রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে...” এতেই প্রমাণিত হয় রোজার মহিমা। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে “তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পায়...”এর ইংরেজি এতেই বোঝা যায় এ মাসের মূল্য কতবেশি। আল্লামা থানভি (রহ.) ‘আহকামে ইসলাম আকল কী নযর মে’ গ্রন্থে রোজার কয়েকটি উপকারীতা বর্ণনা করেন— (১) রোজা দ্বারা প্রবৃত্তির ওপর আকলের (জ্ঞান) পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় (২) অন্তরে আল্লাহ্র ভয় সৃষ্টি হয় (৩) স্বভাবে বিনয়-নম্রতা সৃষ্টি করে (৪) মানুষ ফেরেশতা চরিত্রের কাছাকাছি পৌছে যায় (৫) মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসা সৃষ্টি করে। বস্তুতঃ রমজান মাস এক মহিমান্বিত মাস। হাদিসে আছে ‘এমাসে আকাশের দরজাগুলো (রহমত, বেহেশত) খোলা হয়, দোযখের দরজা বন্ধ রাখা হয় এবং শয়তানকে শিকল বন্দী করা হয়’ (তিরমিযি)। মহান আল্লাহ্র অফুরন্ত নিয়ামতে পরিপূর্ণ রমজানের রোজা পালনকারীদের প্রতি প্রিয়নবীর (স.) সুসংবাদ “যে ব্যক্তি ঈমান ও আত্মবিশ্লেষণের সঙ্গে রোজা পালন করল; সে পূর্বকৃত গুনাহ্ মার্জনা করে নিল” (বুখারি-মুসলিম)।