ইফতার তারাবী সিয়ামের ফজিলত

ইফতারের সময় দূ‘আ কবুল হয়। ইফতারের পূর্বক্ষণে অনার্থক বাজে কথা-কর্ম থেকে বিরত থেকে গফুর-গফ্ফার, রহীম-রহমানের দয়া ও ক্ষমার প্রত্যাশি হওয়া ছায়েমের জন্য একান্ত জরুরী বিধান। “আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত; রসূল (স.) বলেন, নিশ্চয়ই ইফতারের সময় ছায়িম ব্যক্তির দূ‘আ নিষ্ফল হয় না” (ইবনে মাজাহ্ )। এই হাদীসে পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে ছায়েম বা রোযাদার যা প্রার্থনা করুক না কেন তা ক্ববুল করা হয়। ইফতারের সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, “যখন রাত্র সে দিক থেকে ঘনিয়ে আসে ও দিন এদিক থেকে চলে যায় এবং সূর্য ডুবে যায়, তখন ছায়িম ইফতার করবে (সহীহ বুখারি-১২২৫)। অতএব ইফতারের সময় যথাযথ হওয়া মাত্রই ইফতার করতে হবে বিলম্ব করা চলবে না। ছায়িমকে ইফতার করানো একটি মহত্ কাজ। ইফতার করানোর ফজিলত সম্পর্কে হযরত যায়দ বিন খালেদ জুহানী (রা.) হতে বর্ণিত রসূল (স.) বলেছেন, “যিনি ছায়িমকে ইফতার করায় সেই ব্যক্তিও ঐ সিয়াম পালনকারীর সমপরিমাণই সাওয়াব অর্জন করে। আর এতে ছায়েমের সাওয়াবের কিঞ্চিত্ পরিমাণও কম করা হয় না” (তিরমিযী-৮০৬ ও ইবনে মাজাহ-১৭৪৬)। যদিও তা একটি খেজুর বা এক ঢোক পানি বা দুধ হয়। আর পরিতৃপ্ত সহকারে খাওয়ালে অপরিসীম সাওয়াবের অধিকারি হবেন। যেহেতু ইফতারীর এই খুশীর সময় সকলে সমবেত হয়ে একে অন্যকে ফলপ্রসূ নসীহত করতে পারে আর তার ফলে তাদের মাঝে সৃষ্টি হয় পারস্পারিক সম্প্রীতি, সহানুভূতি, সংহতি ও দয়ার্দ্রতা। সিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আল্লাহর সন্তুষ্ট করার সবচেয়ে বড় এবং সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ইবাদত। ঈমানসহকারে ও সাওয়াবের আশায় রমাযানের কিয়ামুল লাইল বা তারাবীহর সালাত আদায় করলে জীবনের সকল (কাবিরা ব্যতীত) গুনাহ্সমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। “ আদম সন্তানের সকল আমলকে তার দশ গুণ থেকে সাতশো গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ শুধু সিয়াম ব্যতীত। কারণ সিয়াম হচ্ছে আমার জন্য আর আমি নিজেই তার পুরস্কার প্রদান করব। যেহেতুে সে আমারই জন্য তার পানাহার ও যৌনাচার ত্যাগ করে।” সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি খুশি, এক তার ইফতারের সময় দ্বিতীয় তার রবের সঙ্গে সাক্ষাত লাভের সময়। প্রতিদান প্রদানের এটাই সর্বত্তোম ও ব্যতিক্রম পদ্ধতি” (বুখারী ও মুসলিম মিশকাত হা. ১৯৫৯)। সিয়াম পালনকারীদের জন্য নির্ধারিত রাইয়ান নামক গেট থাকবে (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত হা.১৯৫৭)। অতএব যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহেক খুশি করার জন্য ১দিন সিয়াম পালন করে তার (জাহান্নামকে ১০০বছরের পথ দূরে করে দিবেন) মাঝে আর জাহান্নামের মাঝে এমন ১টি গর্ত খনন করবেন যার ব্যবধান আসমান যমীনের সমান অথ্যাত্ ৫০০বছরের দূরত্বের পথ। (ছিলছিলা ছহীহা ২২৬৭-৬৮/৬) সিয়াম, রোজাদারের জন্য ঢাল স্বরূপ। “কেয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে, ‘হে আমার রব! আমি ওকে দিনে পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতারং ওর ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ কর।’ রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, সেদিন সিয়ামের সুপারিশ কবুল করা হবে”(বাইহাক্বূী, মিশকাত হা. ১৯৬৩ হাদীসটি সহীহ)। প্রবৃত্তি চায় যে আমাকে এখনই খেতে দাও আর বিবেক বলে, “থাম! এখনও মূল মালিকের হুকুম আসেনি”। সূর্য ডুবে, মূল মালিকের হুকুম আসে তখনই সে তার খাদ্য গ্রহণ প্রবৃত্তিকে খেতে দেয়। এতে প্রমাণ হয় যে, সে প্রবৃত্তির গোলাম নয়; বরং সে আল্লাহর গোলাম এবং প্রবৃত্তি তার গোলাম। পৃথিবীর সকল মানুষের চোখের আড়ালে একাকি অট্ট্রালিকার মধ্যে গোপনে কেউ দেখে না সে স্থানেও সে কিছুই খায়না ও পান করেনা। শুধু মহান আল্লাহর ভয়েই। এ অবস্থাটা যদি সারা জীবন (আমৃত্যু) পর্যন্ত ধরে রাখা হয় তবেই সিয়ামের মূল উদ্দেশ্য সাধিত হবে। কেননা প্রবৃত্তির চাহিদা মোতাবেক কিছুই করা যাবে না। প্রকৃত প্রস্তাবে এটাই হচ্ছে তাক্বওয়া বা পরহেজগারীতার গুণ। আর এ গুণ অর্জনের জন্যই সিয়ামকে ফরজ করা হয়েছে। সিয়ামের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও শিক্ষাঃ একদা আল্লাহর রসূল (স.) মিম্বরে চড়েন। প্রথম ধাপে চড়েই বললেন, “আ-মীন।” অতঃপর দ্বিতীয় ধাপে চড়ে বললেন, “আ-মীন” অনুরূপ তৃতীয় ধাপেও চড়ে বললেন, “আ-মীন।” অতঃপর তিনি (এর রহস্য ব্যক্ত করে) বললেন, “আমার নিকট জিবরীল আমীন উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে মুহাম্মাদ! যে ব্যক্তি রমাযান মাস পেল অথচ পাপমুক্ত হতে পারল না, তার চেয়ে হতভাগ্য ব্যক্তি আর কেউ নেই।’ তখন আমি (প্রথম বার) ‘আ-মীন’ বললাম। তিনি আবার বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে অথবা তাদের একজনকে জীবিতাবস্থায় পেল অথচ তাঁকে জাহান্নামে যেতে হবে, তার চেয়ে হতভাগ্য ব্যক্তি আর কেউ নেই।’ এতে আমি (দ্বতীয় বার) আ-মীন বললাম। অতঃপর তিনি বললেন, যার নিকট আপনার (নাম) উল্লেখ করা হয় অথচ সে আপনার ওপর দরূদ পাঠ করে না, তার চেয়ে হতভাগ্য ব্যক্তি আর কেউ নেই। এতে আমি (তৃতীয় বার) আ-মীন বললাম। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা সত্ ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পর পরস্পরের সহযোগীতা কর এবং নেকী হাছীলের ব্যাপারে, নেক আমল করার জন্য উদ্বুদ্ধ কর আর পাপের প্রতি ও সীমালঙ্গনের প্রতি একে অপরের সহযোগিতা করোনা বা আহ্বান করোনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা শাস্তিদানে কঠোর”(মায়িদা-২)। প্রকৃতপক্ষে সিয়াম বা রোযার মূল উদ্দেশ্যই হল আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে শেখা। আমরা সিয়াম পালনকারীরা বহুতলা বিশিষ্ট্য ভবনের সবচাইতে নির্জনে লোক চোক্ষুর আড়ালে হালাল ও রুচি সম্মত বিভিন্ন আইটেমের খাবার উপস্থিত থাকলেও তা গ্রহণ করিনা বা সুন্দরী স্ত্রী ঘরে থাকলেও দিনের বেলা সহবাস করি না, কারণ এগুলো সিয়ামকে নষ্ট করে দেয়। আমি আল্লাহর জন্যই সিয়াম পালন করছি আর তাঁর চোখের আড়ালে যেয়ে তো কিছুই করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি এগুলো মানুষের চোখের আড়ালে গোপনে করতে সক্ষম। তাতে লাভ কি? কারণ আমার মা‘বুদ মেহেরবানের চোখের আড়ালে করা তো কোনোভাবেই সম্ভব না। তিনি বলেন, “আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার অন্তর তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার ঘাড়ের প্রধান শিরা অপেক্ষাও নিকটতর” (সূরা ক্বাফ-১৬)। সুতরাং তিনিই আমাদের অন্তরযামী ও সকল কর্মের ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। অমাবশ্যা রাত্রে ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিজের কাঁধকে যখন অন্ধকার দেখা যায় তখনও যদি কালো কুচকুচে পিঁপিলিকা কালো পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটে, তাহলে তিনি পিঁপিলিকার পায়ের শব্দ শোনেন ও পা উঠানো নামানো দেখেন। অতএব আল্লাহর চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনো প্রকারের কর্ম সম্পাদন করা সম্ভব নয়। উচিত হলো তাঁকে যথাযথ ভয় করা। এটাই সিয়ামের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও শিক্ষা।