নির্বাচনে বিজয়ী না হলে সমুদ্রে ন্যায্য হিস্যা আদায় হত না :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্রে বাংলাদেশের যে অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে সেটাকে সরকারের বিরাট সাফল্য ও দেশের বড় অর্জন হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, গত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসলে ভারতের কাছ থেকে সমুদ্রসীমার ন্যায্য হিস্যা আদায় করা সম্ভব হতো না। কারণ অতীতে অনেক সরকারই ছিল, কিন্তু কেউই এটার কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ছাড়া অতীতে অন্য কোনো সরকার বাংলাদেশের অধিকার আদায়ের উদ্যোগ নেয়নি। তিনি বলেন, সমুদ্রে তালপট্টি দ্বীপের কোন অস্বিত্ব নেই। এ নিয়ে কথা বলে সরকারের অর্জনকে খাটো করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিএনপির যে নেতা বলেছেন আমরা তালপট্টি পাইনি, তাকে বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। তালপট্টি কোথায় আছে খুঁজে বের করুক। অবশ্য যিনি এ কথা বলেছেন তিনি তো ভোলার মানুষ। ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সমুদ্র বিজয়ের ফলে অর্জিত সম্পদ যথাযথ কাজে লাগানোর ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি সমুদ্রসীমা নির্ধারণ কিংবা দেশের জন্য কিছুই করেনি। কিন্তু খুঁত ধরার চেষ্টা করে। এবার তারা অস্তিত্বহীন বিষয় নিয়ে কথা বলছে। দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সমান অবদান রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীরা জাতীয় উত্পাদনে সমানভাবে এগিয়ে আসলে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত হতে পারবো। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। নারী সমাজের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, প্রত্যেকের নিজ অধিকার আদায় করে নিতে হবে। সেজন্য দেশের প্রতিটি নারীকে আরো উদ্যমী হয়ে সামর্থ্য অর্জন করতে হবে, শিক্ষিত হতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশুর উন্নয়নের মাধ্যমেই দেশের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই আমরা নারী ও শিশুর উন্নয়নে সর্বাত্মক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি। শহরের পাশাপাশি গ্রামের নারীদের উন্নয়নেও কাজ করছে সরকার। এজন্য পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তিনি বলেন, নারীরাই কন্যা, জায়া, জননী। নারীর সেই মর্যাদা সমাজের সর্বস্তরে নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজটি শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। বাইরে নারী মুক্তির কথা বলবেন আর ঘরে গিয়ে নারী নির্যাতন করবেন এ হিপোক্রেসি থেকে সকলকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই তিনি নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০১১ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সকল মন্ত্রণালয়ে নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪০টি মন্ত্রণালয়ের জন্য জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে সর্বস্তরে নারীর অংশগ্রহণ ও সম-সুযোগ নিশ্চিত করেন। তিনি বাঙালি নারীকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছেন। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সমাজের এ অর্ধেক অংশকে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করাই এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী নারীর উন্নয়নে তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১০, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। ইভটিজিং বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়াসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ সবেতনে ৬ মাসে উন্নীত করা হয়েছে। ন্যাশনাল আইডি ও পাসপোর্টে বাবার পাশাপাশি মায়ের নাম সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ প্রণয়ন করা হয়েছে। নারী ও শিশুর আইনগত সহায়তা দেয়া হচ্ছে। চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে কোটা চালু রাখা এবং উদোক্তা তৈরিতে সরকারের বিভিন্ন ধরনের সহায়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সারা দেশে স্থানীয় পর্যায়ে ৪৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং নির্যাতিত নারীদের সার্বিক সহায়তার জন্য ৭টি জেলায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তার সকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, সংসদ নেতা, স্পিকার, সংসদ উপনেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা চারজনই নারী। বিশ্বে এর দ্বিতীয় নজির নেই। ২০ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যসহ ৭০ জন নারী এমপি আছেন। ২০ শতাংশ নারী সংসদ সদস্য বিশ্বের খুব কম দেশেই আছে। তিনি বলেন, আমরা আইন করে স্থানীয় সরকারগুলোতে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ করেছি। পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা করেও অনেক নারী নির্বাচিত হচ্ছেন। ফলে গ্রাম পর্যন্ত নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে সপ্তম। নারী শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত উপবৃত্তি চালু করা হয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে এমডিজি ২ ও ৩ এর লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এমডিজি এওয়ার্ড ও সাউথ-সাউথ এওয়ার্ড পেয়েছি। শেখ হাসিনা বলেন, সারাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নারীর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে মোবাইল ফোন স্বাস্থ্য সেবা চালু করা হয়েছে। এখান থেকে নারী ও শিশু রোগীরাই বেশি উপকৃত হচ্ছে। নারী ও শিশুর প্রতি বৈষম্য হ্রাসে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এছাড়া কর্মজীবী মায়েদের জন্য ৬টি বিভাগীয় শহর ও ১৩টি জেলা শহরে মোট ৪৪টি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করা হয়েছে। ৭টি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল চালু এবং গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে ডরমিটরি নির্মাণ করা হচ্ছে। যাদের মা-বাবা নেই বা হারিয়ে যাওয়া শিশু, যারা রাস্তায় মানবেতর জীবন-যাপন করে তাদের ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানব সন্তান এভাবে ঘুরে বেড়াবে এটা হতে পারে না। এটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিকুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরীসহ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।