এখনো বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি ব্রাজিলবাসীর
সোহেল সারোয়ার চঞ্চল, ব্রাজিল থেকে
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৫
২০১৪ বিশ্বকাপ ফুটবলের আগ পর্যন্ত ব্রাজিল পেছনের আসরগুলোতে ৯৭টা ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে জিতেছে ৬৭টি ম্যাচ। ড্র হয়েছে ১৫টি। আর হেরেছে ১৫ ম্যাচে। কিন্তু এবারের মতো রেজাল্ট আর হয়নি। ব্রাজিলীয়ানদের মতে, এতো অপমানজনক স্কোর আর দেখেনি তারা। ১৯৫০ বিশ্বকাপে যেমন মারাকানা ট্রাজেডি ঘটে ছিল। ৬৪ বছর পর এবার মারাকানার ট্র্যাজেডি দেখা দিল বেলেহরিজোন্তের মিনেরিও’র। ব্রাজিলীয়দের কাছে ৮ জুলাই ২০১৪ কলংকের দিন। কলংকের বছর। তাই মঙ্গলবারের ম্যাচে তাদের দুঃখজনক পরাজয়ের ফলে জন্ম নেয়া বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি এখনো।
পুরো ব্রাজিল জুড়ে উঠে আসছে আগে কতোবার ব্রাজিল ফুটবল লজ্জা দিয়েছিল ফুটবল দুনিয়াকে। কেউ বলছেন ছয়বার। ব্রাজিল ফুটবল ট্র্যাজেডি নিয়ে বই প্রকাশ হয়েছে এবার। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে ১৯২০ সালে উরুগুয়ে ৬-০ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিলকে।
আধুনিক ফুটবলের যুগে ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটতে পারে তা এখনো কেউ বিশ্বাস করছেন না। সবাই যেন দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছে। ক’দিন আগে ব্রাজিল তারকা রবার্তো কার্লোসের সাথে সাও পাওলোর এরিনা করিন্থান্সের মিডিয়া ক্যাফেটেরিয়ায় বিশ্বকাপ নিয়ে কথা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, আর্জেন্টিনার নো চান্স। ব্রাজিলই চ্যাম্পিয়ন হবে। সেই রবার্তো কার্লোসের সাথে আবার দেখা হলো। জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমিও বুঝলাম না কি হলো। জার্মানির কাছে শোচনীয় ভাবে হেরে আমিও মুখ দেখাতে পারছি না। অনেকেই আমাকে একই প্রশ্ন করছেন উত্তর নেই আমার কাছে, বলে চলে গেলেন কার্লোস।
মেক্সিকান সাবেক ফুটবল তারকা ক্যাম্পোস এসেছিলেন সাও পাওলোতে। আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস ম্যাচের আগে ব্রাজিল ম্যাচ নিয়ে বলেন, খুবই দুঃখজনক। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। কেন এটা হয়েছে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন আছে। আর আমার মনে হয়, ব্রাজিল ফুটবলে পরিবর্তন আনতে হবে।’ আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস সেমিফাইনালের আর্জেন্টাইন সাবেক মিডফিল্ডার ভেরন এসেছিলেন টিভিতে বিশেষজ্ঞ মতামত দিতে।’ জার্মানির বিরুদ্ধে ৭ গোল হজম নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে ভেরন বলেন, আমি কফির মগে চুমক দিতেই দেখি গোল। আবার চুমক দিয়ে ফিরে তাকাতেই দেখি আবার গোল। আমার খুব মায়া হয়েছে ওদের প্রতি। ইউরোপীয়ান ফুটবলের কাছে ব্রাজিল এতোটা অসহায় হয়ে পড়বে এটা আমি কেন, কেউ বিশ্বাস করবে না। আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন, আপনি নিজে কি বিশ্বাস করেন এটা? আমার মনে হয় অতিরিক্ত নেইমার নির্ভর হওয়াটা ঠিক হয়নি ব্রাজিলের।’
কোনো কথা মানতে নারাজ ব্রাজিলীয়রা। তারা বলছেন, কোচের জন্যই দল ডুবেছে। নেইমার ছাড়া আর কোনো খেলোয়াড় থাকবে না কেন। ফুটবলটা তো একজনের খেলা নয়। কেন কাকার মতো ফুটবলারকে বাদ দেয়া হয়েছিল। কেন ম্যাচের আগের অনুশীলনে গোপনীয়তা ছিল না। স্কোলারি তার দলের অনুশীলন সবার জন্য উন্মুক্ত রেখে ছিলেন।
বলা হচ্ছে, জার্মানির ফুটবল গুপ্তচররা ব্রাজিলের ট্যাকটিক্যাল অনুশীলনের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। জার্মানির অনুশীলনে কারো প্রবেশাধিকার ছিলো না। কোনো সংবাদ মাধ্যমকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। খোলা আকাশের নিচে অনুশীলন করাননি জোয়াকিম লো। স্কোলারি এতো বড় মানের কোচ তিনি সব জানেন। তার পরও কেন জার্মানির জন্য গোপনীয়তা উন্মুক্ত করে দিলেন।
হাজারো প্রশ্ন এখন ব্রাজিলবাসীর মুখে। জার্মানরা ভালো খেলেছে। কোনো সন্দেহ নেই তারা দুর্দান্ত পারফর্ম করেই ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু মানতে চাইছে না ব্রাজিলীয়রা। তাদের চোখে কান্না। আবার বুঝি ৬৪ বছর অপেক্ষা করতে হবে। প্রবীণের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে একই কথা; দেখে যেতে পারলাম না। আর নবীনের কণ্ঠে হতাশা; আর দেখতে পারবো কিনা জানি না।
নেইমারের বাড়িতে পুলিশি পাহারা
নেইমার আহত হয়ে যতটা কষ্ট পেয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেলেন জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের হারে। এমন হাল হবে নেইমারও ভাবেননি। নেইমার ব্রাজিলকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসেছেন। তার ফুটবল যেন পুরো দলকে উজ্জীবিত করে। ব্রাজিলীয়দের মাঠে টানে। তিনি সাও পাওলোর গুয়ারোজা এলাকার বাড়িতে আছেন। বাড়ি আসার পর সেখানে ভীড় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে পুলিশ পাহারা বসাতে হয়েছে। সবাইকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি সংবাদ মাধ্যমকেও প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ব্রাজিলের সাংবাদিকরা জানান, আমাদের বড় বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠান থেকে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।