ভ্যাটের চাপে নাকাল ভোক্তা

১৯৯১ সালে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী এম.সাইফুর রহমানের সময়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থা প্রচলনের পর দুই দশকের বেশি সময় পার করেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে এ খাত থেকেই রাজস্বের সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে সরকারের ঘরে। কিন্তু ভ্যাট নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। সরকার মনে করে আরো অনেক বেশি ভ্যাট আদায়যোগ্য হলেও নানামুখী কারণে তা আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, ভ্যাটের উচ্চ হারের কারণে ব্যবসা স্বাভাবিক গতি পাচ্ছে না। আর ভোক্তারা বলছেন, ভ্যাট ব্যবস্থা চালু হওয়ার প্রকৃত চাপ তাদের উপরই পড়ছে। দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিতে ভ্যাটের উচ্চ হার থেকে তারা রেহাই চান। গতবছর ভ্যাট দিবসের অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাটের হার বেশি বলে ইঙ্গিত দিয়ে তা কমানো হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ১৯৯১ সালে যখন ভ্যাট ব্যবস্থার প্রচলন করা হয়, তখন ‘আদায় হয়তো সব হবে না’ - এই বিবেচনায় ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এই হার আগামী দু’বছরের মধ্যে কমিয়ে আনা হবে। এটি কীভাবে কমতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। অথচ একবছরের মাথায় চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কয়েকটি খাতে ভ্যাটের হার বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছেন। অর্থমন্ত্রী ২৩ ধরনের পণ্য ও সেবার উপর সরাসরি ভ্যাটের হার বাড়িয়েছেন। এর বাইরে বেশ কয়েকটি খাতে ট্যারিফ মূল্য বাড়ানোরও প্রস্তাব করেছেন। এর কয়েকটি বিত্তবানদের টার্গেট করে করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের মানুষকেই বাড়তি টাকা গুণতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। জ্বালানি তেলের ট্যারিফ মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাবে জ্বালানি তেলনির্ভর সব গণপরিবহনে ব্যয় বাড়বে। যার মাশুল গুণতে হবে সব শ্রেণীর জনসাধারণকে। জ্বালানি তেলনির্ভর শিল্পের ব্যয় বাড়লে পণ্যমূল্যও বাড়বে। সব ধরনের পরিবহনের উপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে তিন শতাংশ হারে। একটি সাধারণ মানের রেস্টুরেন্টে খেতেও ভোক্তাকে ভ্যাট আকারে বাড়তি টাকা গুণতে হবে। এতদিন বাসায় তৈরি করা বিস্কুট ও কেক জাতীয় খাবারের উপর ভ্যাট আরোপ ছিল না। নতুন বাজেটে এসব খাবারকে অব্যাহতির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে এসব খাদ্যের ভোক্তা স্বল্প আয়ের মানুষ এমনটি একজন দিনমজুরকেও ১৫ শতাংশ হারে বাড়তি টাকা গুণতে হবে। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী, উল্লিখিত পণ্য বা সেবার বাইরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস, লঞ্চ ও রেল সেবার উপর বিদ্যমান ভ্যাট ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ, গাড়ির গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ, ডকইয়ার্ড, ফটো নির্মাতা ও পরিবহন ঠিকাদারের উপর ভ্যাট সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের উপরও বাড়তি তিন শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া ডেভেলপারদের ভ্যাট দ্বিগুণ, জুয়েলারি সেবার ভ্যাটও প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। ২০১২ সালে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ কিংবা চাপে নতুন ভ্যাট আইন পাস করেছে। ওই আইন অনুযায়ী, সব ধরনের পণ্য বা সেবার উপর একই হারে ভ্যাট আরোপ হবে। সেই হার ১৫ শতাংশ। অর্থাত্ ভিন্ন ভিন্ন হার বা সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে ভ্যাট প্রথা বাতিল হবে। এই আইনটি আগামী বছরের জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। এই আইনটি নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, নতুন ভ্যাট আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। ১৫ শতাংশ ভ্যাটের হার অনেক বেশি। আর সবচেয়ে বড় কথা, পরোক্ষ কর হওয়ায় এই ভ্যাটের চাপ একজন স্বল্প আয়ের ক্রেতার উপরও পড়ে। গত বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী ভ্যাট দিবস পালিত হলো। আগামী বুধবার পর্যন্ত চলছে ভ্যাট সপ্তাহ। মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের সেরা ভ্যাটদাতাদের পুরস্কৃত করা হয়। সারা দেশের সর্বোচ্চ ৯ প্রতিষ্ঠানকে এবং জেলা পর্যায়ে ১১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হবে সেরা ভ্যাটদাতার পুরস্কার। পুরস্কার নিতে এসে ব্যবসায়ীরা তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের হয়রানির কথাও তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বিদ্যমান ভ্যাটের হার বেশি বলে অভিযোগ তোলেন। তারা মনে করছেন, ভ্যাটের হার কমানো হলে আদায় আরো বাড়বে। অন্যদিকে ভ্যাটের হার মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় ফাঁকিও বাড়ছে। সুযোগ পেলেই ব্যবসায়ীরা ফাঁকি দেয়ার চেষ্টায় থাকেন বলে রাজস্ব বোর্ড কর্মকর্তাদের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ফলে মাঠপর্যায় থেকেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ভ্যাট সরকারের ঘরে আনা যাচ্ছে না। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ইলেক্ট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) মেশিন ব্যবহারের উদ্যোগ ছিল এনবিআরের। কিন্তু নানামুখী কারণে তা এখনো কার্যকর করা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্যাটের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে এনে আদায় ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিলে ভ্যাট আদায় বাড়বে। তবে এই ব্যবস্থায় স্বল্প আয়ের ভোক্তাদের চাপ না দিয়ে প্রত্যক্ষ কর বা আয়করে মনোযোগ দেয়ার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।