উত্থান-পতনে ভারতের পুঁজিবাজার

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পুঁজিবাজারের সূচক গেল সপ্তায় সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার প্রত্যাশায় দেশটির পুঁজিবাজারের সূচক সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে যায়। প্রথমবারের মতো সেনসেক্স সূচক ২৬ হাজার পয়েন্ট পার হয়। পুঁজিবাজার চাঙ্গা হওয়ার পেছনে দেশটির নতুন সরকার ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয় বাড়ার বৃদ্ধি ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। এদিকে বাজার চূড়ায় উঠার পর বর্তমানে কিছুটা দর সংশোধন শুরু হয়েছে। সূচক বাড়ার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে লেনদেন না বাড়ায় পতন শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনদিনে সেনসেক্স কমেছে প্রায় সাড়ে ৭শ’ পয়েন্ট। একটানা দর বৃদ্ধির ফলে এ ধরনের পতনকে দর সংশোধন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ভারতের পুঁজিবাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরার পেছনে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ভালো আয়ের পাশাপাশি অর্থনীতি সামনে আরও ভালো হওয়ার আশা কাজ করেছে। জানা গেছে, আগামী বাজেট নিয়ে ভারতের জনগণের মধ্যে অনেক ইতিবাচক প্রত্যাশা রয়েছে। তাই দ্রুতগতিতে উঠেছে পুঁজিবাজারের সূচক। গেল সোমবার সেনসেক্স সূচক ২৬ হাজার ৩৭ পয়েন্টে উঠে এসেছে। নতুন উচ্চতায় উঠার রেকর্ড তৈরি করেছে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক নিফটি-ও। নিফটি পৌঁছে গেছে ৭ হাজার ৭৭১ পয়েন্টে। এক বছর আগেও এ সূচক ছিল ৫ হাজার ১১৮ পয়েন্টে। তথ্যে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত ২৬ হাজার ৩৭ পয়েন্ট সেনসেক্সের সর্বকালীন সর্বোচ্চ পয়েন্টের রেকর্ড। একবছর আগেও সেনসেক্স সূচক ছিল ১৭ হাজার ৪৪৮ পয়েন্টে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারের এই উত্থানের মূল কারণ, নতুন সরকার আসায় আগামী বাজেট নিয়ে মানুষের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। তারা মনে করছেন, বাজেটে অর্থ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অরুণ জেটলি শুধু জনমোহিনী নীতির দিকে ঝুঁকবেন না। বরং তাতে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার দিকনির্দেশনা থাকবে। সে ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। তাই দেশের অর্থনীতির সাথে সাথে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরমেন্স আরও ভালো হওয়ার প্রত্যাশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। তাছাড়া সূচকের উত্থানে সহায়তা করেছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারের তেজি হয়ে ওঠা। আমেরিকায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। তাই অন্যান্য অনেক দেশের মতো এর প্রভাব পড়েছে ভারতের বাজারেও। তবে দেশটির শেয়ারবাজারে এত দ্রুত উত্থানে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, বাজারে সামনে একটা সংশোধনের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ সূচক বেড়ে গেলেও লেনদেনের পরিমাণ তেমন বাড়েনি। আর লেনদেনের পরিমাণ উত্থানের সঙ্গে সমানুপাতিকহারে না বাড়লে, সূচক যেখান থেকে বাড়তে শুরু করে সেখানেই ফিরে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। ইতিমধ্যে বাজারে দর পতনের প্রবণতা শুরু হয়ে গেছে। গত ৮ জুলাই মঙ্গলবার সেনসেক্স ৫১৭.৯৭ পয়েন্ট পড়ে ২৫ হাজার ৫৮২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বুধবার সূচক কমেছে ১৩৮ পয়েন্ট। আর বৃহস্পতিবার পতন হয়েছে ৭২ পয়েন্ট। মূলত বাজেট নিয়ে অনিশ্চয়তা সব সময়েই বিনিয়োগকারীদের মনে থাকে। তাই সাধারণত লাভের টাকা ঘরে তোলার একটা প্রবণতা বাজেটের আগে দেখা যায়। এবার সূচক বাজেটের অনেক আগেই বেড়ে গেছে। তাই পতনের পরিমাণও একটু বেশি। দেশটির বাজার উত্থান পতন প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসা নিয়ে আশায় ভর করে এবার সূচকের দৌড় শুরু হয় নির্বাচনের আগেই। তাই বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছিলেন, দামে সংশোধন হওয়ার সময় এসে গেছে। সাধারণ বাজেটের আগে আংশিকভাবে সেটাই হল। এই অবস্থায় সেনসেক্স ২৫ হাজারের আশেপাশে থাকা উচিত। এই পতন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার সুযোগ করে দিবে। বাজেট ভাল হলে তো বাজার আরও তেজী হবেই। না-হলেও দ্রুত পতনের সম্ভাবনা কম। কারণ, সেক্ষেত্রে পড়তি বাজারের সুযোগে বিদেশি সংস্থাগুলো তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াবে। এদিকে দেশের পুঁজিবাজারের সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের পতন শুরু হয়েছে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। ডিএসই সূচক প্রায় ৯ হাজার থেকে কমতে কমতে ৪ হাজারে নেমে এসেছে। তিন হাজার কোটি টাকার লেনদেন নেমে এসেছে দুইশ’ কোটি টাকায়। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরমেন্স খুব একটা ভালো না হওয়ায় সূচকের পতন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিএসই ও সিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) আগের বছরের তুলনায় কমছে। গত বছরও একই প্রবণতা ছিল। তাই শেয়ার কিনে লাভবান হতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। এতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের চাহিদা কমছে। নিম্নমুখী হচ্ছে পুঁজিবাজারের সূচক। এদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণ হলো- গেল জানুয়ারিতে নতুন সরকার গঠিত হলেও বাজেটে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার মতো তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। এতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছেন না। অর্থনীতিতেও বড় কোনো উদ্যমী ভাব আসছে না। এসব প্রসঙ্গে ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, ভারতে নতুন সরকার গঠনের সাথে সাথে অর্থনৈতিক পরিবেশ চাঙ্গা হওয়ার প্রত্যাশা গোটা দেশজুড়ে প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া দেশটির তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরমেন্সও ভালো। এজন্যই পুঁজিবাজার চাঙ্গা হয়েছে। আমাদের দেশেও অর্থনৈতিক চাঙ্গা হওয়ার আস্থা তৈরি হলে বাজার ভালো হবে। তাছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরমেন্স ভালো হলে শেয়ারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।