আনারস প্রকৃতির একটি ফল জাতীয় উদ্ভিদ
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৪, ২০:২০
স্থানীয় নাম : আনারস
বৈজ্ঞানিক নাম: আনানাস স্যাটিভাস (Ananas sativus)
আনারস প্রকৃতির একটি ফল জাতীয় উদ্ভিদ। এটি দেখতে আকর্ষণীয়, রসালো ও সুস্বাদু ফল। এ ফল পাহাড়ি অঞ্চলে চাষাবাদের জন্য অধিক উপযোগী। পৃথিবীতে প্রায় ৯৫ প্রজাতির আনারস চাষ করা হয়। বাংলাদেশে জায়েন্ট কিউ, কুইন, হরিচরণ ভিটা ও বারুইপুর এ চার জাতের আনারস ঘোড়াশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি চাষ করা হয়।
হানিকুইন পার্বত্য এলাকায় ‘দেশি আনারস’ নামেই পরিচিত। এ জাতের আনারস অন্যান্য স্থানে ‘বিলেটি’ নামে পরিচিত। অন্য আনারসের চেয়ে হানিকুইন অনেক বেশি মিষ্টি, শাঁস গাঢ় হলুদ ও আঁঁশ কম। গাছ অপেক্ষাকৃত ছোট, পাতা কন্টকময় এবং নিচের দিকে বাঁকানো, ফল আকারে ছোট এবং ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজির মত হয়। তবে তুলনামূলকভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এগাছ অনাবৃষ্টি সহ্য করতে পারে। এ ফলের অঙ্গ কণ্টকময়।
আনারসের আদিনিবাস দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায়। দক্ষিণ আমেরিকা ও রেড ইন্ডিয়ানদের ভাষায় এনানাসের অর্থ ” চমত্কার ফল” (A= ফল; nanas=চমত্কার)। পর্তুগিজদের দ্বারা ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে আনারস গাছ ব্রাজিল থেকে মালাবার উপকূলে বিস্তৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকা ও পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে আনারসের চাষ প্রবর্তিত হয় এবং ক্রমে দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দো চীন, ফিলিপাইন, যুক্তরাষ্ট্র (হাওয়াই রাজ্য), মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও অস্ট্রেলিয়ায় এর চাষ প্রসার লাভ করে।
আনারস গাছের কান্ড ক্ষুদ্রাকারের, কান্ড বহুসংখ্যক অতি ঘন সন্নিবিষ্ট পুরু, দীর্ঘ, পিচ্ছিল পাতা দ্বারা আচ্ছাদিত। পাতার অগ্রভাগ সুচালো এবং দুই পার্শ্ব কাটা যুক্ত। এ কারণে সহজে আনারস বাগানে প্রবেশ করা কষ্টসাধ্য । আনারসের পাতায় কোনো বোঁটা নেই, কান্ডের সাথে সংযুক্ত। পাতার সুচালো মাথা কৌণিকভাবে উর্দ্ধমুখি। গ্রীষ্মের সময় আনারস গাছে ফুল ফুটে এবং বর্ষা শেষে ফল পাকা শেষ হয়। একটি বোঁটার সাথে বহুসংখ্যক পুষেপর সমন্বয়ে এ গাছের পুষপ মঞ্জুরী গঠিত হয়। সকল ফুলে মাতৃ কোষ একত্রিত থাকে যা পরবর্তীতে একটি যৌগিক ফলে রূপান্তরিত হয়। ফলের মাথায় ঠিক আনারস গাছের অনুরূপ একটি পত্র মুকুট থাকে যা ফল থেকে সৃষ্টি হয়। এ মুকুটের সাহয্যে ও আনারসের বংশ বিস্তার করা যেতে পারে।
আনারস বছরে দু’বার তোলা হয়। আগস্ট- সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে গাছে প্রধান ফল পাওয়া যায়। কিন্তু যেসব গাছে ফুল দেরিতে আসে সেখানে শীতের সময় ফল পাকে। বর্ষাকালে ফল সুস্বাদু ও সুমিষ্ট হয় । এছাড়া শীতের ফল ছোট ও টক হয়। আনারস কাঁচা ও পাকা উভয় ভাবেই খাওয়া যায়। কাঁচা আনারস স্বাদে টক এবং পাকা আনারস টক মিষ্টি হয়ে থাকে। আমাদের দেশে সাধারণত পাকা আনারস খাওয়া হয়।
পুষ্টি উপাদান (জলডুবি) : পুষ্টিগুণে আনারস অতুলনীয়। এতে ভিটামিন-এ, বি, সি, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ১০০ গ্রাম আনারসে ০.৯ ভাগ প্রোটিন, শ্বেতসার ৬.২ গ্রাম, ০.২ ভাগ ফ্যাট, ০.২ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ০.১১ গ্রাম ভিটামিন বি-১- ০.০৪ মি. গ্রাম; ভিটামিন ২-০.১১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন- সি ২১ মিলি গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৮ মিলি গ্রাম, ক্যারোটিন ১৮৩০ মা.গ্রাম রয়েছে। এছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম ফল থেকে ৩০ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায় [ পুষ্টিমান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন]
উপকারিতা
আনারসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি রয়েছে। ভিটামিন সি জিহ্বা, তালু, দাঁত, মাড়ির যে কোনো অসুখ প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। আনারসের খনিজ লবণ ম্যাঙ্গানিজ, যা দাঁত, হাড়, চুলকে করে শক্তিশালী। গবেষণা করে দেখা গেছে, গলা ব্যথা, সাইনোসাইটিস জাতীয় অসুখগুলো কম হয়। আনারস ত্বকের মৃত কোষ দূর করে, ত্বককে কুঁচকে যাওয়া প্রতিরোধ করে। এ ফল গরম-ঠান্ডা-জ্বর, জ্বর-জ্বর ভাব দূর করে, দেহে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়, শরীরে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে, রক্ত পরিষ্কার করে। আনারস কৃমিনাশক ও দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর ও জ্বর ও জন্ডিস রোগ প্রতিরোধ করে । আনারস হজমে সাহায্য ও ক্ষুধাবর্ধক হিসেবে কাজ করে ।