‘খাদ্যে রাসায়নিক’ একটি নীরব দুর্যোগ :সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়কে প্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে সমাবেশ ঘটানো আমার পুরনো অভ্যাস, কিছুটা বদঅভ্যাসও বলতে পারেন। কিন্তু আজকের বিষয়টি মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ফরমালিনের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে বিষোদগার করেছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে ঢাকার প্রবেশ পথসমূহে চেকপোস্ট বসিয়ে ফরমালিন বা বিষযুক্ত খাদ্যদ্রব্য রাজধানীতে ঢুকতে না দেওয়ার জন্য কাজ করছেন। প্রয়াসটি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী এবং জাতির জন্য স্বস্তিদায়ক। আজ যারা শিশু আগামী দিন তারাই আমাদের জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার হাল ধরবে। কিন্তু কীভাবে? যে জাতির ভবিষ্যত্ কর্ণধাররা সকাল-সন্ধ্যা নিয়ম করে তিনবেলা বিষযুক্ত খাবার খাচ্ছে তাদের দিয়ে একটি মেধাবী জাতি পেতে পারি কিন্তু তারা হবে রোগাক্রান্ত। এমনিতে নানাবিধ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ দ্বারা আক্রান্ত বাংলাদেশ। মানব সৃষ্ট দুর্যোগগুলোর সিলেবাসে খাদ্যদ্রব্যে বিষ মেশানো এখন একটি নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে, যার ক্ষতির পরিমাণ জাতিকে আস্তে আস্তে গুনতে হবে। বাংলাদেশের শহর এলাকার বাজারগুলোতে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুতেই এখন বিষ বা ফরমালিনের কালো ছায়া। গ্রামেও কম নয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে এসব বাজারের কোনো কিছুই কখনোই নষ্ট বলে পড়ে থাকে না অর্থাত্ এগুলো কখনোই পচে যায় না। আমরা চরম প্রতিযোগিতা করে এসব জিনিস আমাদের আদরের সোনামণিদের জন্য সর্বোপরি প্রিয়জনদের জন্য কিনে নিয়ে যাই । কিছুটা না বুঝে আর বাকিটা নিরুপায় হয়ে। এর একটি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লে¬ষণ আমার কাছে আছে। অবচেতন মনে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ মনে করে দামি শাকসবজি, ফলমূল এবং বড় মাছ কেনার ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা নির্ভরশীল। এর একটি উদাহরণ উপস্থাপন করছি—টমেটো বা অন্য কোনো দামি সবজির পাশে গোল আলু থাকলে মোটামুটি সবাই বিষমুক্ত আলু বাদ দিয়ে আগে বিষযুক্ত টমেটোটি কিনতে চান। আলুর চেয়ে টমেটোর দাম কয়েকগুণ বেশি এবং আমরা মনে করি সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতা প্রমাণের এটি একটি উপায়। কিন্তু এ টমেটোর জন্ম থেকে বৃদ্ধি, বৃদ্ধি থেকে বাজারজাত সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় নানারকম রাসায়নিকের মিশ্রণ। আমার অনেক সহকর্মীকে বলতে শুনি—আমার বাচ্চারা ফল ছাড়া কিছুই খেতে চায় না। এসব কথা বারবার শোনার পর অফিসের পিওন সহকর্মীও মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়—আজ যে করেই হোক ছেলেমেয়ের জন্য কিছু ফলমূল বাসায় নিয়ে যেতে হবে। কারণ তার ধারণা অফিসের বসদের ছেলেমেয়ে ফল খায় মানে এটা ধনী লোকের খাবার। সেও যদি তার সন্তানকে এটা খাওয়াতে পারে তাহলে তারও সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। অর্থাত্ আমরা সকলে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সর্বদাই লিপ্ত। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এরকম কিছু বিষয় লুকিয়ে আছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জাতিকে কিছুটা হলেও শঙ্কামুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমার ভাবনা অন্য জায়গায়। কারণ এসব ফলমূল, শাকসবজির মধ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মেশানো শুরু হয় এদের জন্ম থেকেই। একজন ডিএমপি কমিশনার অথবা সরকার কারো একার পক্ষে এর আশু সমাধান সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন গোষ্ঠীবদ্ধ জনসচেতনতা, নৈতিকতা সর্বোপরি ভবিষ্যত্ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের সুশীল সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমার ধারণা। আমাদের দেশে গোটা আড়াই ডজন টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে যার প্রতিটিতে প্রায় প্রতিরাতে টক শো নামক আলোচনার টেবিলে রাজনীতিবিদদের বিশেষ করে শাসকশ্রেণিকে সমালোচনা করা ছাড়া অন্য কিছু কালেভদ্রে চোখে পড়ে। তবে এ সমালোচনার ভাগিদার ক্ষমতাহীনদেরও হতে হয়। কিন্তু আমার বিশ্বাস তাঁরা পারবেন একটি সামাজিক বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে। তাই দেশের এসব সমস্যা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করুন তাতে আমরা একটা সুস্থ জাতি উপহার পাবো। আর যদি বর্তমান অবস্থা চলতে থাকে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা একটা জীর্ণশীর্ণ অসুস্থ জাতি উপহার পাবো যেটা কারোরই কাম্য নয়। আমরা চাই সুস্থ-সবল একটা বুদ্ধিদীপ্ত জাতি যারা আগামীকে সাজাবে সুন্দর করে। এটি সরকার কিংবা সংশ্লি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের একার দায়িত্ব নয়—আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। এক সময় বাংলাদেশে ডায়রিয়া নামের রোগটি মহামারী আকার ধারণ করতো। কিন্তু আজ সেটা গল্প! আমাদের ধারণা সকলে এক হয়ে কাজ করলে ‘খাদ্যদ্রব্যে বিষ’ এটাও একদিন গল্পে পরিণত হবে। আর সেদিন আমরা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের মতো আবারো বলতে পারবো— “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।” বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়