দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে

নিয়মিত বা অনিয়মিত পত্রিকা পাঠকের কাছে ধর্ষণ বিষয়টি পাঠ্যরূপে অধিকার অর্জন করেছে। দৈনন্দিন খবরের কাগজের জীবনের অপরিহার্য অঙ্গের মতো স্থান করে নিয়েছে বিষয়টি। খবর পড়ে আফসোস করে বলি, আহা! সমাজের মানুষ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কি জন্য হচ্ছে ঠিক জায়গায় মলমের ব্যবস্থা করছি না। সবখানে ধর্ষণের রব উঠছে বটে কিন্তু আমরা কিছু মানুষ রবকে রস বানিয়ে ব্যবহারিক বস্তুর মতো করে ফেলেছি। ভুলে গেছি মেয়েরাও যে সৃষ্টির সেরা জীব। তাদেরো নিরাপদে বের হওয়ার অধিকার আছে। দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পন্ন করার অধিকার আছে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অধিকার আছে। মুহূর্তের জন্য ভুলে যাই মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে তাদের অবদান পুরুষের সমান। তবে এখন প্রশ্ন হলো—ধর্ষণ কেন হচ্ছে? এক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের মাঝে বিরোধ লেগে যায়। তা হলো—দৃষ্টিভঙ্গি এবং পোশাক। তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন হবে, দৃষ্টিভঙ্গি নাকি পোশাক দায়ী এই বর্বর কাজটির জন্য? বিশ্বের এই সময়ে পৃথিবীতে মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্যে হাইব্রিডের মতো বাম্পার ফলন হয়েছে। সঙ্গে ধর্ষণ নামক রুচিরো যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে। যার ফলে ধর্ষণ শব্দটি বিশ্বের আতঙ্কিত শব্দরূপে নারী জাতির কাছে আবার বিকৃত রুচির পুরুষের কাছে রোমাঞ্চিত শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথায় আছে, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান, জীবন পাল্টে যাবে। ধর্ষণ করার সময় ভুলে যায় যে, আমাদেরো পরিবার আছে। কীভাবে একজনকে ধর্ষণ করে ঘরে ফিরে গিয়ে নিজের বোনের মুখটা দেখবো, কীভাবে নিজের মেয়ের মুখটা দেখবো। যাকে আমি ধর্ষণ করছি সে তো কারো মেয়ে, কারো বোন, আবার কারো স্ত্রী। আমাদের পরিবারের প্রতি আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি থাকে তা কি সমাজে সব নারীর ক্ষেত্রে থাকতে পারে না? কেন হেঁটে স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া একটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করবো? যদি আমার বোনকে কেউ করে তাহলে পারবো কি মেনে নিতে? সমাজে কেন উন্নতমানের সুন্দর চাহিদা সম্পন্ন সচেতনতার মনোভাব বাড়ছে না? কিন্তু কে নিবে সে দায়িত্ব? নিজেরাই নিজেদের পরিবারকে ধর্ষণের পথে হাঁটিয়ে দিচ্ছি। সমাজের কিছু ব্যক্তি ধর্ষণের অপরাধীকে সাজা থেকে মুক্তিপণ দিয়ে নিয়ে আসে ক্ষমতার বলে। কিন্তু তারা ভাবে না যে, ঐ ধর্ষক যদি তার মেয়েকে ধর্ষণ করতো তাহলে তার প্রতিক্রয়াটি কেমন হতো! সভ্য হয়েও আমাদের আচরণ বিবেকহীন পশুর মতো কেন? আমরা কি তাহলে ফিরে যাচ্ছি সে দিনের কাছে, যখন মানুষ বসবাস করতো প্রকৃতির রাজ্যে! এই বিশ্বজয়ের বিজয়ী মুকুটের স্বাদ কি আছে যদি নিজের সমাজের মানুষের আতঙ্কটি আমরা নিজেরাই জয়ী করতে না পারি! এক বছরের শিশু থেকে শুরু করে শত বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষিত হচ্ছে। রোমাঞ্চিত ফাঁকা বুলির পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে আদর্শ মূল্যবোধ।

অপরদিকে বিশ্ব যত উন্নত হচ্ছে কাপড় যেন তত বিশ্ব থেকে সংক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে। মানব সমাজে কাপড়ের চাহিদা কমতে শুরু করেছে। কিন্তু কেন? এ কথা সত্য যে, নারীদের  প্রতি যেমন পুরুষের চাহিদা আছে, ঠিক তেমনি তাদেরো পুরুষের প্রতি চাহিদা আছে। অশালীন পোশাকের কারণে পুরুষের মাঝে বাজে দৃষ্টিভঙ্গি জন্মে। দৃষ্টিভঙ্গি খারাপ হওয়ার পেছনে অন্যতম ইন্ধনদাতা হলো পোশাক। উন্নত দেশ আমেরিকার কথা বলি, ন্যাশনাল ভায়ল্যান্স এগেইন্স্ট সার্ভের মতে, আমেরিকার ছয়জন মহিলার মধ্যে একজন মহিলা ধর্ষণের শিকার। ব্রিটেনে প্রতি পাঁচজন মেয়ের মধ্যে একজন মহিলা ধর্ষণের শিকার। কেন না তাদের চেতনা এবং পোশাকের মাঝে সভ্যতার নামে যথেষ্ট বাড়াবাড়ির ব্যঞ্জন রয়েছে। তাদের তুলনায় আমাদের দেশে অনেক কম। কারণ আমরা চেতনা এবং কাপড়ের দিক দিয়ে তাদের মতো উন্নত হতে পারিনি। তবে একথাও ভুললে চলবে না যে, আমাদের দেশে আগের তুলনায় ধর্ষণের হার অনেক বেশি বেড়ে গেছে। পশ্চিমা বিশ্বের সংস্কৃতিতে প্রভাবিত হয়ে আমরা আমাদের অস্থিত্ব ভুলে তাদের কাঠামো গ্রহণ করেছি, যার ফলশ্রুতিতে তাদের জীবনের মতো আমাদের জীবনে তাদের বৈশিষ্ট্যের রূপ গ্রহণ করেছে। তাদের মতো আমরাও ধর্ষিত হতে শুরু করেছি। আগের বাঙালি তো এমনভাবে ধর্ষিত হয়নি। তবে বর্তমানে কেন? দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের শালিনতা হওয়া চাই। অন্যথায় ধর্ষণ বাড়তে থাকবে।

যারা ধর্ষণের জন্য পোশাককেও উপকরণ হিসেবে মেনে নিতে বিরুদ্ধচারণ করেন, তারাও জানে যে কিছু বিকৃত রুচির পুরুষ জাতি পোশাকের কারণে নারীদের দিকে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে তাকায়। তবে তারা সেটা বরাবর অস্বীকার করে। তাছাড়া বর্তমানে ইন্টারনেটের আশীর্বাদে সব কাজ হয়। তবে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পর্ণো সাইটগুলো মানুষকে ধর্ষণের জন্য উত্সাহিত করে। তবে বর্তমানে সরকার কর্তৃক ইন্টারনেটে রাজত্বকারী অধিকাংশ পর্ণো সাইট বন্ধ করা হয়েছে। পর্ণো সাইটে নারীদের ভোগের বস্তুরূপে প্রদর্শন করা হয়। বাংলাদেশে পর্ণো শব্দটি দৈনিক ২৬৬৬৬ বার সার্চ করা হয়। তাই আমাদের উচিত নিজেদের সন্তানের উপর যথার্থ দৃষ্টি রাখা। মোট কথা হলো—দৃষ্টিভঙ্গি এবং পোশাক একে-অপরের পরিপূরক।  তাই পোশাক হওয়া চাই শালিনতা সম্পন্ন। আমাদের উচিত হবে সুন্দর ধর্ষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে পোশাকের মধ্যে শালিনতা আনা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়