লাশ দাফন না দাহ সিদ্ধান্ত হলো না
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৪, ২২:৪০
লাশ দাফন না দাহ করা হবে তার সুরাহা হয়নি। মৃত ব্যক্তির কথিত স্ত্রীগণ দুটি ভিন্ন ধর্মের হওয়ায় লাশের সত্কার নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এ জটিলতা। এ জটিলতা নিরসনে তারা দ্বারস্থ হয়েছিলেন আদালতের। কিন্তু কোন আইনগত সমাধান দিতে না পেরে উভয় পক্ষকে দেওয়ানী আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরু মিয়া। বৃহস্পতিবার দেয়া এ সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়, মৃত বক্তির ধর্ম নির্ণয়ের কোনো বিধান ফৌজদারি আইনে নেই। লাশটি কে পাবে এ বিষয়ে কোন শুনানি বা আদেশ দেয়ার এখতিয়ার এই আদালতের নেই। ঘটনার বিষয়টি দেওয়ানি প্রকৃতির। সে অনুযায়ী ওই আদালতই এ বিষয়টি নির্ধারণ করবে। রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত ক্যাপিটাল সুপার মার্কেটের মালিক রনজিত নন্দী ওরফে খোকন নন্দী/ রাজিব চৌধুরীকে (৭২) সত্কারের প্রশ্নে আদালত এ পরামর্শ দেয়।
এর আগে খিলগাঁওয়ের একটি বেসরকারি কলেজের শিক্ষক চন্দন কুমার চক্রবর্তীর লাশের সত্কার নিয়ে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এর সুরাহা করতে না পেরে পরে আদালত ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের লাশটি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়।
জানা যায়, গত ২৬ জুন রনজিত নন্দী বারডেম হাসপাতালে মারা যান। এরপর তার মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। লাশটি মীরা নন্দী নামের এক নারী দাবি করে বলেন যে মৃত ব্যক্তি তার স্বামী। তার নাম খোকন নন্দী। অন্যদিকে ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক হাবিবা আক্তার খানম বাবলি নিজেকে মৃতের স্ত্রী বলে দাবি করেন এবং বলেন ওই ব্যক্তির নাম রাজিব চৌধুরী।
মৃতকে কোন ধর্মমতে দাহ করা হবে এ নিয়ে দুই স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বারডেম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরুপায় হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আদালতের অনুমতিক্রমে ওই জিডির তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ ঘটনাটি তদন্ত করে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলেন, মৃত ব্যক্তি একজন মুসলমান। তারা শাহজাহানপুরে বসবাস করতেন।
এরপর রাজীব চৌধুরীর মুসলিম ধর্মগ্রহণ ও বিয়ে সংক্রান্তে সব কাগজপত্র আদালতের কাছে জমা দেন বাবলি। তিনি আদালতে বলেন, মৃত ব্যক্তির পুরো নাম খোকা চৌধুরী ওরফে রাজীব চৌধুরী। ১৯৮০ সালের ২ এপ্রিল ঢাকার প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হলফনামার মাধ্যমে তার পূর্ব পুরুষের হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। খোকন নন্দী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সমাজে রাজীব চৌধুরী নামে পরিচিত হন। ১৯৮৪ সালের ১৫ জুলাই আমাকে বিয়ে করেন। মুসলিম স্বামী-স্ত্রী হিসাবে মৃত্যুর আগে প্রায় ১৮ বছর রাজধানীর ৩৩১, উত্তর শাহজাহানপুরের বাসায় দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইসলাম ধর্মের যাবতীয় নিয়ম-কানুন পালন করে গেছেন। তিনি আমার স্বামী। তিনি হিন্দু না, মুসলমান। আদালতে দাখিলকৃত কাগজপত্রে দেখা গেছে, গত বছরের ২৩ অক্টোবর স্বামী-স্ত্রী হিসাবেই তারা ভারত ভ্রমণ করেছেন। সেখানে বাবলির স্বামীর নাম হিসাবে খোকন উল্লেখ করা হয়েছে।
মীরা নন্দী আদালতে বলেন, তার স্বামীর পুরো নাম রনজিত নন্দী ওরফে খোকন নন্দী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা একসঙ্গে মোহাম্মদপুরের ১৫ নম্বর রায়েরবাজার এলাকায় বসবাস করতেন। ১৫ জুন অসুস্থ হলে তাকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আদালতে দেয়া মীরার কাগজপত্রে দেখা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্রে মৃত ব্যক্তির নাম ‘খোকন নন্দী’ হিসাবে উল্লেখ রয়েছে। ২০১২ সালের ৬ আগস্ট একটি বায়না দলিলেও মৃত ব্যক্তি নিজে রনজিত নন্দী ওরফে খোকন নন্দী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন। বারডেম হাসপাতালে ভর্তি ও তার চিকিত্সার কাগজপত্রেও তার নাম খোকন নন্দী উল্লেখ করা হয়েছে। মীরার দাবি, তার স্বামী হিন্দু। তিনি কখনোই হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেননি বা মুসলমান হননি। বায়ান্ন বছর তার সঙ্গে সংসার করেছেন। সনাতন হিন্দু মতেই জীবনযাপন করতেন তিনি। হিন্দু মতে আমি তার লাশ সত্কার করবো।
বাবলির পক্ষে আবু বকর সিদ্দিক এবং মীরা নন্দীর পক্ষে তার আইনজীবী কিশোর কুমার বসু রায় চৌধুরী আদালতে শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত লাশ সত্কারের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে মামলার নথি জেলা জজ আদালতে প্রেরণের আদেশ দেন। এ সময় কথিত দুই স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।