এখনও এগিয়ে রড্রিগেজ

কলম্বিয়ায় তার নাম কিডো ভালদেরামা বা নতুন ভালদেরামা। কিন্তু এই বিশ্বকাপেই যে অর্জন তা দিয়ে ছাড়িয়ে গেছেন ভালদেরামার তিন বিশ্বকাপের কীর্তিকে। ভালদেরামা নিজে অবশ্য আগেই আভাস দিয়ে রেখেছিলেন, ফুটবলেরই সর্বকালের সেরা হয়ে যাওয়ার প্রতিভা ও যোগ্যতা আছে জেমস রড্রিগেজের। ভালদেরামার ভবিষদ্বাণী যে একদম কথায় কথায় মিলে যাবে সেটা আর কে জানতো? ৫ ম্যাচে ছয়টি গোল করা তো আর মুখের কথা নয়। প্রায় অসম্ভব কাজটাই করে দেখিয়েছেন জেমস রড্রিগেজ। লাতিনদের প্রিয় হামেস রড্রিগেজ। কলম্বিয়া কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়ে নিলেও তাই এখনও আলোচনায় আছেন রড্রিগেজ। ৬ টি গোল আর দুটি অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনিই যে আছেন সবচেয়ে এগিয়ে। সাথে আছেন টমাস মুলার কিংবা লিওনেল মেসির মত তারকারাও। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই একের পর এক দাপট দেখিয়েছেন জেমস রড্রিগেজ। তার চোখ ধাঁধালো পারফরম্যান্সে গ্রীস, আইভরিকোস্ট ও জাপানকে হারিয়ে ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে শেষ ষোল নিশ্চিত করে কলম্বিয়া। প্রথম রাউন্ডের তিনটি ম্যাচের প্রতিটিতেই একটি করে গোল করেছেন গতকালই ২৩-এ পা রাখা এই ফুটবলার। মারাকানায় শেষ ষোল ম্যাচে কলম্বিয়ার প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী উরুগুয়ে। এবারও জ্বলে উঠলেন মোনাকোর আক্রমণভাগের খেলোয়াড় রড্রিগেজ। তার একক নৈপুণ্যে উরুগুয়ানদের ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটের টিকিট পায় কলম্বিয়া। ফোর্তালেজায় কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলের কাছে হেরে বিশ্বকাপে যবনিকাপাত ঘটে কলম্বিয়ানদের। তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে দলের পরাজয়ের দিনও সফল ছিলেন আক্রমণভাগের রড্রিগেজ। পেনাল্টি থেকে একটি গোল করে দলের হারের ব্যবধান ২-১ এ নামিয়ে আনেন তিনি। বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচেই কমপক্ষে একটি করে গোল করা রড্রিগেজ এবারের বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট প্রত্যাশা করতেই পারেন। পাঁচ ম্যাচ থেকে ছয়টি গোলই তাকে এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সবার উপরে রেখেছে! ব্রাজিল বিশ্বকাপ নিজের জন্য এবং দলের জন্য ইতিবাচক করেই দেখছেন রড্রিগেজ, ‘এখন আমি ছুটির এই কয়েকটা দিন উপভোগ করছি। আমি মনে করি এবারের বিশ্বকাপটা আমার জন্য এবং কলম্বিয়ার জন্য ইতিবাচক হয়েছে।’ বিশ্বকাপের নৈপুণ্যে ক্লাব ফুটবলে রড্রিগেজকে নিয়ে আগ্রহও বাড়ছে। রিয়াল মাদ্রিদের মতো হ্যাভিওয়েট ক্লাবেও তাকে নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কোনো ধরনের আপত্তি ছাড়াই রিয়ালে যোগ দেয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন রড্রিগেজও, ‘চোখ বন্ধ করেই আমি রিয়ালে যোগ দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছি। কেননা এই ক্লাবটিকে আমি হূদয় দিয়ে অনুভব করি। অন্যান্য ক্লাবের প্রতিও আমার অনেক সম্মান আছে। তারপরেও রিয়াল মাদ্রিদ রিয়াল মাদ্রিদই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, করিম বেনজেমা ও গ্যারেথ বেলের সঙ্গে খেলা আমার কাছে স্বপ্নের মতো। যোগ দিতে পারলে ক্লাবটির হয়ে খেলাটা আমি উপভোগ করবো। জিনেদিন জিদান, রোনালদোর (ব্রাজিল) মতো তারকা খেলোয়াড়দের সময় থেকেই আমি এই ক্লাবটি পছন্দ করতাম।’ গোল্ডেন বুটের দৌড়ে রড্রিগেজের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানির টমাস মুলার। পাঁচ গোল নিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয়স্থানে রয়েছেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে কোনো গোল করতে পারলে গোল্ডেন বুট জয়ের সম্ভাবনা থাকবে তারই। দু’জনের গোল সংখ্যা সমান হলে সে ক্ষেত্রে দেখা হবে গোল সহায়তায় কার অবদান ছিল বেশি। তবে মুলার কোনো গোল না পেলে অনায়াসেই গোল্ডেন বুট জিতবেন রদ্রিগেজ। সোনার বুট জয়ের দৌড়ে তৃতীয়স্থানে রয়েছেন আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসিও। ছয় ম্যাচ থেকে চারটি গোল করেছেন বার্সেলোনার এ তারকা। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে দু’টি গোল করতে পারলে তার হাতেও গোল্ডেন বুট যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জেমস রডিগ্রেজের জন্ম হয় ১৯৯১ সালে, কলম্বিয়ার কুকুটা শহরে। স্থানীয় ক্লাব এনভিগাডোতে শুরু করেন ক্যারিযার। সেখান থেকে ২০০৯ সালে চলে আসেন আর্জেন্টাইন ক্লাব ব্যানফিল্ডে। এরপরই পাড়ি জমান ইউরোপে। চলে আসেন পর্তুগালের পোর্তোতে। ২০১২ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে জয় করেন পর্তুগিজ গোল্ডেন বলের খেতাব। সর্ব কনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে এমন অর্জনের পর নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ২১ বছর বয়সেই তিনটি লিগ শিরোপাও জিতে নেন। এরপর ২০১৩ সালে মোনাকোতে আসেন। এরপর সেখান থেকে বিশ্বকাপ। বাকিটা ইতিহাস! জেমস রড্রিগেজের অতিমানবীয় ফুটবল দক্ষতা বোঝানোর জন্য কেবল ছোট একটা তথ্যই যথেষ্ট। বিশ্বকাপে টানা চার ম্যাচে গোল করার রেকর্ডের মালিক এই বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ছিলেন কেবল দুই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী — রোনালদো ও রিভালদো। তালিকায় তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে যুক্ত হয়ে গেলেন জেমস রড্রিগেজ। কেবল যুক্ত হওয়াই নয়, আরও এক ধাপ উপরে উঠে গেলেন রড্রিগেজ। গোল্ডেন বুট তিনি পেয়ে গেলে নতুন আরেকটা ইতিহাসই রচিত হবে। কিংবদন্তীদের জন্ম হয়তো এভাবেই হয়!