সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ!
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৪, ১৯:৪৬
কোলাহলটা যেন হঠাত্ করে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। ফাঁকা হতে শুরু করেছে দীর্ঘ এক মাস ধরে নানা আবেগের জন্ম দেয়া শহরগুলো। বিজয় মিছিল থেমে গেলেও রংটা এখনও হারিয়ে যায়নি। কান্নার রোল বন্ধ হলেও শেষ হয়নি হতাশা। বিশ্বকাপ শেষ হলেও শেষ হয়নি এর আবহ!
সময়ের স্রোতে একটা সময় এই আবহটাও মুছে যাবে। রয়ে যাবে কেবলই স্মৃতি, কিছু অতিমানবীয় ইতিহাস, কিছু চোখ ধাঁধানো বিস্ময়। কোনটা ছেড়ে কোনটা মনে রাখবেন? রেকর্ডসংখ্যক গোল, সুয়ারেজের কামড়, রবিন ফন পার্সির সুপার ম্যান হয়ে ওঠা, জেমস রড্রিগেজের আগমন, মেসির ধারাবাহিকতা, নেইমারের কান্না, আবেগ, নাটক, উত্থান-পতন, রং বদল — সব কিছু কি এক বাক্যে বলে শেষ করা যাবে!
প্রথম দিনটার কথাই একবার ভেবে দেখুন না। ক্রয়েশিয়ার বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে থাকা দলকে টেনে তুললেন নেইমার জুনিয়র। দুই গোল করে কেবল দলের ভাগ্যই ফেরালেন না, নিজেও চলে আসলেন গোটা বিশ্বে ও গণমাধ্যমগুলোর শিরোনামে। বিশ্বকাপের শেষ প্রান্তে এসে সেই চিত্রটাই ব্রাজিলের জন্য হয়ে গেল মলিন। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে মেরুদণ্ডের ইনজুরি নিয়ে বিদায় ঘটলো সেই নেইমারের। ব্রাজিলের জন্য বিশ্বকাপে মনে রাখার মত স্মৃতি ওইটুকুই।
নিশ্চয়ই কোন ব্রাজিলিয়ানরা সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে কিংবা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডের কাছে ৩-১ ব্যবধানে হারের স্মৃতি মনে রাখতে চাইবেন না!
স্বাগতিক দলের জন্য ব্যর্থ এক মিশন হয়েছে বলে কি তাই হারিয়ে গেল বিশ্বকাপের সব রং? মোটেই না! কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, আলজেরিয়ার মত দলগুলোর জন্য বিশ্বকাপটা ছিল যেন রূপকথার এই স্বপ্ন রাজ্য। চিলি, মেক্সিকো, নাইজেরিয়ারাও খেলেছে দাপটের সাথে। আর আর্জেন্টিনা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসরা ছিল মন-মাতানো। এইসব নিয়েই এবারের বিশ্বকাপ।
বিস্ময় প্রকাশের আরও অনেক ব্যাপার আছে। গোলসংখ্যার রেকর্ডেই তো নতুন এক ইতিহাস রচনা করেছে এই বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কাফু ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, ‘ব্রাজিলে সবাইকে স্বাগতম। বিশ্বকাপে আপনাদের জন্য গোলবন্যা অপেক্ষা করছে।’
তার কথা এতোটা মোক্ষমভাবে যে মিলে যাবে সেটাই বা কয়জন অনুমান করতে পেরেছিল! ফাইনালের আগ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচসহ মোট ৬৩টি ম্যাচ মিলিয়ে গোল হল মোট ১৭০। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ৩২টি দলের বিশ্বকাপে গোলসংখ্যার দিক থেকে এই বিশ্বকাপটা তাই উপরের দিকেই থাকছে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে হয়েছিল ১৭০টি গোল।
ম্যাচ প্রতি গোলের হিসাবে অবশ্য এটা বেশ পিছিয়ে আছে। এদিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ। ফ্রান্সে সেবার মাত্র ২৬টি ম্যাচে হয়েছিল ১৪০টি গোল।
শুধু কি গোল! প্রায় প্রতিটি ম্যাচই তো হাজির হয়েছে অসম্ভব টান টান উত্তেজনার পসরা সাজিয়ে। পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে। মোট সাতটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। চারটি ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়েছে টাইব্রেকারে।
এটাও নতুন আরেকটা রেকর্ড। ৩২ দলের বিশ্বকাপে সর্বশেষ ২০০৬ সালে ছয়টি ম্যাচ গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত। তার থেকে চারটি ম্যাচ গিয়েছিল টাইব্রেকারে। সামগ্রিকভাবেও এবার যে প্রতিযোগিতা ছিল বেশি সেটা বোঝার উপায় হচ্ছে একটি ছোট্ট তথ্য— ফাইনালের আগ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৬৩ ম্যাচের ৩০টিতেই প্রথম গোল আসতে সময় লেগেছে কমপক্ষে ৭৫ মিনিট।
এর বাদে বিস্ময়কর সব ফুটবল প্রদর্শনী তো আছেই। সর্বকালের বিশ্বকাপ হতে আর কি লাগে!
গোলের বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপ দল ম্যাচ গোল ম্যাচ প্রতি গোল
১৯৩০ ১৩ ১৮ ৭০ ৩.৯
১৯৩৪ ১৬ ১৭ ৭০ ৪.১
১৯৩৮ ১৫ ১৮ ৮৪ ৪.৭
১৯৫০ ১৩ ২২ ৮৮ ৪.০
১৯৫৪ ১৬ ২৬ ১৪০ ৫.৪
১৯৫৮ ১৬ ৩৫ ১২৬ ৩.৬
১৯৬২ ১৬ ৩২ ৮৯ ২.৮
১৯৬৬ ১৬ ৩২ ৮৯ ২.৮
১৯৭০ ১৬ ৩২ ৯৫ ৩.০
১৯৭৪ ১৬ ৩৮ ৯৭ ২.৬
১৯৭৮ ১৬ ৩৮ ১০২ ২.৭
১৯৮২ ২৪ ৫২ ১৪৬ ২.৮
১৯৮৬ ২৪ ৫২ ১৩২ ২.৫
১৯৯০ ২৪ ৫২ ১১৫ ২.২
১৯৯৪ ২৪ ৫২ ১৪১ ২.৭
১৯৯৮ ৩২ ৬৪ ১৭১ ২.৭
২০০২ ৩২ ৬৪ ১৬১ ২.৫
২০০৬ ৩২ ৬৪ ১৪৭ ২.৩
২০১০ ৩২ ৬৪ ১৪৫ ২.৩
২০১৪ ৩২ ৬৩* ১৭০ ২.৭
*ফাইনালের আগ পর্যন্ত
হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
বিশ্বকাপ অতিরিক্ত সময় টাই-ব্রেকার
১৯৮৬ ৫ ৩
১৯৯০ ৮ ৪
১৯৯৪ ৪ ৩
১৯৯৮ ৪ ৩
২০০২ ৫ ২
২০০৬ ৬ ৪
২০১০ ৪ ২
২০১৪ ৭ ৪