বিএনপির নিষ্ক্রিয়তায় মহীসোপানে অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি :প্রধানমন্ত্রী
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২২:৩৬
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমুদ্রসীমা নিয়ে পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারগুলোর নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, একুশ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল সমুদ্রসীমা নিয়ে তারা কোন উদ্যোগ নেয়নি। আসলে দেশের ভালো এবং ভবিষ্যত্ নিয়ে তাদের কোন চিন্তা-ভাবনাই ছিল না। শুধু ক্ষমতা দখল এবং ভোগ এটাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে দাবি না তুললে সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশ তার অধিকার হারাতো। তিনি বলেন, বিগত বিএনপির সরকারের কারণে মহীসোপানে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তারা সময়মতো পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশ মহীসোপানে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারত, এ রায়ের সঙ্গে সঙ্গে মহীসোপানে আমাদের অধিকার সুনির্দিষ্ট হয়ে যেত।
গতকাল রবিবার সকালে সচিবালয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, সমুদ্রে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আমরা ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত কাজ অনেকটা এগিয়ে রেখে যাই। আমাদের আশা ছিল, পরবর্তীতে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা ঐ কাজ এগিয়ে নেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বিগত বিএনপি সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যেকোনো কিছুর একটা সময় থাকে। সে সময়ে তারা সঠিক পদক্ষেপ নেয়নি বলে আমরা পিছিয়ে গেছি। আসলে তাদের এ নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনাই ছিল না। আমরা আমাদের পুরো অধিকার হারাতাম যদি ১০ বছরের মধ্যে আবারো দাবিনামা পেশ করতে না পারতাম। প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রে অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার সরকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার কাজটা অত সহজ ছিল না। আমাদের অনেক কাজ করতে হয়েছে, অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে বিজয়ী হওয়া সহজ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রে অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে সমুদ্রসীমা আইন করে যান। সে সময় জাতিসংঘও এই আইন করেনি। তিনি বলেন, জাতির পিতার দূরদর্শিতার কারণেই মিয়ানমার এবং ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা মামলায় আমরা বিজয়ী হয়েছি। তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, ২১ বছর তারা ক্ষমতায় ছিল। দুই-দুইটা মিলিটারি ডিকটেটর ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু তারা কেউ এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আমরা ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আবার উদ্যোগ নিই। কেবিনেটে বিষয়টি রেটিফাই করি, জাতিসংঘে অনুস্বাক্ষরের ব্যবস্থা করি।
শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকার মহাখালী, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বরিশালে আইসিটি ভিলেজ স্থাপন করা হবে। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি আইটি ভিলেজ বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার ৪৮ মিনিটের বক্তব্যে জনগণের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের যাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা যথাযথভাবে পালন করবেন।
মহাকাশে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু কৃত্রিম উপগ্রহ’ উেক্ষপণ প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ প্রকল্পগুলো যথেষ্ট ধীরগতিতে এগুচ্ছে, ‘ডিলে’ হয়েছে। এটা দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। আগেই এ কাজটা করে ফেলা উচিত ছিল। সব ঠিক থাকলে ২০১৭ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে উেক্ষপণ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে এটি উেক্ষপণের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকার সব ধরনের বিশৃঙ্খলা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে বিএনপি মানুষ হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছিল। তারপরেও বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ সরকারেই পেরেছে ৯৬ ভাগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে, আর কেউ তা পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যখাতে তথ্য প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের অবদান স্বরূপ ২০১১ সালে বাংলাদেশ মর্যাদাপূর্ণ ‘সাউথ সাউথ এওয়ার্ড’ লাভ করে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ আইটিইউ বাংলাদেশকে ২০১৪ সালের ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি খাতের কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হিসেবে পুনর্গঠন করায় মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরো গতিশীল হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টির ফলে ২০০১ সালে মোবাইলের কলচার্জ যেখানে প্রতিমিনিট ছিল প্রায় ৯ টাকা ৬০ পয়সা, বর্তমানে তা গড়ে প্রতি মিনিট ৮৩ পয়সায় নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুততর করার জন্য বিদ্যমান সাব-মেরিন কেবলয়ের সঙ্গে আরো একটি কেবল সংযুক্ত করার জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় এর ল্যান্ডিং স্টেশনের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন করতে যাচ্ছে। তথ্য লুকানো যাবে না এবং সব তথ্য বাইরে চলে যাবে এই অজুহাতে ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার বিনা খরচে সাবমেরিন কেবল নেয়নি। পরবর্তীকালে আমাদের টাকা দিয়ে সেটা নিতে হয়েছে। সে সময় সাবমেরিন কেবল নিলে আমরা অনেক আগেই দ্বিতীয় কেবল স্থাপন করতে পারতাম। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের সকল ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু বকর সিদ্দিক, তথ্যপ্রযুক্তি সচিব নজরুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরীসহ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।