পাবনা জেলার চিত্র
অব্যবস্থাপনার আবর্তে সরকারি চিকিত্সাসেবা
আবুল খায়ের ও রুমী খোন্দকার
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৪, ২২:৪০
নানা অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং চিকিত্সক-নার্সসহ জনবল সংকটে কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে পাবনা জেলার সরকারি চিকিত্সা কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, কর্মরত চিকিত্সকদের ৯৫ ভাগই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এ কারণে রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সা পান না। জেলার ৫৪টি প্রাইভেট ক্লিনিক ও ৮০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চলে সরকারি চিকিত্সকদের নেতৃত্বে। এছাড়া হাসপাতালে সরবরাহ করা ওষুধের ৯৮ ভাগই বাইরে পাচার হয়ে যায়। রোগীদের খাবার সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় সবই বিকল হয়ে গেছে। অপারেশনও বন্ধ থাকে। ফলে রোগীদের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এতে তাদের হয়রানির স্বীকার হতে হয়। এর উপর দালালদের উত্পাত তো রয়েছেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় ২৭ লাখ মানুষের চিকিত্সা সেবার জন্য রয়েছে হাসপাতালবিহীন একটি মেডিক্যাল কলেজ, ২৫০ শয্যার একটি জেনারেল হাসপাতাল, ২০ শয্যার বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৫৯ টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ২৪১ টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ৫৮ টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এসব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অর্ধেকের বেশি চিকিত্সকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ১৯৬ জনের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৯১ জন। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না রোগীরা।
পাবনা জেনারেল হাসপাতাল: ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন দেড় থেকে ২ শ’র বেশি রোগী ভর্তি থাকে। কোন কোন দিন রোগী ৫ শত ছাড়িয়ে যায়। হাসপালে মঞ্জুরীকৃত ডাক্তারের ৫৮টি পদ থাকলেও ২২টি পদ শূন্য। গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে ডাক্তার না থাকায় ওই সকল রোগের রোগীদের চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২৮৪ টি পদ থাকলেও কর্মরত আছে ২২৫ জন। শূন্য রয়েছে ৫৯টি পদ। এ পদগুলো অচিরেই পূরণ করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. এম,এস নেওয়াজ জানান, এ হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে জেলার মানুষ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাবে জটিল রোগীদের উচ্চ চিকিত্সার জন্য ঢাকা বা রাজশাহীতে স্থানান্তর করতে হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি অনুধাবন করে হাসপাতালটি আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে তিনি জানান।
পাবনা বক্ষব্যাধি হাসপাতাল: ১৯৬৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হলেও কোন উন্নতি নেই। জুনিয়র কনসালট্যান্ট থাকলেও কোন মেডিক্যাল অফিসার নেই। ২০ বেডের এই হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি করা হয় না। যারা ভর্তি হন তারাও প্রয়োজনীয় চিকিত্সা পান না বলে জানা গেছে।
ঈশ্বরদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: দীর্ঘ তিন বছরেও ঈশ্বরদীর ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের জনবলের অনুমোদন মেলেনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে কনসালটেন্ট (বিশেষজ্ঞ ডাক্তার) ও মেডিক্যাল অফিসারসহ মোট পদ রয়েছে ২৪টি। এর মধ্যে মাত্র ১০ জন ডাক্তার রয়েছেন। ১৪টি পদের মধ্যে নার্স রয়েছেন নয়জন। ওয়ার্ড বয় চারজনের মধ্যে রয়েছেন একজন। চারজন সুইপারের মধ্যে মাত্র একজন লোক দিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হয়। এক্সরে মেশিনটি পুরানো হওয়ায় ঠিক মতো কাজ করে না। এছাড়া আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের অপারেটর নেই। নেই কোন ডেন্টাল ইউনিট ।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিন আহমেদ খান জানান, হাসপাতালের কাজের পরিমাণ বেড়ে গেলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কাজের মান ধরে রাখা যাচ্ছে না।
চাটমোহর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঃ উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তার কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, স্বেচ্ছাচারিতা, নার্সদের দুর্ব্যবহার, ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সাথে ডাক্তারের অলিখিত চুক্তি, শয্যা আর ওষুধ সংকট নিয়ে চলছে চাটমোহর উপজেলার ৫০ শয্যার এই হাসপাতাল। ৩২টি চিকিত্সকের পদের মধ্যে আছেন ১৬ জন। কাগজে-কলমে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও হাসপাতালে কোন প্রকার সুযোগ-সুবিধা, প্রয়োজনীয় ডাক্তার-কর্মচারী নেই। প্রতিদিন শত শত রোগী ওষুধ না পেয়ে ফিরে যান। এই হাসপাতালের জনৈক ডাক্তারের বিরুদ্ধে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে অলিখিত চুক্তি করার অভিযোগ রয়েছে।
ভাঙ্গুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এখানে ১৪টি পদের মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডা. শাহাদত হোসেনসহ ৫ জন মেডিক্যাল অফিসার কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে ডা. উম্মে সালমা দীর্ঘদিন মেডিক্যাল ছুটিতে রয়েছেন আর ডা. আমিনা খাতুন পাবনা শহরে থাকেন। তিনি ১৪/১৫ দিন পর পর কর্মস্থলে এসে স্বাক্ষর করে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে কোন মেডিক্যাল অফিসার কখনো যাননি। সাতজন উপ-সহকারী মেডিক্যাল অফিসারের মধ্যে ২ জন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে, বাকি ৫ জন সাব-সেন্টারে থাকার কথা। কিন্তু তারাও কখনো সাব-সেন্টারে যান না। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ‘ইওসি’ভুক্ত (জরুরি প্রসূতি সেবা কেন্দ্র) হলেও দীর্ঘদিন এখানে কোন অপারেশন হয় না। অথচ প্রতিদিনই ২/৩ জন ডেলিভারী রোগী আসে, কিন্তু তাদের ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে অপারেশন করেন এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রেরই একজন ডাক্তার!
ফরিদপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: উপজেলার ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে মাত্র ৫ জন ডাক্তার রয়েছেন। অথচ মঞ্জুরীকৃত পদ ২৭টি। একজন যোগদান করে বহু দিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন। বহির্বিভাগে বসার মত ডাক্তার নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ব্যস্ত থাকেন প্রশাসন নিয়ে, একজন আবাসিক ডাক্তার হিসেবে নিয়োজিত। ফলে মাত্র একজন ডাক্তার দিয়ে চলে বহির্বিভাগ। হাসপাতালের এম্বুলেন্সটি জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। এক্স-রে মেশিনটি প্রায় ২০ বছর যাবত্ অকেজো হয়ে আছে। স্থানীয় ডাক্তার দেওয়ান নাজমুল আলম জানান, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ডাক্তার নেই। ফলে রোগীও খুব বেশি নেই। দু-চারজন ভর্তি হলেও অন্য হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয়। একটি মহলের কাছে হাসপাতাল প্রশাসন, চিকিত্সকসহ সবাই জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
সাঁথিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এই হাসপাতালে ২২ জনের স্থলে ১১ জন ডাক্তার কর্মরত। এর মধ্যে ৪ জন বিনানুমতিতে অনুপস্থিত সাড়ে তিন বছর। ডাক্তারের অভাবে রোগীদের বিভিন্ন স্থানে ছুটতে হয়। বিনানুমতিতে অনুপস্থিত ডাক্তাররা হলেন সহকারী সার্জন নূরে আলম, সোহেলী সোবাহান, মেডিক্যাল সার্জন আসাদুজ্জামান ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) খোরশেদ আলম। এক্সরে মেশিন থাকলেও ঐ মেশিন অপারেটরের হাসপাতালের পাশে প্যাথলজি থাকায় তা রোগীদের নষ্ট দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসিজি’র একমাত্র মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। দুটি এম্বুলেন্স থাকলেও চালকের অভাবে এটি অচল রয়েছে।
বেড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এখানে ১৭ জনের স্থলে ৯ জন ডাক্তার রয়েছেন। নেই আলাদা কোন শিশু ওয়ার্ড। ৫০ সিটের এই হাসপাতালে ওয়ার্ড সংখ্যা দুটি। নবনির্মিত ভবনে শিশু ওয়ার্ড থাকলেও বিদ্যুত্ সমস্যার কারণে সেখানে এখনো শিশুদের রাখা যাচ্ছে না। ফলে রোগীদের চরম ভোগান্তির মধ্য পড়তে হয়। এ হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: মিলন জানান, চিকিত্সা ক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন এবং বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকজন চলে যাওয়ায় বর্তমানে এই চিকিত্সক সংকট দেখা দিয়েছে।
সুজানগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩১ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার পাশাপাশি প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল ভবন। এখানে ৩০টি ডাক্তারের পদ থাকলেও গত ১০ বছরেও সুজানগরবাসী তাদের মুখ দেখতে পাননি। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তাসহ মাত্র ৪ জন ডাক্তার কর্মরত রয়েছেন। গাইনি, শিশু এবং অর্থপেডিক্স বিশেষজ্ঞ নেই। আর ১৪ জন নার্সের স্থলে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৮ জন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কেবল প্যারাসিটামল ও এন্টাসিড দেয়া হয়।
আটঘরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১৪ জন চিকিত্সকের মধ্যে ৫ জন ও ১২ জন নার্সের মধ্যে ৪ জনের পদ খালি রয়েছে। এর মধ্যে গত ৪ বছর ধরে কর্মরত ৩ নার্স টানা অনুপস্থিত রয়েছেন। তারা কোথায় আছে কেউ বলতে পারেন না। অপরদিকে কর্মরত চিকিত্সকদের মধ্যেও ৩ জন পাবনা জেনারেল হাসপাতালে প্রেষণে কর্মরত। গত ২০ বছর ধরে এক্সরে মেশিন নষ্ট রয়েছে। সবমিলে হাসপাতালটি নিজেই বর্তমানে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সিভিল সার্জনের বক্তব্য: জেলার চিকিত্সা ব্যবস্থার এই বেহাল দশা সম্পর্কে জানতে চাইলে পাবনার সিভিল সার্জন ডা. তাহসিন আজিজ জানান, তিনি সুযোগ পেলেই বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। সরেজমিনে দেখেন, কোথায় কী অসুবিধা। তবে চিকিত্সক প্রয়োজনের তুলনায় কম। যারা কর্মরত আছেন, তাদের উচিত দায়বদ্ধতা, সময়ানুবর্তিতা, আন্তরিকতা, সততা নিয়ে সেবার মাধ্যমে রোগীদের সন্তুষ্ট রাখা।
এদিকে এই জেলায় অবস্থিত দেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতালটি দীর্ঘদিনেও আধুনিকায়ন হয়নি। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্য মহাপরিচালক হাসপাতালটি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া তিনি জেলায় মানসম্মত নয় এমন ক্লিনিক বন্ধ করার জন্য সিভিল সার্জনকে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।