ক্রিকেট মহারণের পর্দা উঠছে আজ

সারাবিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে আজ। চার বছর পর আবার শুরু হচ্ছে একদিনের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসর আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯। আজ বৃহস্পতিবার লন্ডনের কেনসিংটন ওভাল গ্রাউন্ডে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে দেড়মাসের এই লড়াই শুরু হবে। বাংলাদেশ ও স্বাগতিক ইংল্যান্ডসহ দশ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে ফাইনালসহ মোট ম্যাচ হবে ৪৮টি। ৯ জুলাই ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠিত হবে প্রথম সেমিফাইনাল। বার্মিংহামের এজবাস্টনে দ্বিতীয় সেমিফাইনালটি হবে ১১ জুলাই। সবশেষে ১৪ জুলাই লন্ডনের লর্ডস ময়ানে ফাইনালের মধ্যদিয়ে মুকুট উঠবে বিশ্ব ক্রিকেটের নতুন সম্রাটের মাথায়।

এবার আবার ১৯৯২ সালের মতো রাউন্ড রবিন লিগ ফরমেটে প্রতিটি দল পরস্পরের মোকাবেলা করবে। সেমিফাইনালের লড়াই হবে লিগ পর্যায়ে সেরা চার দলকে নিয়ে। খেলা হবে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ১০টি ভেনুতে। এই নিয়ে পঞ্চমবার ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর বসেছে। এর আগে ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ ও ১৯৯৯ সালে তারা যৌথভাবে এ প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। আইসিসি জানাচ্ছে, বিশ্বকাপ দেখতে এবার রেকর্ড সংখ্যক দর্শকের মধ্যে আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। ইতিমধ্যে টিকেটের জন্য আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৩০ লাখ। কোনো কোনো ম্যাচে চার লাখের কাছাকাছি আবেদন জমা পড়েছে যা আইসিসির ধারণার বাইরে ছিল। টিকেটের জন্য নারী এবং অনূর্ধ্ব ১৬ বছরের আবেদনকারীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয় বলে জানা গেছে।

বিশ্বকাপের বর্ণাঢ্য আয়োজন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসে টেলিভিশনে উপভোগ করবেন আড়াইশ কোটি মানুুষ। ক্রিকেট বিশ্বকাপ উপলক্ষে সারাবিশ্বের পর্যটকরা বেশ কিছুদিন আগে থেকেই লন্ডনে আসতে শুরু করেছেন। পর্যটকদের আনাগোনায় লন্ডন ও কার্ডিফ নগরী মুখরিত হয়ে উঠেছে। নতুন ধারার ফরম্যাটসহ নানা কারণে এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আবার কিছু ইস্যু নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ভারতের পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলার পর সেদেশের কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটার এবং দেশটির ক্রিকেট বোর্ড গ্রুপ পর্যায়ে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটি বাতিল এবং টুর্নামেন্ট থেকে পাকিস্তানকে নিষিদ্ধ করার দাবি চেয়েছিল। তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই আবেদনে সাড়া দেয়নি আইসিসি। তারা টুর্নামেন্টের সূচিতে কোনো পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারত ও পাকিস্তানের আলোচিত ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ১৬ জুন ম্যানচেস্টারে।

২০১১ ও ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ১৪টি দেশ অংশ নিলেও এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা কমিয়ে ১০টি করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ছাড়া ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইসিসির ওডিআই র্যাংকিংয়ের শীর্ষ সাতটি রয়েছে। বাদবাকি দুটি দল নির্ধারণের জন্য গতবছর বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

২০১৭ সালের জুনে আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তান একাদশ ও দ্বাদশ দেশ হিসেবে টেস্ট ক্রিকেট জগতে প্রবেশ করলেও চলতি বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ড খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে, বাছাই টুর্নামেন্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওঠার টিকেট আদায় করে নেয় আফগানিস্তান। জিম্বাবুয়ে ওই প্রতিযোগিতার আয়োজক হয়েও বাছাই পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয়। ১৯৮৩ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলছে না জিম্বাবুয়ে। অর্থাত্ এবারই প্রথমবারের মতো সবগুলো টেস্ট খেলিয়ে দেশের অংশগ্রহণ ছাড়াই ক্রিকেট বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এছাড়া এবারই প্রথমবারের মতো আইসিসির কোনো সহযোগী সদস্য দেশ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। এরকম নানা কারণে এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। 

এবারের প্রতিযোগিতার পুরস্কার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে—চ্যাম্পিয়ন ৪০ লাখ ডলার ও রানার আপ ২০ লাখ ডলার। এছাড়া সেমিফাইনালে পরাজিত দলের প্রত্যেকে ১৬ লাখ ডলার করে পাবে। লিগ পর্যায়ে বিজয়ী প্রতিটি দল পাবে ১৮ লাখ ডলার করে। যারা লিগ পর্যায় অতিক্রম করতে পারবে না তাদের প্রত্যেকের জন্য থাকবে ৬ লাখ ডলার করে। টুর্নামেন্টের মূল পর্বের আগে ২৪ মে থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ১০টি প্রস্তুতি ম্যাচ হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ম্যাচ ছিল দুটি। ২৬ মে কার্ডিফে পাকিস্তানের বিপক্ষে টাইগারের প্রথম ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। ২৮ মে একই ভেনুতে দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে ৯৫ রানে হারে বাংলাদেশ।

বিশ্বকাপে এবার কেমন খেলবে বাংলাদেশ? সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশের এবারের টিম নিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশার কমতি নেই। বলা হচ্ছে, শক্তিমত্তার বিচারে এটাই বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ টিম। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে ট্রফি জয় প্রত্যাশার মাত্রাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অধিনায়ক মাশরাফিসহ দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপে ভালো কিছু করার আশা ব্যক্ত করেছেন। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু। সেই হিসাবে বিশ্বকাপে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা পূর্ণ হলো বাংলাদেশের। প্রতিটি বিশ্বকাপেই টাইগাররা ছোটবড় কিছু অঘটন ঘটিয়েছে। প্রথম বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিল টাইগাররা। ২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে ভারত। গত দুটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল। ২০১৫  সালের পর ওডিআই ক্রিকেটে বাংলাদেশ অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত চার বছরে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান, ভারত, ইংল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ড সিরিজ হেরেছে। ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে উঠেছিল। ২০১৮ সালে এশিয়া কাপ জয়ের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ।

ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ খেলতে আসা দলগুলোর মধ্যে খেলোয়াড়রে অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে শীর্ষে থাকা ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ দলের পাঁচ ক্রিকেটার সাকিব, মাশরাফি, মুশফিক, তামিম ও মাহমুুল্লাহ রিয়াদ প্রত্যেকেই শতাধিক ওডিআই খেলে ফেলেছেন। সৌম্য সরকার, মোসাদ্দেক হোসেন, মোস্তাফিজুর, মিরাজসহ দলের প্রত্যেকেই এখন ফর্মের তুঙ্গে রয়েছেন। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ দল এবার অতীতের চেয়ে ভালো কিছু করবে, এমনটা আশা করাই যায়।