সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হলেই অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব

বাজারে প্রবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং সম্পত্তিতে সমঅধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া সামাজিক ন্যায্যতা সম্ভব নয়। একইভাবে নারীর জন্য সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত না হলে অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাও সম্ভব নয়। সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার বিষয়ে সুখবর আছে বলে জানান মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। রবিবার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নারীর জন্য অর্থনৈতিক ন্যায্যতা’ শীর্ষক গবেষণাপত্র প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এবং স্টেপস্ টুয়ার্ডস্ ডেভেলপমেন্টের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের অ্যাক্টিং ন্যাশনাল ডিরেক্টর জিনপো ওলোও-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এডভোকেট সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ, অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব খোন্দকার মোস্তান হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের গ্রুপ ডিরেক্টর স্টিফেন হালদার। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন স্টেপস্ টুয়ার্ডস্ ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার এবং সমন্বয়ক সাইফ ইকবাল। প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি আরও বলেন, নারীদেরকে আগে নারী অধিকার বুঝতে হবে। নারী অধিকার বুঝতে হলে প্রথমে নারীদের শিক্ষিত হতে হবে। তিনি বলেন, শুধু সরকার নয়, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল নারীদের জন্য অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই নারীর ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। স্পিকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, পুলিশ, প্রশাসন সব ক্ষেত্রে তার নেতৃত্বাধীন সরকার নারীকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সম্পত্তিতে নারীর অধিকার বিষয়েও তার আন্তরিকতা আছে। এজন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন। রাতারাতি কোন কিছু বদলানো সম্ভব নয়। এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন ১৮৫৭ সাল থেকে আজ অবধি সমান মজুরি ও নির্দিষ্ট সময় কাজ করার অধিকারের জন্য নারীরা আন্দোলন করে আসছেন। আজকের বাস্তবতা নারীরা কাজ করছেন, কিন্তু তাদের নিজের জীবন বেছে নেয়ার অধিকার আসেনি। অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। যতদিন পর্যন্ত রাজনীতি নারী স্বাধীনতার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করতে না পারবে, ততদিন ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে না। আয়েশা খানম বলেন, সম্পত্তিতে সমঅধিকার ব্যতীত কোথাও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। এজন্য নারীবান্ধব পরিবেশ ও রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি এক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নারী অধিকার আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি । এম এম আকাশ বলেন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য বাজারজাতকরণ, উপার্জিত অর্থব্যয়ের ক্ষমতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তাদের উত্সাহ প্রদান করা জরুরি। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতেও ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা দরকার, বিশেষ করে কৃষি এবং নির্মাণশিল্পে। সভায় বক্তারা নারীদের মজুরিবিহীন গৃহশ্রম ও কৃষিশ্রমের স্বীকৃতি দাবি এবং উচ্চশিক্ষার প্রসারের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তারা আরো সুপারিশ করেন নারীদের প্রযুক্তি, কারিগরি এবং অপ্রচলিত খাতের কর্মসংস্থানের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার। শ্রমবাজারে নারীদের অধিকারের ভিত্তিতে অংশগ্রহণের জন্য কর্মস্থলে নিরাপত্তা, পৃথক টয়লেটসহ নারীবান্ধব পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবহন সুবিধা, শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র, স্বাস্থ্য সেবা, স্বাস্থ্য বীমা ও জীবনবীমা ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। উল্লেখ্য দেশের ৬টি বিভাগের ৮টি জেলার ৮টি উপজেলায় ৮৩ জন নারী উদ্যোক্তা এবং ৬৮ জন নারী শ্রমিক ও ৫১ জন পুরুষ শ্রমিকের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে পরিচালিত এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল নারী উদ্যোক্তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনাসমূহ চিহ্নিত করা, নারীশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং আয়বৈষম্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা, সম্পত্তির উপর নারীদের অধিকার এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে জানা। গবেষণাপত্রে বলা হয়, বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের কারণে আজ নারীরা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করছেন। তবে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ও আর্থ-সামাজিক কাঠামোর কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হলে এই বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।