দূরপাল্লার বাস কাউন্টারে উপচেপড়া ভিড়

জার্মানি-আর্জেন্টিনা ফাইনাল খেলা উপভোগ করে টিকিট সংগ্রহে কল্যাণপুর বাস কাউন্টারে রওনা দেন ঢাকা কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র মহিদুল্লাহ গালিব। উদ্দেশ্য ২৭ জুলাই রাতের বাসের টিকিট। ভোররাত থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল ১০টায় পেলেন ওই কাঙ্ক্ষিত টিকিট। অপেক্ষার পর তার ভাগ্যে মিললো সাতক্ষীরাগামী ‘একে ট্রাভেলসে’র পিছনের ‘আই-টু’ সিট। গালিবের মতো হাজারো মানুষ ঈদে ঘরে ফেরার জন্য শত দুর্ভোগ উপেক্ষা করে গতকাল সোমবার বাসের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করেছেন। প্রতিবাস কাউন্টারে ছিল উপচেপড়া ভিড়। তবে অনেক কাউন্টারে টিকিটি ছাড়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে বিক্রি শেষ বলে ঘোষণা দিয়েছে। টিকিট নিতে আসা যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অগ্রিম টিকিটে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে। বাস মালিকরা যাত্রীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে রাজধানীর সব টার্মিনাল ও বাস কাউন্টার থেকে ১৪ জুলাই থেকে একযোগে টিকিট বিক্রি শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় পরিবহন মালিকরা। এর অংশ হিসাবে রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী-সায়দাবাদ টার্মিনাল ছাড়াও শ্যামলী, কল্যাণপুর, কলাবাগান, ফকিরাপুল, কমলাপুর, মালিবাগসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা দূরপাল্লার বাস কোম্পানির কাউন্টারে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। গাবতলী টার্মিনাল ও মাজার রোড থেকে বিক্রি হয় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অগ্রিম টিকিট। উত্তরবঙ্গের অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয় গাবতলী বালুর মাঠ থেকে। শ্যামলী-কল্যাণপুর থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের টিকিট বিক্রি হয়। সব কাউন্টার থেকেই দেয়া হয় ২৩ জুলাই থেকে ২৮ জুলাইয়ের অগ্রিম টিকিট। তবে মহাখালী টার্মিনালে অগ্রিম টিকিটের চাহিদা থাকলেও কোনো কাউন্টার থেকেই অগ্রিম টিকিট দেয়া হয়নি। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালেও হাতেগোনা কিছু টিকিট বিক্রি করেছে বড় বাস কোম্পানিগুলো। সরেজমিন দেখা গেছে, গতকাল ভোর থেকেই যাত্রীরা টিকিটের জন্য বিভিন্নস্থানে বাস কাউন্টারগুলোয় ভিড় করেন। গাবতলী-মাজার রোড-কল্যাণপুর বাস কাউন্টারকেন্দ্রিক ছিল যাত্রীদের সবচেয়ে ভিড়। লাইনে দাঁড়িয়ে ঈদের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। কোন কোন বাস কোম্পানি সকাল ৬টা থেকে আবার কিছু বাস কোম্পানি সকাল ৮টা থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করে। এই বিক্রি রাত পর্যন্ত চলে। গাবতলীর বালুর মাঠে অবস্থিত বগুড়া, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরসহ উত্তরবঙ্গের অগ্রিম টিকিট কাউন্টারগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। কল্যাণপুরের ঈগল, শ্যামলী, একে ট্রাভেলস, এসপি গোল্ডেন লাইনে নারী-পুরুষ সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নেন। গাবতলীতে টিকিট নিতে আসা কয়েকজন জানান, ভোররাত থেকেই অনেকে লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন। যাদের অনেকেই সকাল ৯টা পর্যন্তও টিকিট পাননি। তবে এ নিয়ে কারো মনে কোনো ক্ষোভ দেখা যায়নি। সবাই সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করেন। সৈয়দপুরের অগ্রিম টিকিট কিনতে আসা মমিনুল ইসলাম জানান, তিনি ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু সকাল ৯টা পর্যন্ত তিনি টিকিট সংগ্রহ করতে পারেননি। তার সামনে তখনো কমপক্ষে ৬০ জনের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পুরুষদের পাশাপাশি বাসের অগ্রিম টিকিটের জন্য মহিলাদেরও দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এদের অধিকাংশই সেহরি খেয়েই অগ্রিম টিকিটের জন্য লাইনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। গাবতলীর মাজার রোডের বিপরীত দিকে এস আর ট্রাভেলস’র টিকিটের জন্য ৫টার আগেই লাইনে এসে দাঁড়ান শ্যামলীর ফরিদা আক্তার। তিনি বলেন, রাজশাহীর ২৭ তারিখের অগ্রিম টিকিট নিতে এসেছেন। ভিড় বেশি হবে এই ভেবে ফজরের নামাজ শেষ করেই লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন। নাগরিকরা জানিয়েছেন, দূরপাল্লার প্রতিটি বাস কোম্পানি অগ্রিম প্রতি টিকিটে একশ থেকে দুইশো টাকা করে নিচ্ছে। আর এসি বাসে নেয়া হচ্ছে দুইশ থেকে তিনশ টাকা। টিকেট কাউন্টারে দায়িত্বপালনকারীরা জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে টিকিটের মূল্য বাড়ানো হয়নি। আগেরবার ঈদে যে দামে টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল এবারো একই দামে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতি কিলোমিটার এক টাকা ৪৫ পয়সা ধরে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৪, ২৫ ও ২৭ তারিখের অগ্রিম টিকিটের জন্য চাপ বেশি বলে জানান তারা। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেউ বর্ধিত ভাড়া নিতে পারবে না। টিকিটও কালোবাজারে বিক্রি করতে পারবে না। তবুও নিয়ম মানছে না পরিবহন কোম্পানিগুলো। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক কফিলউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ঈদ উপলক্ষে আমরা টিকিটের মূল্য বাড়াইনি। আগের ঈদে যে দামে বিক্রি করা হয়েছে এবারো একই দামে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। পরিবহন কোম্পানির নেতারা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, বরাবরের মতো অগ্রিম টিকিট বিক্রি করছে মূলত বড় ও নামীদামি পরিবহন কোম্পানিগুলো। ছোট কোম্পানি ও স্বল্প দূরত্বে চলে এমন পরিবহন কোম্পানিগুলো যাত্রার আগে টিকিট বিক্রি করবে। রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এবং কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলাবাগান, মালিবাগ, আরামবাগ, মতিঝিল ও সায়েদাবাদে বিভিন্ন কোম্পানির কাউন্টারগুলোতেই অগ্রিম টিকিট বিক্রি হচ্ছে। সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দেশের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে বাস চললেও অধিকাংশই টিকিট বিক্রি করে যাত্রার আগে আগে। তবে ওইসব টার্মিনালে বড় কোম্পানিগুলোর কিছু কাউন্টারেও অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) ঘরমুখী যাত্রীদের জন্য ২৪ জুলাই থেকে ঈদের বিশেষ বাস সেবা চালু করবে। ঈদ পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত বিআরটিসি’র‘ ঈদ সেবা সার্ভিস চালু থাকবে। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের ডিপোসহ মোট ৯০০টি বাস ঈদ স্পেশাল সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত হবে। আগামী ২০ জুলাই থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করবে তারা। ঈদে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি ২০ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২৪ জুলাই পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে আগাম টিকিট কেনা যাবে। এর মধ্যে ২০ জুলাই পাওয়া যাবে ২৪ জুলাইয়ের টিকিট, ২১ জুলাই ২৫ জুলাইয়ের, ২২ জুলাই ২৬ জুলাইয়ের, ২৩ জুলাই ২৭ জুলাইয়ের এবং ২৪ তারিখে ২৮ জুলাইয়ের টিকিট দেয়া হবে। একজন সর্বোচ্চ চারটি টিকিট কিনতে পারবেন। এছাড়া ২৭ জুলাই থেকে ফিরতি টিকিট বিক্রি হবে।