জোয়ারের পানিতে ভাসছে দক্ষিণের নগর-পল্লী
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৪, ২২:৪০
জোয়ারের পানিতে তলিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলবর্তী শহর-নগর-পল্লীর জনপদ। এসব অঞ্চলে মানুষের দুর্ভোগ-দুর্গতির একশেষ। ত্রাণ ও সহায়তার খবর নেই। দুর্গত বিশাল অঞ্চলের দুর্ভাগা মানুষের দুর্দশার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে আমাদের চলমান এই প্রতিবেদনে।
বরগুনা (উত্তর) প্রতিনিধি: মৌসুমী বৃষ্টি ও পূর্ণিমার জোয়ারে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গতকাল সোমবার বরগুনা শহর ও বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। জেলার প্রায় সবকটি উপজেলার বীজতলা ডুবে যাওয়ায় আগামী আমন ধানের আবাদে অনিশ্চিয়তার আশংকা করছেন কৃষকরা।
গতকাল বরগুনা শহররক্ষা বাঁধের স্লুইসগেট উপচে পানি ঢুকে গোলাম সরোয়ার রোড, পশু হাসপাতাল সড়ক, নজরুল ইসলাম সড়ক, বঙ্গবন্ধু সড়ক, বাজার সড়ক, শেরে বাংলা সড়কসহ সকল রাস্তাঘাট হাঁটুপানিতে ডুবে যায়। ভোগান্তিতে পড়ে রমজান উপলক্ষে কেনাকাটা করতে আশা নারী, বৃদ্ধ ও শিশুরা। পাততাড়ি গুটিয়েছে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বিটুমিন নষ্ট হয়ে রাস্তাগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এ ব্যাপারে বরগুনা সড়ক ও জনপথ, প্রকৌশল বিভাগ জানায়, বার বার পানিতে ডুবে গেলে রাস্তাগুলোর বিটুমিন নষ্ট হয়ে যায় এবং নিচের মাটি গলে বড় বড় গর্তেরসৃষ্টি হতে পারে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানিতে বরগুনা শহর প্লাবিত হলেও এর কোন প্রতিকার হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষের একই জবাব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরগুনা পৌরসভার মেয়র মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, শিগগিরই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
পানি নিষ্কাশনের খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং কোথাও কোথাও স্থায়ী বাঁধ দেয়ার ফলে আবাদযোগ্য মাঠগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ফলে আমনের বীজতলা তলিয়ে রয়েছে ২ থেকে ৩ ফুট পানির নিচে। এতে পচে নষ্ট হয়ে গেছে কচি ধানের চারা। আমন চাষ নিয়ে বিপাকে কৃষক। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, কৃষকদের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে বীজতলা তৈরি করার জন্য ইতিপূর্বে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা: মনপুরার ৪টি ইউনিয়নের ১৫ গ্রামের প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ জোয়ারের পানিতে বন্দি। ভাঙ্গা বেড়ী বাঁধ দিয়ে ঢুকে পূর্ণিমার জোয়ারে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রায় ৫ শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। প্রায় একহাজার একর জমির ফসলসহ বীজতলা নষ্ট হয়েছে বলে স্থানীয় চাষীরা জানায়। রমজানে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ চরম।
জোয়ারের প্লাবিত গ্রামগুলো ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বেশির ভাগ গ্রাম তলিয়ে আছে। ২ বছর আগে দ. সাকুচিয়া ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া বেড়ী বাঁধ মেরামত করে না দেয়ায় বিগত বছরের ন্যায় এবারো দ. সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুর, দ. চরগোয়ালিয়া, দ. সাকুচিয়া গ্রাম প্রতিদিন জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে। এছাড়া মনপুরা ইউনিয়নের আন্দিরপাড়, কুলাগাজীর তালুক, কাউয়ারটেক, ঈশ্বরগঞ্জ,সীতাকুণ্ড, উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের উত্তর সাকুচিয়া গ্রাম এবং হাজীর হাট ইউনিয়নের চরযতিন, চরজ্ঞান, চর মরিয়ম, দাসের হাট, চরফৈজু্দিন গ্রামের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে।
বিচ্ছিন্ন চর নিজাম ও কলাতরীর চরে বেড়ী বাঁধ না থাকায় ২টি চরে বসবাসকারী প্রায় ২০ সহস াধিক মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এলাকার মানুষের আহাজারি শোনার কেউ নেই। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উপজেলার মানুষের এখন রুটিন ওয়ার্ক হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের এহেন দুর্ভোগ লাগবে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা। জোয়ারের পানির তোড়ে এরই মধ্যে প্রায় ৩ শতাধিক পুকুর ও মত্স্য ঘেরের মাছ চলে গেছে। পুকুর ও মত্স্যঘেরের মাছ চলে যাওয়ায় বহু মত্স্যচাষী পথে বসেছেন। অনবরত জোয়ারের পানি ফসলি জমিতে পড়ায় জলাবদ্ধ হয়ে শতশত একর জমির বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈশরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মনপুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মনপুরা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, রামনেওয়াজ বাজারসহ স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর উপর দিয়ে প্রবলবেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। জোয়ারের পানির তীব্রতায় পাকা সড়কের অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দী মানুষ সাইক্লোন সেন্টারে ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজ জানান, ঈশ্বরগঞ্জের পূর্বপাশের ভাঙা বেড়ী বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে আমাদের বাড়ী ঘর ডুবে গেছে। পুকুরের মাছ চলে গেছে, জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে ঘরের ভিটা দেবে গেছে। আন্দীরপাড় ও কুলাগাজীর তালুক গ্রামের মোঃ অহিদ, মামুন, নোমান বলেন, জোয়ারের পানিতে আমাদের ঘরবাড়ি পানির মধ্যে ডুবে আছে। আমাদেরকে দেখার জন্য কেউ আসেনি। নতুন করে বেড়ী বাঁধ না হলে আমরা জোয়ারের পানিতে ভেসে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এধরনের অভিযোগ ভুক্তভোগী হাজারো মানুষের। পুরনো বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার এত দিন পরও নতুন বেড়ী বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এলাকাবাসী।
দ. সাকুচিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অলিউল্যাহ কাজল বলেন, ভেঙে যাওয়া বেড়ী বাঁধের কাজ দ্রুতগতিতে শেষ করেছি। কিন্তু এই জোয়ারের সে াতের তীব্রতায় নতুন নির্মিত বেড়ী বাঁধটিও পুনরায় ভেঙে গেছে। মনপুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ আলাউদ্দিন হাওলাদার বলেন, আমরা ভুক্তভোগী মানুষের খোঁজ-খবর নিচ্ছি। মনপুরা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আবুল কালাম বলেন, দ্রুতগতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাত্ করে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় কাজ বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা: পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া পৌরশহরের দক্ষিণবন্দর এলাকা প্রতিদিন খালের জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে। এতে প্রতিদিন খালের জোয়ারের পানি উপচে শহরের দক্ষিণবন্দর এলাকার পাঁচ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দুই সহস্রাধিক পরিবারে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। শহরের প্রাণকেন্দে র খালে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট ও খালের দুই পাড় অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে খাল সংকুচিত হয়ে পড়ায় স্বাভাবিক জোয়ারের পানি অপসারণ বাধাগ্রস্ত হয়ে এ প্লাবনের সৃষ্টি হয়েছে।
ভূক্তভোগীরা জানান, শহরের প্রাণ কেন্দে র খাল উপচে জোয়ারের পানি উল্লেখিত এলাকায় হুহু করে ঢুকে পড়ছে। এতে শহরের দক্ষিণবন্দর সেতু থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকার সড়কে ৩/৪ ফুট পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে উল্লেখিত এলাকার পাঁচ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতর পানি ঢুকে পড়ছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধসহ মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হচ্ছে। পানিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মজুদকৃত মালামাল বিনষ্ট হচ্ছে। এছাড়া উল্লেখিত এলাকার দুই সহস্রাধিক বাসিন্দা চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। পানি বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে দুপুরের রান্নাবান্না বন্ধ। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, দক্ষিণবন্দর খালের মোহনায় সম্প্রতি পানি উন্নয়নবোর্ড একটি অপরিকল্পিত ও অপ্রশস্ত স্লুইসগেট নির্মাণ করে। ওই স্লুইসগেটের পানি অপসারণের দরোজা অতি ছোট হওয়ায় সেখান থেকে ঠিকমত পানি অপসারিত হচ্ছে না। এছাড়া শহরের তিনদিকের খালের দুই পাড় অবৈধ দখল করে শত শত পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে খালটি সংকুচিত করে ফেলার কারণে খালের পানির প্রবাহ অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এছাড়া থানা সংলগ্ন খালের ত্রিমোহনার গুলিসাখালী খালের মোহনায় পাউবো একটি বাঁধ দেয়ায় শহরের খালের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণবন্দর শহর এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধ না থাকায় প্রতিদিন খুব সহজেই জোয়ারের পানি উল্লেখিত এলাকা ডুবিয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. ফারুক হোসেন জানান, জোয়ারের পানি শহরের রাস্তাঘাট, দোকান ও বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ায় চলতি রমজানে এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন। ব্যবসায়ীদের মালামাল পানিতে নষ্ট হচ্ছে। প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার এমন দুর্ভোগ যেন দেখার কেউ নাই। এ ব্যাপারে মঠবাড়িয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস ছালেক জোয়ারের প্লাবনে শহরের দক্ষিণবন্দর এলাকা প্লাবিত হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, শহরের ওই এলাকা অপেক্ষাকৃত নিচু। অতিজোয়ারের পানির প্লাবনে সহজেই পানি ঢুকে পড়ছে।
নলছিটি (ঝালকাঠি) সংবাদদাতা: পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরের পর থেকে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে ২/৩ ফুট জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাস্তাঘাট, ফসলের মাঠ, পানের বরজ ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। বসত ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন শহরতলী ও গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা। আকস্মিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় তলিয়ে গেছে নলছিটি শহরের মল্লিকপুর, ফেরিঘাট, শিকদারপাড়া এবং ভবানীপুরগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা। এতে কাঁচা রাস্তাঘাট তলিয়ে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নলছিটির শহরের পান চাষী নিখিল চন্দ বলেন, পানি বৃদ্ধি পেয়ে স্থায়ী হলে পানের ক্ষতি হবে। সব পান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। বৈচন্ডী গ্রামের মত্স্যজীবী আ. মন্নান বলেন, পানিতে আমার দুটি মাছের ঘের তলিয়ে গেছে।
চরফ্যাশন (ভোলা) সংবাদদাতা: চরফ্যাশনে বেড়িবাঁধ না থাকায় পূর্ণিমার জোয়ারে উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ১৫টি গ্রাম স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ মিটার উচ্চতার জোয়ারে পানিমগ্ন হয়ে পড়েছে। শনিবার দুপুরের পর থেকে এসব এলাকার চুলায় রান্নার কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে গত ৩ দিন ধরে শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে আছেন দুর্গতরা। ঘর-ভিটা ২ফুট পানির নিচে তলিয়ে থাকায় বেড়িবাঁধের গাছের ডালে ও মাচার উপর আশ্রয় নিয়েছে লোকজন। রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় অধিকাংশ এলাকার লোকজনকে কলা গাছের ভেলায় চলাচল করতে দেখা গেছে। গবাদি পশুর মড়ক শুরু হয়েছে। নলকূপ পানির নিচে থাকায় বিশুদ্ধ পানি না পাওয়ায় রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশংকা বাড়ছে। হাজারীগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান কামাল হোসেন মুজিব জানান, ঘর ভিটা পানিতে ডুবে থাকায় তার এলাকার অর্ধশতাধিক কাঁচাঘর হেলে পড়েছে। জোয়ারের পানির তোড়ে মাদ্রাজ ও আছলামপুর এলাকার মধ্যবর্তী স্লুইসগেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চর মাদ্রাজ ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান জানান, ছাগল, ভেড়াসহ গবাদিপশু মরতে শুরু করেছে। মাদ্রাজ ইউপি চেয়ারম্যান বাহাউদ্দিন জসিম সরমান অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড সঠিক সময়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলে লোকজন এই বিপর্যয়ে পড়তো না। তার এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক ঘর হেলে পড়েছে।
ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি: ভোলার দৌলতখান উপজেলার নৌপথে যাতায়াতকারী হাজার হাজার যাত্রীর দুর্ভোগ চরমে। একদিকে জোয়ারের প্লাবন ও অন্যদিকে ঢাকা বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতের মাধ্যম একমাত্র নৌপল্টুনটি জোয়ারের তোড়ে তীরে উঠে থাকায় কোন লঞ্চ ও নৌযান দৌলতখান লঞ্চঘাটে ভিড়তে পারছে না। এই লঞ্চঘাটে লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ঢাকা, মনপুরা, হাতিয়াসহ অন্যান্য জেলায় লঞ্চ ও অন্যান্য নৌযান চলাচল করে। গভীর রাতে ঢাকা থেকে হাতিয়াগামী লঞ্চ ঘাটে ভিড়তে না পারায় দূরে কর্দমাক্ত স্থানে নোঙ্গর করে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হয়। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি সংযোগ সড়কটি সংস্কারের অভাবে যাতায়াতের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পানির তীব্র স্রোতে যেকোনো মুহূর্তে ভেঙ্গে যেতে পারে। দৌলতখানের ইউএনও জানান, এই ঘাট তদারকি করার জন্য বিডব্লিউটিএ একজন নিয়মিত কর্মচারী নিয়োগ করেছেন। স্থানীয়রা জানান, তাকে চাকরিস্থলে দেখা যায় না। এতো বড় দুর্যোগের পরেও বিডব্লিউটিএ প্লটুনটি পুনঃস্থাপনের কোন ব্যবস্থা নেননি এবং নিয়োগকৃত কর্মচারীকেও দেখা যায়নি। প্রায়ই স্রোতের টানে প্লটুনটি তীরে উঠে যায়, এব্যাপারেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আসন্ন ঈদে এ রুটে হাজার হাজার যাত্রীর চাপ বাড়বে। প্লটুনটি স্থায়ী পুনঃস্থাপন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করলে তীব্র সংকট হবে ।
টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা: জোয়ারের তোড়ে কক্সবাজারের টেকনাফে শাহপরীরদ্বীপের বেড়িবাঁধ জোয়ারের তোড়ে ভেঙ্গে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কয়েকটি গ্রাম ও চিংড়ি ঘেরসহ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় অল্প বৃষ্টিতে সাগরের জোয়ারে মেরামতকরা বালুর বাঁধটি দুই মাসের মাথায় ভেঙ্গে গেল। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ মাঝরপাড়া, ডাঙ্গরপাড়া, পশ্চিম উত্তর পাড়া, মগের ডেইর, ক্যাম্প পাড়া, পশ্চিম জালিয়া পাড়া, মাঝের ডেইল, পশ্চিম পাড়া, মাঝার পাড়া, ঘোলা পাড়া, হারিয়াখালী, কচুবনিয়া, লাপার গুনা ও বিজিবির ক্যাম্প এলাকাসহ ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫০০ শতাধিক বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং ৪০ হাজার জনগোষ্ঠি আবারো আতংক হয়ে পড়েছে। সাগরের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতির আশংকা করছে স্থানীয়রা। শাহপরীরদ্বীপের নিম্ম এলাকার মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করে এই বাঁধের জন্য সরকার বার বার বরাদ্দ দিলেও ঠিকাদার, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা যোগসাজোস করে সঠিকভাবে কাজ না করে বরাদ্দকৃত টাকা ভাগবাটোয়ারা করে খেয়ে পেলে। আগামীতে সেনাবাহিনীদের মাধ্যামে বাঁধ নির্মাণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব হামিদুর রহমান জানান, পূর্ণিমার জোয়ারে আগে চেয়ে ৪-৫ ফুট পানি ভেড়ে যাওয়ায় এবং বরাদ্দকৃত টাকা ঠিকাদারেরা বেড়িবাঁধে ঠিকমত কাজ না করায় আজ সোমবার বাঁধটি ভেঙ্গে গেল। এতে শাহপরীরদ্বীপের ঘোলা পাড়া, মাঝর পাড়া ও পশ্চিম পাড়ার প্রায় ৩০০ শতাধিক পরিবার অন্যত্র সরে গেছে। পাউবোর টেকনাফ কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন জানান, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের পর থেকে উপকূলীয় এলাকায় স্বাভাবিক জোয়ারের পানি চার-পাঁচ ফুট উচ্চতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সোমবার জোয়ারের পানি বৃদ্ধি হওয়ায় বাঁধটি ভেঙ্গে যায়। ওই বাঁধের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি: পটুয়াখালী শহরসহ উপকূলীয় বিস্তীর্ন এলাকা গত তিনদিন ধরে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। শহরের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হচ্ছে জোয়ারের সে াত। পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়কেরসহ জেলার পাঁচটি ফেরিঘাট। এসময় ৬ দফা জোয়ারে নিমজ্জিত হয়েছে। পূর্ণিমার ‘জো’-এর প্রভাবে সাগর ও নদীতে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে যানবাহন চলাচলসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
জোয়ারের প্লাবন থেকে রক্ষায় পটুয়াখালী পৌরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দু’বছর আগে শহর রক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মিত হলেও তা আদৌ কোন কাজে আসছে না। গতকাল সোমবারসহ তিন দিন শহরের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হয় জোয়ারের পানি। শহরে গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট অফিস রোড, চকবাজার, কাঠপট্টি, পুরানবাজার, নতুন বাজার, কর্মকার পট্টি, সেন্টারপাড়া, মহিলা কলেজ সড়ক, জুবিলী স্কুল সড়ক, মহিলা কলেজ সড়ক, লতিফ স্কুল সড়ক, একতা সড়কসহ পৌর শহরের অনেক এলাকা তিন থেকে চার ফুট পানিতে প্লাবিত হয়। ‘জো’-এর জোয়ারে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়কের লেবুখালী, কলাপাড়া, হাজীপুর, মহিপুর ও মির্জাগঞ্জ সড়কের পায়রা নদীর ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে ডুবে যাচ্ছে। এসময় বন্ধ থাকছে ঐসকল সড়কের যানবাহন। গত তিন দিন ধরে জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে চলছে ফেরি। ফলে এসকল সড়কে চলাচলকারী যানবাহনসহ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। পটুয়াখালী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল হালিম জানান, বাঁধের আউটলেটের গেট না থাকায় জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেলেই শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিউদ্দিন জানান, ইনলেটের গেট দিয়ে পানি উঠছে বলে খবর পেয়েছি। কিভাবে পানি প্রবেশ করছে তা সনাক্ত করে ত্রুটিগুলো দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ভোলা (দক্ষিণ) প্রতিনিধি :পূর্ণিমার প্রভাবে মেঘনার অতি জোয়ারে ভোলা শহররক্ষা বাঁধ নাছির মাঝি পয়েন্টে দিয়ে ভেঙ্গে গেছে । ফলে ভোলা শহর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। ঐ স্থান থেকে থেকে ভোলা শহরের দূরত্ব দু’কিলোমিটার। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে শহরতলীর নাছির মাঝি এলাকায় বাঁধের ১০ ফুট অংশ ভেঙে পানি প্রবেশ করে। তীব্র স্রোতে প্রবেশ করা পানিতে তলিয়ে গেছে ধনিয়া ইউনিয়নের ৯টি গ্রাম। পানি বন্দী হয়ে পরেছে কয়েকশ’ পরিবার। জরুরী ভিত্তিতে বাঁধের ভাঙা অংশ মেরামত করা না হলে পানিতে ভোলা শহর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুপুরে বাঁধে ফাটল দেখা দিলে এলাকাবাসী পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানায় কিন্তু পাউবো কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় বিকেলে বাঁধ ভেঙে যায় বলে এলাকাবাসী জানায়।
ধনিয়া ইউপি চেয়ারম্যান কবির হোসেন জানান, দুপুরের দিকে বাঁধে ফাটল দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয় । কিন্তু তারা কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় বিকেলে বাঁধের বিশাল অংশ ভেঙে এলাকায় পানি প্রবেশ করে। ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হেকিম বলেন, জোয়ার কমলে বাঁধ মেরামত করা হবে। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙা বাঁধ মেরামতের দাবি এলাকাবাসীর। জেলার বেড়িবাঁধের বাইরের এলাকা অতিরিক্তি জোয়ারে ২/৩ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে।