কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

জলাবনে জীবনের উচ্ছ্বাস

একঘেয়েমি আর যান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে ঘেরা জীবন। প্রতিদিন একই রুটিন। আর সে রুটিনমাফিক প্রতিদিনের আয়োজন। ক্যাম্পাসের ইট-পাথর, আর ক্লাস-পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় জীবন থেকে সুখস্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। মন চায় একটু খোলা বাতাসে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে। দূর অজানাতে গিয়ে মুক্তবিহঙ্গের মত ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে। তাই মনের সকল আকুলতা আর একঘেয়েমি কাটানোর জন্য পরিকল্পনা নেয়া হলো সিলেটের সৌন্দর্য উপভোগ করার। যেই কথা সেই কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সকল সাংবাদিক ছুটে গেল বাংলাদেশের লন্ডন খ্যাত হযরত শাহজালাল রহঃ-এর পুণ্যভূমি সিলেটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসযোগে রাতভর নির্ঘুম ছুটে চলার পর সকাল সাতটার দিকে সিলেটে পৌঁছালো বাস। হালকা নাস্তার পর ঘন্টাখানেক বিশ্রাম। এরপর আবার ছুটে চলা দেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবন রাতারগুল জলাবনের উদ্দেশ্যে। সবার মাঝে এক অজানা আকুলতা আর কৌতূহল। কেউ বলছে বাগান দেখার কি আছে? এর আগে সুন্দরবন তো দেখেছিই। কিন্তু অনেকেই বললো দেশের একমাত্র জলাবন, না দেখলে চলবেই না। এভাবে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর আঁঁকাবাঁকা মেঠোপথ বেয়ে আমাদের গাড়ি রাতারগুলের মেইন পয়েন্টে পৌঁছালো। এরপর ভাড়া করা নৌকা নিয়ে গোয়াইন নদী দিয়ে রাতারগুলের জলাবনের উদ্দেশ্যে ছুটে চললো আমাদের বহনকারী নৌকা। আষাঢ় মাস হলেও গোয়াইন ঘাট ও গোয়াইন নদীর উপর শরতের শুভ্র মেঘ। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীতে হালকা স্রোতের স্বচ্ছ জল আর নীল আকাশে ভাসমান সাদা মেঘ আমাদের নৌকা ভ্রমণকে আরো পরিপূর্ণ করে তোলে। এমন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের হাতছানিতে সবাই গলা ছেড়ে গাইতে লাগলো ‘ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া’, ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী তোর কাছে সুধায়, বল আমারে তোর কি রে হায় কূল-কিনারা নাই?’। আরো নানা গলায় নানা সুরের গান নৌকা ভ্রমণের আনন্দকে শতগুণে বাড়িয়ে দেয়। স্যাঁতস্যেঁতে কর্দমাক্ত জলের নিচে হাঁটু ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গাছ সবার মন কাড়ে। গাছের ডালগুলো সবুজ সতেজ পাতায় ভরা। গাছে-গাছে পাতা বেশি হওয়ায় সূর্যের আলো পাতা ভেদ করে মাটিতে পৌঁছাতে পারছে না। কোথাও কোথাও একটু-আধটু আলোর ছটা, কোথাও সূর্যকিরণ হীন স্মিত আঁধার। গহীন বনে আলো-আঁধারের লুকোচুরিতে সবার মন আনন্দে মেতে উঠল। অনেকে জোরে জোরে চিত্কার করার চেষ্টা করে। কিন্তু চিত্কারের কারণে পাখি ও অন্যান্য জীবজন্তুর ডাকাডাকি থেমে যেতে পারে, তাই সবাই পিন-পতন নীরবতা নিয়ে বনের ভিতর এগিয়ে চললো। গহীন জঙ্গলে ঢোকার সাথে সাথে চোখে পড়ল সাদা বক, কানা বক, বেজি, গুইসাপ, পানকৌড়ি, ঘুঘু, চিল, শকুন, বাঁলিহাসসহ বিভিন্ন জাতের পাখি। এছাড়া বেত, কদম, হিজল, মুর্তা, করচ, বরুন, পিঠালী, অর্জুন, ছাতিয়ান, গুটিজাম ও বটগাছসহ দেখা মিললো নাম না জানা আরো হরেক রকমের গাছ ও উদ্ভিদ। বন বিভাগের তথ্য মতে এ্ই বনে ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে জানা গেলো, এই বনের মুর্তা গাছ দিয়ে শীতল পাটি তৈরি করা হয়। আর দেশজুড়ে শীতল পাটির রয়েছে আকাশ ছোঁয়া কদর। জলাবনে উদ্ভিদ আর নানা প্রজাতির পাখ-পাখালির কলকাকলিতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই আমরা সবাই।