তারাকান্দী ফ্রি প্রাইমারী স্কুলেই আমার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৪, ২০:০৩
স্কুলের প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টিতে আমাদের এ প্রয়াস
মীনা সরকার ,ছড়াকার
ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার পিছিয়ে পড়া তারাকান্দী গ্রামে আমার জন্ম। সন্ধ্যা না নামতেই ঝোপ ঝাড় জঙ্গলে শিয়াল ডাকত। গ্রামের মধ্যে সবেধন নীলমনি ছিল “তারাকান্দী ফ্রি প্রাইমারী স্কুল”। এই স্কুলেই আমার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু। আশে পাশে প্রতিবেশী ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দীক্ষায় কোনো আগ্রহ-উদ্দীপনা একেবারেই ছিলনা। আমার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক এবং গণিত বিষয়ে বিশেষ বুত্পত্তিসম্পন্ন। যুগ এবং পরিবেশ অনুযায়ী মা বাবা দুজনেই এগিয়ে ছিলেন শিক্ষায়। যতদূর জেনেছি অগ্রজ অর্থাত্ বড়দের হাত ধরে ছোটরা কে কবে স্কুলের গন্ডিতে প্রবেশ করেছে সে হিসেব পরিবারের কেউ বলতে পারে না। বলতে গেলে আমার প্রাথমিক পাঠ শুরু হয়েছিল আমার মা’র কাছে। আমার অ, আ, পড়তে একদম ভালো লাগতোনা। বড়রা যা পড়তো তাই আওড়াতাম, এ নিয়ে মায়ের হাতের মারও জুটেছে অনেক।
তারাকান্দী ফ্রি প্রাইমারী স্কুলটি ছিল দুচালা একটি টিনের ঘর। সামনে একটি মাঠ। মাঠের আর একপাশে ডিস্ট্রিক্ট রোডের রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে ছিল পানক্ষেত, ঝোপ ঝাড়, গাছপালা বেষ্টিত। এ স্কুলে তিনজন শিক্ষক ছিলেন। একজন প্রধান শিক্ষক তাঁর নাম ছিল দূর্গাচরণ, অন্য দুজনের মধ্যে একজন জনাব মোছলেম উদ্দীন, অন্যজন জনাব ঈমান আলী।
প্রতিদিন কলাপাতায় বাঁশের কলম ও কালি দিয়ে বাড়ীর কাজ হিসাবে অ আ ক খ, এ বি সি ডি, ১ ২-এগুলো লিখতে হতো। স্কুলে সকলে মিলে একযোগে নামতা পড়ার রেওয়াজ ছিল। মাটির শ্লেটে মাটির তৈরী পেন্সিল, চক দিয়ে লিখতাম। আমাদের বাড়ীতে অবশ্য মায়ের পাঠশালা ছিল নিয়মিত। সংসারের বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি প্রতিবেশী অন্যান্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এই পাঠশালা। আমার মাকে প্রবেশিকা পরীক্ষার দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে লেখাপড়ায় ইতি টানতে হয়েছিল যা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে অপ্রাপ্তির। মা আমাদের জীবনের সফলতাকে বুকে জড়িয়ে ভুলতে চেষ্টা করতেন তার জীবনের সবচেয়ে অপ্রাপ্তির কথাগুলো। লেখাপড়ার ব্যাপারে তাঁর ছিল কঠোর নিয়ম। শিক্ষার উপকরণ অর্থাত্ শ্লেট, পেন্সিল,খাতা,কালি এগুলো আমাদের ঘরে সংগৃহীত থাকতো।
আমাদের স্কুলে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল না। পারিবারিক কাজ কর্মের কারণে সহপাঠীদের নিয়মিত স্কুলে আসা হতো না। পঞ্চম শ্রেণিতে এসে প্রথম শ্রেণির সহপাঠীদের মাত্র কয়েকজনকে পেয়েছিলাম। সকলেই একে একে ঝড়ে গিয়েছিল। সহপাঠী বিজয়া ছিল বেশ অর্থবিত্ত সম্পন্ন ঘরের মেয়ে। কিন্তু তাকে প্রাইমারী সু্কলের গন্ডি পেরুবার পূর্বেই মহাধূমধামে বিয়ে দেয়া হয়। আর একজন সহপাঠীর নাম ছিল বিহারী। সে তার পারিবারিক ব্যবসায়ই নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিল। আর একজনের নাম মনে পড়ে অনিল। সে স্কুলে পড়া অবস্থায়েই পারিবারিক ব্যবসা পান চাষ কাজে বেশি সম্পৃক্ত থাকতো। তাই কোনদিন তার পড়া শেখা হতোনা। মাঝে মধ্যে সে অন্যদের থেকে শুনেশুনে ভুল ভাল কিছু বলতে চেষ্টা করতো। তাকে নিয়ে খুব মজা হতো।
অনেক চড়াই উত্রাই পেড়িয়ে কর্ম থেকে অবসর নিয়ে বছর দুই- এক আগে বেড়াতে গিয়েছিলাম এই স্কুলে। তখন জানতে পারি আমার বাবার উদ্যোগেই এ স্কুলের ভিত গড়ে উঠেছিল এবং স্কুল স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমিটুকু আমাদের পরিবার থেকেই দেয়া। আমার বাবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। এখন সময় এসেছে স্কুলের প্রতি গভীর মমত্ববোধ জাগ্রত করা। আধুনিক চিন্তাশীল জাতি গঠনে শিক্ষার কোনই বিকল্প নাই আর সে শিক্ষা যেখান থেকে গ্রহণ করবে শিক্ষার্থীরা তার যত্ন ও লালন করা সবার ব্রত হওয়া উচিত। তবেই বাংলাদেশ এগুবে।