ভরা বর্ষায় সুন্দরী চলনবিল

চলনবিল হতে পারে বর্ষাকালীন পর্যটন কেন্দ্র। ভ্রমণের উপযুক্ত সময় জুলাই থেকে অক্টোবর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিলের নাম চলনবিল। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলা জুড়ে এর বিস্তৃতি। শুকনা মৌসুমে বিলে পানি একেবারে কমে যায়। তখন চাষাবাদ চলে বিলের জমিনে। তবে বর্ষায় বিল পানিতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে রূপের পসরা সাজিয়ে বসে। আর সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে ঘুরে আসতে পারেন চলনবিল। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলনবিল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। চলনবিল হতে পারে দেশের বর্ষাকালীন পর্যটন কেন্দ্র। ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার গতিপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, সে সময়েই চলনবিলের সৃষ্টি। গঠিত হওয়ার সময় চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এর আয়তন অনেক কমে এসেছে। আসলে চলনবিল অনেকগুলো ছোট ছোট বিলের সমষ্টি। বর্ষায় এই বিলগুলোতে জলপ্রবাহ বেড়ে গিয়ে একসঙ্গে বিশাল এক বিলের সৃষ্টি হয়। সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া এবং নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিংড়া উপজেলা জুড়ে এ বিলের বিস্তৃতি। বিলের সবচেয়ে বড় অংশটি নাটোরের গুরুদাসপুর থেকে গুমনী পাড়ের কচিকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত- প্রায় চব্বিশ কিলোমিটার দীর্ঘ। নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়ার পূর্বপ্রান্ত থেকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার ভদাই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত বিলের পূর্ব সীমানা। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে বনপাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ সড়ক তৈরি হয়েছে চলনবিলের বুকেই। সড়কের দুপাশে এখন যেদিকে চোখ যায় শুধু অথৈ জলরাশি। এ পথে যেতে যেতে দুচোখ ভরে উপভোগ করতে পারবেন চলনবিলের সৌন্দর্য। চলনবিলের আকর্ষণীয় একটি বিল ‘হাইতি বিল’ নলডাঙ্গা উপজেলায় অবস্থিত। পাবনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে এ বিলের অবস্থান। হাইতিকে দেশের সবচেয়ে গভীর বিল বলা হয়। প্রায় ১২ মিটার গভীর এই বিলে সারা বছরই পানি থাকে। বর্ষায় পানির পরিমাণ বেড়ে যায় অনেক বেশি। নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত চলনবিল এখন বর্ষার পানিতে সয়লাব। মাছধরা শুরু হয়ে গেছে। বিলের হাটগুলোতে চলছে নৌকা বেচাকেনার হিড়িক। বর্ষাকাল এলেই কেবল নৌকা বানানোর কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়ে। তারপর বছরের বাকি সময় অবসর। বানের জল তাদের জীবনে এনে দেয় চঞ্চলতা। বিলের জনপদে এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে বর্ষায় বিলের অধিকাংশ মানুষের প্রিয় বাহন এখনো নৌকা। হাটবাজার করা, আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যাওয়ার জন্য নৌকাই মূল ভরসা। আর মাছধরার জন্য ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকাই মত্স্যজীবীদের একমাত্র মাধ্যম। তাই বিলপাড়ের জনপদে নৌকা তৈরি ও বেচাকেনা চলছে এখন পুরোদমে। নৌকার হাট বসেছে তাড়াশের নওগাঁ ও চাটমোহরের মির্জাপুরে। চলনবিল এখন অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় চলনবিল থেকে চাটমোহর উপজেলা সদরে যেতে লাগতো পুরো ৬ ঘন্টা। বর্ষায় লাগতো আরও বেশি সময়। বেশ কিছুদিন হলো চলনবিলের বুক চিরে নির্মিত হয়েছে বনপাড়া-হাটিকুমরুল বঙ্গবন্ধু সেতু সংযোগ সড়ক। এই সড়কটি চলনবিলের মানুষের জীবনে গতি এনে দিয়েছে। চাটমোহর, তাড়াশ, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, উল্লাপাড়া ও রায়গঞ্জ উপজেলার মাঝ দিয়ে সোজাসুজি চলে গেছে সড়কটি। এক সময়ের দুর্গম তাড়াশ এই সড়কের কারণে বর্তমানে উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখন ঢাকাসহ দেশের সব এলাকা থেকে চলনবিলের মাছ কিনতে ব্যাপারিরা এসে হাজির হয়। ট্রাক ভরে মাছ নিয়ে যায়। বর্ষাকালে প্রতিদিন এখানে কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়। সারাদিন চলনবিলের জনপদে ঘুরে বেড়ালেও ভ্রমণপিপাসুদের তৃষ্ণা মিটবে না। এখানে এলে শুধু বিল নয়, মোঘল আমলের অনেক স্থাপত্য, যাদুঘর, বেহুলার কূপসহ অনেক কিছুই দেখা যাবে। নাটোরের চলনবিলে যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা: ঢাকার গাবতলী থেকে বাসে নাটোর যাওয়া যায়। এছাড়া রাজশাহীগামী যে কোনো বাসেই নাটোর আসা সম্ভব। ভাড়া ৪শ’ টাকা থেকে ৭শ’ টাকা। নাটোরের চলনবিল দেখতে গেলে থাকতে হবে নাটোর জেলা সদরে। শহরে থাকার জন্য আছে চকরামপুরে হোটেল ও ভিআইপি হোটেল এবং মাদ্রাসা রোডের হোটেল উত্তরা ও হোটেল মিল্লাত। প্রতিদিনের ভাড়া ২শ’ টাকা থেকে ৬শ’ টাকা। সিরাজগঞ্জের চলনবিলে যাওয়া ও থাকা: ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ আসা যায় সড়ক ও রেলপথে। ঢাকার মহাখালী থেকে বিভিন্ন কোম্পানির বাস যায় সিরাজগঞ্জে। ভাড়া ৩শ’ টাকা থেকে ৪শ’ টাকা। সিরাজগঞ্জ থেকে রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলায় আসা যাবে লোকাল বাসে। সিরাজগঞ্জ শহরে থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল হলো- আল হামরা, মাদারক্স। দৈনিক ভাড়া ৩৫০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা। সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল গোলচত্বর এলাকায় ভাল আবাসিক হোটেল হচ্ছে খাঁন আবাসিক, আল-আমিন ও সিদ্দিকিয়া। ভাড়া ২শ’ টাকা ৫শ’ টাকা । নিজস্ব বাহনে গেলে দিনে দিনেই ঢাকা থেকে গিয়ে ঘুরে আসা যায়। পাবনার চলনবিলে যাওয়া ও থাকা: পাবনা জেলা সদর থেকে বাসে চাটমোহর এসে সেখান থেকে রিকশায় আসা যায় চলনবিলে। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি পাবনা যেতে ভাড়া পড়বে ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। পাবনা শহরে থাকার জন্য হোটেলগুলো হলো- জালালপুরে রত্নদ্বীপ রিসোর্ট, হোটেল পার্ক, হোটেল শিল্টন ইত্যাদি। দৈনিক ভাড়া ৫শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা। বিলে ভ্রমণের জন্য নৌকা: চলনবিলে বেড়ানোর জন্য স্থানীয় নৌকা পাওয়া যাবে ভাড়ায়। সারাদিনের জন্য ভালো মানের একটি নৌকার ভাড়া পড়বে ৬শ’ টাকা থেকে ৮শ’ টাকা। এছাড়া ইঞ্জিন নৌকা মিলবে ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকায়। সাঁতার না জানলে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নেবেন। চলনবিল জাদুঘর: দেখে আসতে চলনবিল জাদুঘরটিও। গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর গ্রামে এ জাদুঘর। স্থানীয় শিক্ষক আব্দুল হামিদ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় নিজ বাড়িতে ১৯৭৮ সালে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এ সংগ্রহশালা।