স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানায় সাদামাটা ইফতার

কাজলের বয়স সাত কি আট। পড়ে প্রথম শ্রেণীতে। প্রতিদিনই সে রোজা রাখছে। তবে প্রথম রোজা থেকে পনের রোজা পর্যন্ত একই ইফতার। সাদামাটা ইফতার দিয়ে রোজা খুলতে হয় তার। একই ইফতারে একঘেঁয়েমি লাগলেও কাউকে বলতে পারে না সে। কাজলের মতো সাত বছর বয়সী আলমগীর, ১ম শ্রেণীতে পড়ুয়া কবিতা, ২য় শ্রেণীর ছাত্রী মিতুরাও একই ইফতারে প্রতিদিন রোজা খোলে। তাদের প্রথম রোজা কিংবা ইফতারকে ঘিরে কারো কোন আগ্রহ নেই। কারণ তারা সবাই এতিম। তারা ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার বাসিন্দা। তাদের ইফতারের কথা শুনে যে কারো মনে হতে পারে- এতিমদের এতিম ইফতার। ছয়/সাত বছরের শিশুরা যখন প্রথম রোজা রাখে তাদের ঘিরে পরিবারের অন্য রকম একটা প্রস্তুতি থাকে। যা থাকে না এতিমখানার এতিমদের জন্য। ঘড়িতে তখন ছয়টা। ইতিমধ্যে দশ/বারো জন শিশু-কিশোর তাদের ঘরের মেজেতে পাটি বিছিয়ে ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনী, শসা, খেজুরের সাথে আছে মালটা। তারা জানায়, ডাইনিং থেকে তাদের সবার হাতে ইফতারের প্যাকেট দেয়া হয়। এক এক ঘরে দশ থেকে পনের জনের বাস। তারা সবাই নিজেদের ইফতার মিশিয়ে খায়। এক ঘরে গিয়ে দেখা যায়- সপ্তম শ্রেণীর আলমগীর জ্বরের মধ্যেও রোজা রেখে শুয়ে আছে। অসুস্থ হয়েও কেন রোজা রাখল- এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলে, সবগুলো রোজা রেখে একটা ভাঙ্গতে মায়া লাগে। তাদের কারো জ্বর হলে রুমের অন্যরা মাথায় পানি দেয়াসহ প্রয়োজনীয় সেবা শুশ্রূষা করে। যদিও আলমগীরের মাথায় পানি দেয়া হয়নি। দেখানো হয়নি ডাক্তার। এ ব্যাপারে এতিমখানার আবাসিক শিক্ষক মো. মাহমুদুল এহসান জানান, এতিমখানার শিক্ষার্থীদের রোগ হলে চিকিত্সার দায়িত্ব তাদের। আলমগীরের জ্বরের কথা তার জানা ছিল না। এতিমখানা ঘুরে দুই/এক ঘরে ঠাণ্ডা পানি থাকলেও বাকি ঘরগুলোতে সাধারণ পানিতেই ইফতার করতে দেখা যায়। শরবতের স্বাদ পায় নিতান্তই বড় দুই/চার জন এতিম। তারা নিজের টাকায় (শিক্ষকতা করে আয় করে) লেবু চিনি কিনে শরবত তৈরি করেন। নিজেদের রুমের ছোটদেরও দেন। মাহমুদুল এহসান জানান, এই প্রতিষ্ঠানে বাইশ বছরের কর্মজীবনে তিনি অনেক নিয়ম-নীতি দেখলেও আজ আর তার অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে এতিমখানায় ২৩০ জন এতিম আছে। যার মধ্যে ৯৭ জন মেয়ে। এতিমখানায় অধিভুক্ত হতে হলে অবশ্যই বাবা মৃত হতে হয়। এবং একজন অভিভাবক কর্তৃক আবেদন করতে হয়। ১৮ বছর অর্থাত্ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ পর্যন্ত একজন এতিমের দায়িত্ব নেয় এই এতিমখানা। তিনি আরো জানান, বিশেষ আবেদনের প্রেক্ষিতে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশুনা করে তাদের কিছু সদস্য। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সহূদয়বান এক ব্যক্তি এতিমদের জন্য ইফতার পাঠান। তিনি এতিমদের জন্য ঈদের খাবারও পাঠান। তবে কখনো তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করেন না। এর বাইরে প্রায়ই নতুন-পুরাতন ডোনাররা তাদের ইফতারসহ বিভিন্ন রকম খাবার পাঠান। এতিমখানা চলে নিজস্ব দোকান ও বাড়িভাড়ার টাকায়। ঢাকা জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৭ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই এতিমখানার আয় ভাল হলেও সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ হচ্ছে না বলে মনে করেন এহসান। ফলে দিনের পর দিন বাড়ছে অব্যবস্থাপনা। জানা যায়, ১৯০৯ সালে নবাব সলিমুল্লাহ ‘ইসলামিয়া এতিমখানা’ নামে এ অনাথ আশ্রমের সূচনা করেন। ১৯১৫ সালে নবাবের মৃত্যু হলে ঢাকাবাসীর প্রচেষ্টায় তা রক্ষা পায়। ১৯১৬ সালে এতিমখানাটি আজিমপুরের বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করার সময় নাম পরির্বতন করে প্রতিষ্ঠাতার নামে স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানা নামকরণ করা হয়। এতিমদের খাবারের দায়িত্ব বাবুর্চি জুয়েলের। জুয়েল বলেন, সোমবারের সেহেরিতে তাদের আম-দুধ দেয়া হয়। তবে এতিমদের দাবি- তারা আম-দুধ পায়নি। সপ্তাহে তিনদিন মাংস, দুই দিন মাছ, দুই দিন সবজি আর ডিম, ভাত-ডাল দেয়ার কথা থাকলেও এতিমরা অভিযোগ করে, এমন নিয়মে তারা খাদ্য পায় না।