সুন্দরবন অঞ্চলে এ বছর ৪০ কোটি গাছ লাগানো হবে
নাসিম আলী, ফজলুর রহমান ও আহাদুল ইসলাম শিমুল, ভান্ডারিয়া ও জিয়ানগর (পিরোজপুর) থেকে
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৪, ২২:৪৩
জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে এ বছর সুন্দরবন এলাকায় ৪০ কোটি গাছ লাগানো হবে। আমাদের সীমিত সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে জনগণের চাহিদা পূরণে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সকল স্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আত্মসাত্ করার প্রবণতা থাকার কথা নয়। তারপরও কোথাও এর ব্যতিক্রম ঘটলে তা প্রতিহত করে মানুষের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে আমরা সর্বদা সচেষ্ট। তিনি গতকাল বুধবার পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া ও জিয়ানগরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় প্রাপ্তসম্পদ অত্যন্ত নগণ্য। তারপরও যা পাওয়া যায় বা সরকারি বরাদ্দ আসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। যাদের উদ্দেশ্যে বা যাদের জন্য বরাদ্দ আসে তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে এ কাজ করা বাঞ্ছনীয়।
বিকালে জিয়ানগর উপজেলা পরিষদে উপজেলার চেয়ারম্যান, ইউএনও, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব আছে। এ দূরত্বের কারণে বা সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তঃসম্পর্কের অভাবে কোন পরিষদই সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও অবহিতকরণ দরকার। সরকারি বরাদ্দ ও কাজের ক্ষেত্র ব্যাপক। অনেক সময় এর পরিধি আমাদের জানাও থাকে না। তা জানা থাকলে সুবিধা হয়।
মন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নকারীদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে হবে। প্রকল্প বা কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না করে সম্পূর্ণ বা আংশিক অপচয় আত্মসাত্ করলে তার পরিণাম ভয়াবহ হতে বাধ্য। মনে রাখতে হবে, সরকার একটি বিপজ্জনক যন্ত্র। জনপ্রতিনিধিরা সরকারি সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে পরবর্তিকালে তা সামাল দিতে নিজের সহায়-সম্বল খোয়াতে হয়। বর্তমানে জিয়ানগরসহ দক্ষিণের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার। তাদের পুনর্বাসনসহ আগামীতে সরকারের বিভিন্ন ত্রাণ কর্মসূচির আওতায় অনেক সাহায্য আসবে, প্রকল্প নেয়া হবে। এসব প্রকল্প স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে বাস্তবায়ন করার প্রতি কঠোর অবস্থান নেয়ার ক্ষেত্রে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অতীতে যেখানেই যা অনভিপ্রেত কিছু ঘটে থাকলেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটার সুযোগ নেই। জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিদ্ধার্থ শংকর কুন্ডুর সভাপতিত্বে এ মতবিনিময় সভায় ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান ফায়জুল কবির তালুকদার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সাহিদা বেগমসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিভিন্ন মসজিদের অনুদান, অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক ঋণসহ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপকারভোগীদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ করেন। বিকালে মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জিয়ানগর উপজেলা পরিষদ মাঠে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বৃক্ষমেলার উদ্বোধন করেন। জিয়ানগর উপজেলার চার ইউনিয়নে পরিবেশ ও বন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুঃস্থদের মাঝে সরকারি ভিজিএফ কর্মসূচির চাল ও দুঃস্থ কল্যাণ সংস্থার শাড়ী-লুঙ্গী বিতরণ করা হয়। দুপুরে পাড়েরহাট ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ শাহআলম হাওলাদার, বিকালে বালিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মঞ্জু ও সেতারা স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পত্তাশী ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুল কবির তালুকদার স্বপন এ ত্রাণ বিতরণ করেন।
জিয়ানগর উপজেলা পরিষদে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু উপজেলা জেপি ও অঙ্গ সংগঠন আয়োজিত ইফতার মাহফিলে শরিক হন। ইফতার মাহফিলে কেন্দ্রীয় জেপি’র ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন রেনু, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ, উপজেলা সভাপতি এডভোকেট মতিউর রহমান, সম্পাদক মনিরুজ্জামান, জেপি’র কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক সালাম বাহাদুর, সাংস্কৃতিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির রাজু, উপজেলা আহ্বায়ক আসাদুল কবির স্বপন, সদস্য সচিব মশিউর রহমান মঞ্জু, যুগ্ম আহ্বায়ক রুহুল আমীন, কাওসার আহম্মদ দুলাল, শহীদুল ইসলাম দোদুল, সহ-সদস্য সচিব হারুন অর রশীদ পান্না এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা বৃন্দসহ নির্বাচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অংশ নেন।
সকালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভান্ডারিয়া উপজেলা অডিটরিয়ামে বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ডভিশন বাংলাদেশ ভান্ডারিয়া শাখার সহযোগিতায় শিশু ফোরাম এর আয়োজনে এমডিজি ২০১৫ পরবর্তী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণের সাথে শিশুদের অবস্থান বিষয়ে শিশুদের নীতি-নির্ধারকগণের সাথে শিশুদের সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ২০১৫ সালকে আমরা দেশে একটি চ্যালেঞ্জের সময় হিসাবে গ্রহণ করছি। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দারিদ্র্য বিমোচনসহ অন্যান্য কাজ সমাধা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এ বিরাট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, যার যতটুকু ক্ষমতা আছে তা দিয়ে এ কাজ করতে হবে। শুধু এমডিজিই অবদান রাখছে তা নয়। তিনি বলেন, আমরা বড় হতে চাচ্ছি, চ্যালেঞ্জ একটি গোষ্ঠী বা একজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। দারিদ্র্য বিমোচনে নিজেদের লুক্কায়িত চেতনায় নিজেদেরই উদ্যোগে শক্তিশালী হতে হবে। নিজেদের মেধা ও সুপ্ত চেতনাকে শক্তিশালী করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, সরকার প্রধান অত্যন্ত পরিশ্রম করছেন। বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য কাজ করে আসছেন, তার কোন অবকাশ নেই। অনুষ্ঠানে শিশু ফোরামের নেতা উম্মে আফসা দিনার সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন, পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকী, পুলিশ সুপার এস এম আক্তারুজ্জামান, শিশু ফোরামের আহম্মদ উল্লাহ। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোঃ রাফি মাহামুদ ও শিতুল মুনা। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জ্বল, ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশিদ, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা আক্তার, ওসি মতিউর রহমান, ভান্ডারিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ভিটাবাড়ীয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু, আওয়ামী লীগ নেতা হাফিজুর রশিদ তারেক, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় অ্যাডভোকেসী ম্যানেজার সাবিরা নুপুর, বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক অসিম চ্যাটার্জী, ভান্ডারিয়া এডিপি ম্যানেজার প্রশান্ত নাফাক ও কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন। পরে প্রধান অতিথি শিশুদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করেন।
এর পর উপজেলা প্রশাসন, বনবিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ভান্ডারিয়া উপজেলা ভূমি অফিস চত্বরে ৩ দিনব্যাপী বৃক্ষ মেলার উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এসময় তিনি বলেন, গাছ দারিদ্র্য বিমোচনের সহায়ক। পৃথিবীর আবহাওয়া পরিবর্তন হচ্ছে। সমুদ্রে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের ফল-ফলাদির গাছ লাগাতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ব্যক্তি উদ্যোগে নার্সারী হলে তাদের আমরা উত্সাহিত করব। আমাদের বাঁচার মত বাঁচতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষরা গাছ লাগাতেন সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনীর জন্য। আর এখন মানুষ গাছ লাগায় নিজে ফল ভোগ করার জন্য। তাই ৫/৬ বছরের চারা লাগালে যথা সময়ে তার ফল পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক বন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে এ বছর সুন্দরবন এলাকায় ৪০ কোটি গাছ লাগানো হবে। এছাড়াও গাছ লাগানোর জন্য বন বিভাগ হতে প্রতিটি জেলায় কিছু অর্থ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হবে। ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশিদ-এর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন পিরোজপুর জেলা প্রশাসক একেএম শামিমুল হক ছিদ্দিকী, পুলিশ সুপার এসএম আক্তারুজ্জামান, ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম, জেপি নেতা ভান্ডারিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক আবুবক্কর সিদ্দিক মন্টু হাওলাদার, উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ নজরুল ইসলাম, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ জহিরুল আলম প্রমুখ। পরে স্কুল শিক্ষার্থীদের মাঝে গাছের চারা, কৃষকদের মাঝে পাওয়ার টিলার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অনুদানের চেক, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুদানের চেক বিতরণ করা হয়। সকালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভান্ডারিয়া বাজার সংলগ্ন ভূবনেশ্বর নদীর উপর এলজিইডির ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭.৩২ মিটার প্রস্থ ২ কোটি ৪৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ব্রিজের উদ্বোধন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুর জেলা প্রশাসক একেএম শামিমুল হক ছিদ্দিকী, পুলিশ সুপার এসএম আক্তারুজ্জামান, পিরোজপুর এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম, জাতীয় পার্টি’র (জেপি) উপজেলা আহবায়ক ভান্ডারিয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মনিরুল হক জোমাদ্দার, ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম, জেপি নেতা ভান্ডারিয়া সদর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার, ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, ভিটাবাড়ীয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, গৌরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপু, উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল মন্নান।