কবিতা ও কবিতাভাবনা

কবিতা চিরকালীন রহস্যময়তা নিয়ে বেঁচে আছে

কবিতার সর্বজনগ্রাহ্য কোনো সংজ্ঞা নেই। কোন রচনাটি কবিতা, আর কোনটি কবিতা না, তা শনাক্ত করার কোনো উপায় বা পদ্ধতি আজও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে কবিতা যে সাহিত্যের অন্যান্য শাখা থেকে কোনো কোনো বৈশিষ্ট্যের কারণে আলাদা, সেটি মানতেই হয়। ভালো কবিতার মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন উত্সাহী সংশ্লিষ্টরা। তারা বলতে চেয়েছেন, ভালো কবিতার মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। প্রথমেই আসে ছন্দের কথা। উপমা, উেপ্রক্ষা অনুপ্রাস ইত্যাদিকে কবিতার বৈশিষ্ট্যভুক্ত করা হয়েছে। ছন্দ একটি গদ্য রচনা থেকে কবিতাকে আলাদা হতে সহযোগিতা করে। তবে ছন্দই কবিতা নয়। ছন্দ বিশারদদের নির্দেশিত বিষয়গুলো যুক্ত হলেই একটি রচনা কবিতা হয়ে ওঠে? মোটেও না। অনেক ছান্দসিক, যাদের রচনা ছন্দোবদ্ধ হয়েও ভালো কবিতা হয়ে ওঠেনি। আমরা জানি বাংলা অক্ষরবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি অক্ষরকেই এক মাত্রা ধরা হয়। এই মৌলিক হিসাব কষে কেউ একটি রচনা দাঁড় করাতে পারবেন। তা হলে সেটি কি কবিতা হয়ে উঠবে? মাত্রা গোনাগুনতিতে একটি রচনা কবিতা হবে না, এর মধ্যে কবিতার প্রাণটি থাকতে হবে। সেই প্রাণ কোথা থেকে বা কীভাবে আসবে? এর জবাব খুঁজতে খুঁজতেই বেড়ে যাচ্ছে কবিতার ইতিহাসের বয়স। সময়, পরিস্থিতি, এমনকি রাজনীতিও কবিতাকে বদলে দেয়। কবিতা নানা রকমের হয়। তবে একটি কথা স্বীকার করতে হবে, কবিতার মধ্যে ছন্দের উপস্থিতি জরুরি। অন্তর্প্রবহমানতার মধ্যেই থাকতে পারে ছন্দস্রোত। কবি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকের থাকে। কিন্তু এই স্বপ্নকে গ্রাহ্যমান করার জন্য যে তপস্যার প্রয়োজন, সেই বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। কবি হওয়ার সহজ প্রত্যাশার সঙ্গে যে কঠিন প্রস্তুতির সংযোগ ঘটানো জরুরি। কবিতা লেখার তৃষ্ণা ফুরাবার নয়। কবিকে অপেক্ষা করতে হয়, সম্ভব হলে জীবনভর, যদি লেখা হয় একটি মহত্ কবিতা, দুর্মর সেই অপেক্ষা। ‘কবির যতটা সম্ভব কম লেখা উচিত’— এলিয়ট এই মত দিয়েছেন। আবার অন্যদিকে র্যদা পরামর্শ দিয়েছেন নিরন্তর কাজ করে যাওয়ায়। কবির কী কাজ? কবিতা লেখা। নিরন্তন লিখতে হবে। তবে মূল বিষয়টি হচ্ছে ভালো লিখতে হবে। সব শিল্পের মধ্যে ‘কবিতা’ নামের এই নিঃসঙ্গ শিল্পটি চিরকালীন রহস্যময়তা নিয়ে বেঁচে আছে, থাকবে। কবিতা কবিতাই, একটু বেশিও নয়, একটু কমও নয়। নির্দিষ্ট সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে নয়, কবিতা লিখতে হবে শিল্পের উচ্ছ্বসিত শৃঙ্খলাকে মেনে নিয়ে। এ-ও মনে রাখতে হবে, শৃঙ্খলা যেন শৃঙ্খল না হয়ে ওঠে। এ মাটি ভেজাব ফের প্রতিটি বৃক্ষের সাথে একটি করে মানুষ থাকেন পুরুষ-প্রকৃতি নয়, নারী-শিশু ভবঘুরে নয় নয় সে রাজার দম্ভ, প্রজা বটে-খুব সাধারণ সোনার শৃঙ্খল রাখো, ভালোবাসো রৌদ্র-বৃষ্টি ঘাস সহজ চিন্তার মতো কেউ যদি মহত্ব আঁকেন সে হবে স্বপ্নের চুড়ো যথাযথ সুখের সময় প্রতিটি শিশির বিন্দু হয়ে যাবে অপার আকাশ গৌরবে জানানো যাবে প্রশান্তির শুভ জন্মক্ষণ কলহ, তোমাকে বলি, শান্ত হও, বসো বৃক্ষতলে এ-মাটি ভেজাব ফের আমাদের চক্ষুঝরা জলে ০০০০ অতিক্রম শব্দের গতির চেয়ে আলো চলে দ্রুততর বেগে অন্ধকার, তার কোনো পাঠ্যসূচি নেই সে থাকে সকল স্থানে, কালে-পাত্রে আকণ্ঠ প্রখর অন্ধকার প্রসারিত হয় শব্দ ও আলোর চেয়ে দ্রুততম বেগে ভাঁজ করে দাও আর কেটে-ছেনে নাও প্রতিটি আলোর অংশ অবিভাজ্য আলাদা একক এসো তবে অন্ধকার থেকে তুলে আনি না-ফুরানো আলোর আকাশ ০০০০ জীবন জীবনের ছোট্ট কোণে পড়ে আছি একা সময় কাটানো গৌণব্রতে পাঠালে মেঘের চিঠি বজ্রমোড়া খামে নামিয়ে এনেছ ভাঙা পথে হায়, কত দিন যায়, পড়িনি আকাশ বেদনার রং হলো গাঢ় ভুল যদি হয় হোক, বলব না তোমাকে- ‘পোড়ামুখী, হাত দুটো ছাড়ো’ ০০০০ ০০০০০০০০০ অবিচল ভালো অনেক পথের শেষে যখন প্রেমের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকি বিরহে বিশ্বাস রাখা সরাসরি পাপের সমান তাই আজ ছবি পড়ি : কোথা থেকে উড়ে আসে এক ঝাঁক পাখি তাদের সকল কণ্ঠ গেয়ে ওঠে দাম্পত্যের উচ্ছ্বসিত গান মুখর হ্রদের সঙ্গে শহরের দেখা হয় যদি সাফল্যের দীর্ঘপথ—আমি কিন্তু জানি মানুষের স্মৃতি থেকে ঝরে পড়ে সমুদয় গ্লানি কতটা দুর্বহ ছিল মিথ্যামন্ত্রে পুড়ে যাওয়া ত্বক এখন আক্ষেপ নেই। যে ঘৃণায় সরে গেছে নদী দু’পাড়ে, দূরত্বে নেই প্রতিপক্ষ—বৈরী বিভাজক সে কথা জরুরি নয়—কত পৃষ্ঠা দুঃখ পাঠে কত পৃষ্ঠা আলো প্রেমের গোপন দাহ, আধিপত্য মেনে নেওয়া অবিচল ভালো