কুরআন নাজিলের মাস মাহে রমজান

মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিলের মাস মাহে রমজান। রামাদান আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা, কঠোর সাধনা, আত্মসংযম ইত্যাদি। সাধারণত প্রভাতের সাদা আভা প্রকাশের সময় (সুবহে সাদিক) থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার ও যাবতীয় ইন্দ্রিয় তৃপ্তি, অন্যায়-অপরাধ, পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার কঠোর সাধনাকে সাওম বা রোজা বলা হয়। কুরআন শুধু একটি গ্রন্থ নয়। মহান আল্লাহর বাণী সর্বশেষ আসমানি কিতাব আল কুরআন হলো পরিপূর্ণ জীবন বিধান। কুরআনের আলোকে আমাদের জীবন আলোকিত করতে হবে। শুধু রমজান মাস নয়, বাকি এগার মাসও কুরআনের আলোকে জীবন যাপন করার করার শপথ নিতে হবে। কুরআনময় জীবন যাপন করলে সমাজে শান্তি বিরাজ করবে। দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তিময় জীবন আল্লাহ দান করবেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্তায়াআলা সূরা বাকারার ১৮৫নং আয়াতে বলেন, “রমজানের মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী এক নির্ভুল মানদণ্ড। অতএব তোমাদের মধ্যে যারাই এ মাসের সাক্ষাত্ পাবে তারা যেন অবশ্যই সিয়াম পালন করে”। হযরত সালমান ফারসি (রা.) বলেছেন, রসূলুল্লাহ (স.) শাবান মাসরে শেষ দিন আমাদের উদ্দ্যেশ্যে খুতবা দিলেন। তিনি বললেন, হে মানব সকল তোমাদের কাছে এক সুমহান মাস উপস্থিত। এটি একটি অতি বরকতময় মাস, যে মাসে একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ মাসে রোজা রাখা আল্লাহ্ তোমাদের ওপর ফরজ করে দিয়েছেন এবং রাতের বেলা নামাজকে নফল করেছেন। যে এ মাসে একটি নফল কাজ করল সে যেন অন্যমাসে একটি ফরজের সমান আমল করল, আর যে এমাসে একটি ফরজ কাজ করল সে অন্য মাসে ৭০টি ফরজের সমান কাজ করল। এটি হচ্ছে অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার মাস। আর এ মাসে ঈমানদারদের রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হয়। কোন রোজাদার কে যে কেউ কোন কিছু দিয়ে ইফতার করাবে তা তার জন্য মাগফেরাতের কারন হবে এবং দোযখ থেকে বাঁচার উপায় হবে। আর ঐ ব্যক্তি রোজাদারের সমান সওয়াব লাভ করবে যদিও রোজাদারের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা। এ বিষয়ে এক সাহাবি, নবী (স.) কে বললেন, “হে আল্লাহর রসূল (স.), আমাদের অনেকেরই রোজাদারকে কোন কিছু দিয়েই ইফতার করানোর সাধ্য নেই।” তখন মুহাম্মদ (স.) বললেন, “আল্লাহ্ তাদেরকেও এই পুরস্কার দেবেন যারা একটু দুধ, একটি খেজুর অথবা শুধু পানি দিয়ে রোজাদারকে ইফতার করাবেন। আর যে রোজাদারকে পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে আহার করাবে আল্লাহ্ তাকে হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করাবেন যা জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত তার থেকে তৃষ্ণা দূর করে দেবে। কুরআন নাযিল হওয়ার এ মাসের প্রথম দশদিন রহমত, মধ্য দশদিন মাগফেরাত এবং শেষ দশদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তিরদিন। এ মাসে যে কেউ তার গোলামের কাজকে সহজ করে দেবে আল্লাহ্ তাকে মাফ করে দেবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন (তিরমিজী এবং বায়হাকী)। উল্লিখিত কুরআনের আয়াত এবং হাদীসের আলোকে আমাদের শুধু রমজানের মাস নয় সারা জীবন চলা উচিত্। রমজান কুরআন নাযিলের মাস। কুরআনের উত্সবের মাস। এ মাসে কুরআনের পূর্ববর্তী নাযিলকৃত সমস্ত অংশ রসূল (স.) জিবরীল (আ.) কে পড়ে শোনাতেন। আমরা কি এ মাসে পুরো কুরআন পড়ছি? কুরআনের শিক্ষা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়নের কি কি পদক্ষেপ আমরা এ মাসে নিয়েছি? রমজানের মাসে নফল কাজগুলোর জন্য ফরজের সমান বরকতের ওয়াদা করা হয়েছে। আর প্রতিটি ফরজের জন্য সত্তর গুন সওয়াব। কতটুকু নফল ইবাদাত করার পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করেছি? ফরজগুলোকে যথার্থ আন্তরিকতা সহকারে আদায়ের কতটুকু উদ্যোগ আমাদের রয়েছে? রমজানে শয়তানকে আবদ্ধ করে রাখা হয়। কিন্তু আমরা কি নিজেদেরকে শয়তানী প্ররোচনা থেকে মুক্ত করতে পেরেছি? এই রমজানেও কি আমরা শয়তানী কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হইনা? রহমত রবকত মাগফেরাতের এ মাসে আমরা কি আমাদের প্রাত্যহিক প্রয়োজন পূরনের ক্ষেত্রে সংযম অবলম্বন করতে পেরেছি? প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় এবং ভোগ-বিলাসের ইচ্ছা কি আমরা দমন করতে পেরেছি? রমজান সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও অংশীদারীত্বের মাস। আমরা কি এ বিষয়গুলো অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি? আমরা কি আমাদের চারপাশের-অভাবগ্রস্থ, সুবিধা বঞ্চিত, অসহাস, ক্ষুধার্ত মানুষগুলির কথা ভেবেছি? তাদের জন্য সাধ্যমত কিছু করার পরিকল্পনা কি আমাদের মাথায় এসেছে? অভাবি, ক্ষুধার্ত এবং দরিদ্র অনেক আত্মীয়-স্বজন যাঁরা আমাদের রয়েছেন তাঁদেরকে কি আমাদের সম্পদে অংশীদারীত্বের কথা আমরা ভেবেছি? দুনিয়াব্যাপী আমাদের যে অসংখ্য মুসলিম ভাই-বোন বিপদক্লিষ্ট জীবন যাপন করছেন, সাহ্রী এবং ইফতারের জন্য যাদের কোন খাবার হয়তো জুটবেনা, শান্তিতে রাত জেগে নফল ইবাদত করার মতো নিরাপত্তা যাদের নেই, তাদের জন্য সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানানোর কার্যকর কোন পন্থার কথা কি আমরা ভেবেছি? কুরআন নাযিলের এ মাসে আমরা কি অপ্রয়োজনীয় ও বাজে কাজে সময় ব্যয় করা ছাড়তে পেরেছি? অথবা আমরা কি এ সমস্ত অর্থহীন কাজ কারবার থেকে বিরত থাকার জন্য কোন বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি? রমজান মাস মিথ্যা-ফাসেকী ও ঝগড়া থেকে বিরত থাকার মাস। আমরা কি মিথ্যা বলা ছাড়তে পেরেছি?